kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

কল্পকথার গল্প

দেশে ও দেশের বাইরে হোম কোয়ারেন্টিন

আলী হাবিব

২৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশে ও দেশের বাইরে হোম কোয়ারেন্টিন

না, কল্পকথা মোটেও নয়। সত্যি গল্প।

কভিড-১৯ কিংবা নভেল করোনাভাইরাস, নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে। বৈশ্বিক এ মহামারি এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। সবার অনভিজ্ঞতা আর ঢিলেমির সুযোগ নিয়ে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে এই রোগটি। এর কোনো চিকিৎসা নেই। বাঁচার একমাত্র উপায় নিজেকে অবরুদ্ধ করে ফেলা। যেখানে করোনাভাইরাস, সেখানে যাওয়া যাবে না। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কারো সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাংলাদেশেও সবার জানা। কিন্তু তা মানা হচ্ছে কি? আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্থলবন্দর। দেশের অভ্যন্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান বন্ধ করেও সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। সর্বনাশ যা হওয়ার আগেই তা হয়ে গেছে। হতে পারে অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা কিংবা ‘কিছুই হবে না’ জাতীয় আত্মবিশ্বাস আমাদের ডুবিয়েছে। করোনা যখন সত্যি সত্যিই ঘরে ঢুকে পড়েছে, তখন আর আমাদের কিছু করার নেই। যতটুকু সম্ভব সাবধানতা অবলম্বনের পাশাপাশি নিজেদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু কি করার আছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাংলাদেশেও সবার জানা। নিয়মগুলো মেনে চললে আজ বাংলাদেশ হয়তো বিপদমুক্ত থাকতে পারত। এভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ত না। কিন্তু বাংলাদেশে কতটুকু মানা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা?

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কয়েকটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ‘হোম কোয়ারেন্টিন’ ও ‘আইসোলেশন’—এসব শব্দ এখন আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। হোম কোয়ারেন্টিন কী? কোয়ারেন্টিন মানে সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যক্তির চলাফেরাকে সীমাবদ্ধ করা। কোয়ারেন্টিন তাঁদের জন্যই প্রযোজ্য, যাঁরা রোগে আক্রান্ত হননি কিন্তু রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন, রোগের প্রাদুর্ভাবযুক্ত এলাকায় থেকেছেন, অর্থাৎ যাঁরা রোগ ছড়াতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা নির্ভর করবে ওই রোগের ইনকিবেশন পিরিয়ড বা জীবাণু প্রবেশ থেকে রোগ প্রকাশিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময় কত দিন, তার ওপর। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিনের মেয়াদ ১৪ দিন ধরা হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টিন মানে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি নিজ বাড়িতে স্বেচ্ছায় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে থাকবেন এবং এ সময় নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। হোম কোয়ারেন্টিন মানে শুধু বাড়িতে থাকা নয়। তাঁর জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধও পালন করতে হবে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন আছে।

এবার সেই গাইডলাইন মেনে চলার গল্প। সত্যি ঘটনা। আমার এক বন্ধু থাকেন ইউরোপের এক দেশে। দেশটিতে এখনো করোনাভাইরাস সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ইতালির পাশের দেশ হওয়ার পরও দেশটি সংক্রমণ ঠেকাতে পেরেছে নিজেদের অবরুদ্ধ করে। আমার এই বন্ধুটি ইউরোপের ওই দেশটিতে আছেন প্রায় চার দশক। চলতি মাসের প্রথম দিকে ঢাকা আসেন তিনি। কিছু দিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ওই দেশের নাগরিকদের বিদেশ থেকে ফিরে যেতে বলা হয়। আমার বন্ধুটিও অনেক কষ্টে একটি টিকিট জোগাড় করে গত শুক্রবার ঢাকা ছাড়েন। ঢাকা থেকে তিনি রওনা হওয়ার আগে তাঁর পরিবারকে ওই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে এই মর্মে রিপোর্ট করতে হয়েছে যে করোনা ইমার্জেন্সির মধ্যে তাদের একজন সদস্য দেশের বাইরে রয়েছেন। তো আমার এই বন্ধুটি ঢাকা ছাড়ার আগে তাঁর পরিবারকে ডেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই দেশে তিনি পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে তাঁকে পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষায় পার পেয়ে গেলে তাঁকে হোম কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে। না হলে যেতে হবে হাসপাতালে। হোম কোয়ারেন্টিন কেমন হবে তা-ও জানিয়ে দেওয়া হয় পরিবারকে। পরিবার সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে বাড়ির নিচতলায় একটি ঘর আলাদা করে রাখে। তিনি ওই দেশের এয়ারপোর্টে নেমে বিমানে বসেই একটি হলফনামা সই করে দেন।

বিমান থেকে নেমে পরীক্ষার মুখোমুখি হন। উত্তীর্ণ হয়ে নিজের বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার অনুমতি পান। 

বিমানবন্দরে আমার বন্ধুকে নিতে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী ও ছেলে। পার্কিং এলাকায় গাড়ি রাখা ছিল। ব্যক্তিগত গাড়ি। আমার বন্ধুটি তাঁর স্ত্রীকে ফোন করে জেনে নিলেন গাড়ির অবস্থান। তিনি গাড়ির কাছে গিয়ে নিজেই স্যুটকেস রাখলেন নির্দিষ্ট স্থানে। বসলেন গাড়ির পেছনের আসনে। গাড়ি বাড়ির সামনে গিয়ে থামার পর তিনি ঢুকে গেলেন তাঁর নির্দিষ্ট ঘরে। শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা থেকে তিনি সেই ঘরটিতে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্দিষ্ট স্থানে তাঁর খাবার রেখে যাওয়া হচ্ছে। তিনি খাচ্ছেন। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই তাঁর। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ফোন করে নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে খোঁজখবর। কানাডায় বসবাস করেন এমন একজনও স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন হোম কোয়ারেন্টিন। আমাদের তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। তিনিও তো যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হোটেলে কোয়ারেন্টিন বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছায়।

কিন্তু বাংলাদেশে হোম কোয়ারেন্টিনের নামে আমরা কী দেখছি? যাঁদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা তাঁদের বেশির ভাগই বাড়ির      বাইরে  যাচ্ছেন। প্রকাশিত  কিছু  খবরের দিকে নজর দেওয়া যাক। ১. কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা উখিয়ায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হানা দিয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিয়ের পিঁড়ি থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন প্রবাসী বর ও নববধূকে। বিদেশ থেকে ফিরে আসার পর অন্তত ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা থাকলেও তা অমান্য করেই বিয়ের আয়োজন করা হয়। ২. কুলাউড়ায় বিদেশ থেকে ফিরে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর সেখানেই হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে এক ব্যক্তিকে। নির্দেশনা না মানায় তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। একই উপজেলায় হোম কোয়ারেন্টিন না মানায় আরেক প্রবাসীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৩. সিলেটের কানাইঘাটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইফেরত এক প্রবাসীর বিয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। প্রবাসী বরকে হোম কোয়ারেন্টিনে এবং নববধূকে বাবার বাড়িতে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। ৪. হোম কোয়ারেন্টিন না মানায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি পরিবারের ছয়জনকে তালাবদ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ৫. ফরিদপুরে গত ১ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বিদেশফেরত তিন হাজার ৮৩৫ জনের নিজ উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা থাকলেও তাঁরা সেই নির্দেশনা মানছেন না। ৬. ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে আট হাজার ৯৭৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশে এসেছেন। সতর্কতামূলক হিসেবে এসব প্রবাসীর সবারই ১৪ দিন করে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা। কিন্তু বুধবার পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাত্র ১৪ জনকে রাখা হয়েছে হোম কোয়ারেন্টিনে। ৭. হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় এক প্রবাসীকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা বলা হলেও তিনি বিয়ে করেছেন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন জানতে পেরে বরের বাড়িতে গিয়ে তাদের বউভাত অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ৮. ‘মানুষই আমারে ভয় পায়। আর রোগ তো দূরের কথা।’ এভাবে দম্ভোক্তি করেছেন গ্রিস থেকে আসা এক যুবক। কারো কথার তোয়াক্কা না করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। দিন দশেক আগে যুক্তরাষ্ট্রফেরত দুজন যোগ দিয়েছিলেন এক বিয়ের আসরে, সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই দুদিন আগে গিয়েছিলেন গাইবান্ধা-৩ আসনের উপনির্বাচনে ভোট দিতে। গত রবিবার জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রফেরত সেই দুই ব্যক্তির দেহে নভেল করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

বিদেশে আমার যে বন্ধু হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন, প্রতিদিন কথা হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে। আক্রান্ত না হয়েও তাঁরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। আর আমরা? আমরা কবে সভ্য হব!

 

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা