kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

২৩ মার্চ বাঙালি জাতির জন্য অনুপ্রেরণার

বাহালুল মজনুন চুন্নু

২৩ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



২৩ মার্চ বাঙালি জাতির জন্য অনুপ্রেরণার

বাঙালি জাতির জীবনে মার্চ মানেই এক উদ্দীপনার মাস। একাত্তরের মার্চের প্রতিটি দিনই ছিল অগ্নিঝরা প্রতিবাদমুখর আন্দোলনে জ্বলে উঠা ঘটনাবহুল মাস, যা বাঙালি জাতির জীবনে অহর্নিশ স্বপ্ন জাগায়, প্রেরণা দেয়, বাঙালির ঐক্যবদ্ধ চেতনা শাণিত করে, শিহরণ জাগায় বাঙালির রক্তে। সেই মার্চের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন ২৩ মার্চ। দুর্নিবার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে অস্বীকার করে সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বীকৃতির ঐক্যের প্রতীক এই দিনটি বাঙালি পালন করেছিল প্রতিরোধ দিবস হিসেবে, বাংলাদেশ দিবস হিসেবে। এই দিনটিতে তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হয়ে ওঠে ‘বাংলাদেশ’। এদিনই পূর্ব বাংলার বাঙালিরা স্বাধীনতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই দিনটি ছিল লাহোর প্রস্তাব দিবস তথা পাকিস্তান দিবস। ১৯৪০ সালে এই দিনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ঠিক এই দিনেই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনা হয়েছিল বলে তখন থেকে এই দিনটি পাকিস্তান দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। এই দিনে ইসলামাবাদে রাষ্ট্রপতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর উড্ডীয়মান পাকিস্তানের পতাকাখচিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামরিক অভিবাদন গ্রহণ করতেন। সর্বত্র উড়ত পাকিস্তানের পতাকা। কিন্তু একাত্তরের ২৩ মার্চ শুধু ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের খণ্ডিত অবাঙালি অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোথাও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। সমগ্র দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও মহকুমা শহরেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে একযোগে সারা বাংলায় অর্ধচন্দ্র তারকাখচিত সাদা-সবুজ পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে উড়েছিল সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্যের ওপর বাংলাদেশের সোনালি রঙের মানচিত্র শোভিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। সব জায়গা থেকে পাকিস্তানের শেষ চিহ্নটি অবলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশন ও সোভিয়েত কনস্যুলেটে পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা তোলা হয়েছিল। চীন, ইরান, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ায় দূতাবাস ভবনে প্রথমে পাকিস্তানি পতাকা তোলা হলেও পরে জনতা এসব দূতাবাসে সেই পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিল সেদিন। অবশ্য মার্কিন দূতাবাসে এদিন কোনো পতাকাই তোলা হয়নি। বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বাঙালি জাতি সেদিন ঐক্যবদ্ধভাবে অখণ্ড পাকিস্তানকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। এর মূল নায়ক ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেননা ২৩ মার্চে পতাকা উত্তোলনের নির্দেশটি ছিল তাঁরই।

দীর্ঘ ২৩ বছরের তীব্র শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের করাঘাতে জর্জরিত বাঙালি প্রতিবাদী চেতনায় শাণিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে। তিনিই ঘুমিয়ে থাকা বাঙালি জাতিকে শুধু অধিকার সচেতনই করেননি, অধিকার আদায়ের মন্ত্রে দীক্ষিতও করেছিলেন। তাইতো একাত্তরে মার্চের শুরু থেকেই তাঁরই ডাকা অসহযোগ আন্দোলন বাঙালি পালন করেছিল নিবিষ্টভাবে। তবে তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে অধিকার আদায়ের অর্জিত দীক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে উদ্দীপ্ত করেছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক বাঙালির মনে এনে দিয়েছিল অদম্য সাহস। সেই সাহসে ভর করে মুক্তিপাগল বাঙালি উত্তাল জোয়ার তুলেছিল। আন্দোলন, সংগ্রামের উত্তাল ঢেউ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে শহর থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের বৈঠকের পর বৈঠক চললেও বাঙালি বুঝে যায়, এতে কোনো ফল আসবে না। একদিকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা বাঙালির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে; অন্যদিকে বাঙালি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। সংগ্রামের অংশ হিসেবে ঠিক এই দিনটিতেই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে সগৌরবে উড়িয়ে দেয় এ দেশের স্বাধীনতাপাগল মানুষ। বঙ্গবন্ধু আব্দুর রাজ্জাকের উপস্থিতিতে তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর নয়, এবার পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উঠবে। প্রতিটি যানবাহনে, ভবনে, সব কার্যালয়ে, উচ্চ আদালতে উত্তোলিত হবে ওই পতাকা। এই নির্দেশনার আলোকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পূর্বঘোষিত ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পতাকা উত্তোলন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রামের আহ্বানে এদিন ঢাকা টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ রাখেন, যাতে টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শিত না হয়। রেডিওতে বারবার জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাজানো হয়। এদিন সব বাংলা দৈনিকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রদত্ত স্বাধীন বাংলাদেশের নকশা ছাপানো হয়, যা দেখে সারা দেশের জনগণ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পতাকা তৈরি ও উত্তোলন করে। এদিন ন্যাপ (ভাসানী) ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস’ পালন করে। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন ও মতিয়া), বিভিন্ন ছাত্র, নারী ও শ্রেণি-পেশার সংগঠন ঢাকাসহ সারা দেশে সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও মিছিল করে। পুরো ঢাকায় ছিল গণ-আন্দোলনের প্রবল জোয়ার। সারা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে একেকটি মিছিল এসে মিশে যাচ্ছিল আরো অনেক মিছিলের সঙ্গে। ঢাকা শহর এদিন মিছিলের নগরীতে রূপ নেয়। রাজপথে লাঠি, বর্শা, বন্দুকের মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ছিল উচ্চকিত। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘তোমার নেতা, আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ ইত্যাদি গগনবিদারী স্লোগান পৌঁছে যায় আকাশে-বাতাসে। জনতা ভুট্টো ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয়। মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত আর ক্ষোভে উদ্বেল মানুষ স্থানে স্থানে ছিন্নভিন্ন করে পাকিস্তানের পতাকা।  ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর কুশপুত্তলিকা দাহ করে বিক্ষুব্ধ বাঙালি।

এই দিনে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা তথা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যান্য ছাত্রনেতা পল্টন ময়দানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এ সময় সামরিক কায়দায় মঞ্চে দাঁড়ানো স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতাকে অভিবাদন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধি হিসেবে চার ছাত্রনেতা অভিবাদন গ্রহণ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও বাঙালি সাবেক সৈনিকের সমন্বয়ে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনী’র কুচকাওয়াজের মাধ্যমে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল এই দিনে। ওই সময়টায় বিউগলে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সুর বেজে উঠেছিল। ধীরে ধীরে উত্তোলন করা হয়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকাটি। অনেক ব্রিগেড সাজানো হয়েছিল একের পর এক। একটি ব্রিগেড অভিবাদন জানিয়ে মঞ্চ অতিক্রম করে পাশে অবস্থান নিচ্ছিল, আরেকটি ব্রিগেড মঞ্চের দিকে মাথা বাঁকিয়ে অভিবাদন দিয়ে প্যারেড করে এগিয়ে যাচ্ছিল। সর্বশেষ ব্রিগেডটি অভিবাদন জানানোর পর চার নেতাসহ অন্যরা মঞ্চ থেকে নেমে পল্টনের গেটে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে যান। সেখানে ব্যান্ড বাজিয়ে বিউগলে জাতীয় সংগীতের সুর তুলে মিছিল করে দৃপ্ত পায়ে মহাসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো জনসমুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে মার্চপাস্ট করে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যান স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে নূরে আলম সিদ্দিকী স্বাধীন বাংলা  ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকাটি তুলে দেন। পতাকাটি গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা স্লোগান দেন। লাখো মানুষের কণ্ঠ থেকে জয় বাংলা স্লোগানটি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ইথারে ভাসতে ভাসতে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এদিন বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যেভাবে পাকিস্তান দিবসকে বাংলাদেশের পতাকা দিবস হিসেবে পালন করে, তা শুধু অভাবনীয়ই ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই দিনটি বাঙালি জাতির মাঝে দেশপ্রেমের শিখাকে প্রজ্বালন করেছিল দ্বিগুণ বেগে। ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরপরাধ মানুষকে গণহত্যার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিল পাকিস্তানি হায়েনারা, সেই যুদ্ধে পিছপা না হয়ে বরং জীবন বাজি রেখে বুক ফুলিয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছিল ২৩ মার্চের পতাকা দিবস। এই পতাকা দিবসের মাহাত্ম্য বাঙালি জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে, যাবে অনাগত দিনগুলোতেও।

 

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা