kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

ইএফডি নতুন ভ্যাটব্যবস্থায় শিকল তৈরি করবে

ড. মইনুল খান

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ইএফডি নতুন ভ্যাটব্যবস্থায় শিকল তৈরি করবে

২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন হলেও তা বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় সাত বছর পরে। ১ জুলাই ২০১৯ থেকে এই রাজস্বসংক্রান্ত আইন চালু হলেও প্রথম কয়েক মাস লেগেছে ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া দেখা নিয়ে। যেহেতু এখন এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তেমন কোনো নেতিবাচক উচ্চারণ নেই, তাই নতুন আইনের সফলতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ধরা নেওয়া হয়েছে যে নতুন আইন অধিকতর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হবে। সময়সাপেক্ষ ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের মাধ্যমে ভ্যাট অটোমেশনকে সামনে আনা এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এসব ব্যবস্থার অনেকগুলো পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) চালু করা। বর্তমান এনবিআর এটি কার্যকরভাবে প্রবর্তনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং তা অচিরেই দৃশ্যমান হবে।  বাংলাদেশে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের অনুষঙ্গ হিসেবে এই ইএফডি সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভ্যাট আইনের পরিপালনে ইএফডি কতখানি ভূমিকা রাখতে পারবে?  

এরই মধ্যে এনবিআরের পক্ষে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প অনেক দূর এগিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এক লাখ যন্ত্র ক্রয়ের আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে ৪০টি করে ৮০টি এবং চট্টগ্রামে ১০টিসহ মোট ১০০টি যন্ত্র বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কোনোরূপ কারিগরি ত্রুটি দেখা না দিলে আরো ১০ হাজার মেশিন বসানো হবে। পর্যায়ক্রমে প্রথমে এক লাখ এবং পরে দুই লাখ যন্ত্র বসবে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, স্বর্ণের দোকান, বিউটি পার্লার, ডেকোরেটর্স সার্ভিস, তৈরি পোশাকসহ ২৪ ধরনের খুচরা পর্যায়ের দোকানে এসব যন্ত্র বসানো হবে। এর দ্বারা ভ্যাট আইন পরিপালন ও তা আহরণে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হয়।

কেন এই ইএফডির ধারণাটি সামনে এলো? ১৯৯১ সালের আইনে পর্যায়ক্রমে খুচরা বিক্রির ওপর ভ্যাট আরোপ করার ফলে ছোট-বড় দোকান থেকে সনাতনি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আশানুরূপ ভ্যাট না আসায় ২০০৮ সালের দিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) প্রবর্তন করে। তবে এই যন্ত্র তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। এর মূল কারণ হচ্ছে যে এই যন্ত্রে ‘রিয়াল টাইম’ বিক্রির তথ্য মনিটর করার সুযোগ সীমিত ছিল। অধিকন্তু নেটওয়ার্কিংয়ের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকায় যন্ত্রে কী হচ্ছে তা জানার সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে ইএফডি হচ্ছে ইসিআরের উন্নততর সংস্করণ। এতে প্রিন্টার, মনিটর, কি-বোর্ড এবং ক্রেডিট ও ক্যাশ কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের সংযোগ থাকবে। নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে এনবিআরের সেন্ট্রাল সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় দোকানের বিক্রির তথ্য সংরক্ষিত থাকবে স্থাপিত এই যন্ত্রে এবং এনবিআরের সার্ভারে। ইচ্ছা করলেই কেউ এর তথ্য মুছে ফেলতে পারবে না। এর অন্যতম সুবিধা হলো, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক না থাকলেও এই যন্ত্র অফলাইনে তথ্যাদি নিজস্ব মেমোরিতে ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক ফিরে এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সেন্ট্রাল সার্ভারের সঙ্গে সমন্বয় হয়ে যাবে। এই ইএফডি তুলনামূলকভাবে ছোট ও অধিকতর ব্যবহার উপযোগী।

ব্যবসায়ীদের জন্য এই যন্ত্র কী সুবিধা এনে  দেবে? তাঁরা কেন এই যন্ত্র বসাবেন? প্রথম যুক্তি হচ্ছে যে ব্যবসায়ীদের এই যন্ত্র বসাতে কোনো খরচ নেই। এনবিআর এই যন্ত্রটি তাঁদের বিনা মূল্যে সরবরাহ করবে। যন্ত্রে কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তাত্ক্ষণিকভাবে তা মেরামত করার জন্য সেবা দিতে সার্বক্ষণিকভাবে টিম কাজ করবে। তা ছাড়া ২৪/৭ সেবা পেতে হটলাইন সেবাও উন্মুক্ত থাকবে। ইএফডি ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা হলো, এতে দোকানের মালামালের পরিমাণ লিপিবদ্ধ থাকবে। দিন শেষে কোন পণ্যের কতটুকু বিক্রি হলো এবং স্টকে কত আছে তা একজন ব্যবসায়ী দেখতে পারবেন। কোথাও কোনো পণ্য চুরি হলে বা পণ্যের গুণাগুণ বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে পণ্য সম্পর্কে তথ্য বের করতে পারবেন। এই সিস্টেমে ধারণকৃত যেকোনো তথ্য স্থায়ী ও অত্যন্ত নিরাপদ। অন্যদিকে ভ্যাটের হিসাব বের করা এবং তা জমা দেওয়ার পদ্ধতিটি যন্ত্রের মাধ্যমে অল্প সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব। ব্যবসায়ীদের নিজস্ব হিসাবে স্বচ্ছতা আসবে এই যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। নিজের হিসাব নিজে করে তা অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে পরিশোধ করলে সময়, খরচ ও হয়রানির অভিযোগও কমে যাবে।

ইএফডির অন্যতম সুবিধাভোগী হচ্ছে ক্রেতাসাধারণ। এই যন্ত্রের মাধ্যমে যেকোনো পণ্য বা সেবা কিনলে যে রিসিপ্ট পাওয়া যাবে, তা ওই পণ্য বা সেবা ক্রয়ের আইনি দলিল হিসেবে গণ্য হবে। এই রিসিপ্টে ভ্যাট শনাক্তকরণসহ বারকোড প্রিন্ট করা থাকবে। এই বারকোডটি ক্রেতা তাঁর নিজস্ব মোবাইল অ্যাপস দিয়ে এর সত্যতা তাত্ক্ষণিকভাবে যাচাই করে নিতে পারবেন। তিনি ক্রয়ের সময়ই নিশ্চিত পারবেন যে তাঁর দেওয়া ভ্যাটের তথ্য এনবিআরের সেন্ট্রাল সার্ভারে গৃহীত হয়েছে, যা মাস শেষে বিক্রেতা সরকারি কোষাগারে জমা  দেবে। সরকার সময়ে সময়ে সার্ভারে রক্ষিত ভ্যাট রিসিপ্ট থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে পুরস্কারের ঘোষণা দিলে ক্রেতাসাধারণ তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতাসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে এনবিআরের এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

এনবিআর কেন এই ইএফডি চাচ্ছে? এতে সরকারের সুবিধা কী? নতুন আইনের অন্যতম দিক হচ্ছে অনলাইন ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই ইএফডি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় যন্ত্রে দেওয়া যেকোনো তথ্য সঙ্গে সঙ্গে এনবিআরের নেটওয়ার্কে চলে আসবে। একজন বিক্রেতা ইচ্ছা করলেও তাঁর বিক্রির তথ্য ইচ্ছামাফিক পরিবর্তন করতে পারবেন না। মাস বা মেয়াদ শেষে মোট বিক্রি ও প্রযোজ্য ভ্যাট হিসাব করে তা আদায় করা সহজ হবে। এ ব্যবস্থায় তাঁর দোকানের ইনভেন্টরি বা পণ্যের স্টকের অবস্থানও জানা যাবে। ভ্যাট কর্মকর্তারা অফিসে বসে জানতে পারবেন তাঁর যন্ত্রটি সচল আছে কি না? যদি দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যন্ত্রটি কাজ করছে না এবং বন্ধ থাকছে, তাহলে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সিগনাল দেবে এবং ভ্যাট কর্মকর্তারা ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে খোঁজ নিতে পারবেন। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ভ্যাটের হারে পরিবর্তন এলে তা প্রতিষ্ঠানে না গিয়েও এনবিআরে বসে সিস্টেমে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এনবিআরের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে যে ভ্যাটের কলেবর বাড়লেও জনবল না বাড়ায় সীমিত জনবল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভ্যাটের প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং সঠিকভাবে তদারকি করা সম্ভবপর হবে। এতে ভ্যাট আহরণে সময় ও অপচয় কমে যাবে। সার্বিকভাবে ইএফডিও প্রবর্তন ভ্যাট ব্যবস্থায় আগের তুলনায় স্বচ্ছতা আনবে এবং তা আহরণের গতি বাড়িয়ে  দেবে। 

বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থায় ইএফডি চালু করতে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় আনতে হয়েছে। এগুলো তিন ধরনের। প্রথমত, কারিগরিভাবে যন্ত্রগুলো দেশের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে কি না। যে ‘কি-বোর্ড’ ব্যবহার হবে তা প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানদার বা তাঁর কর্মচারীরা চালাতে পারবেন কি না। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে কী হবে? অন্যদিকে প্রথম দিকে দোকানের হাজারো পণ্যের প্রতিটির স্টক নেওয়া এবং তার বিপরীতে পণ্যের শনাক্তকরণ ও এইচএস কোড ব্যবহার ও সমন্বয় জটিল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে। অন্যদিকে কোনো একটি দোকানে বিক্রীত পণ্যের ওপর একই সময়ে বিভিন্ন হারে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক  প্রযোজ্য হতে পারে। সিস্টেমে এ বিষয়টি কিভাবে সামাল দেওয়া হয় তা দেখার বিষয়। দ্বিতীয়ত, ইএফডি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র। এর ব্যবহার ও সংরক্ষণব্যবস্থাও নতুন। যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রের ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ অত্যন্ত জরুরি। সারা দেশে খুচরা দোকানের সংখ্যা ২০ লক্ষাধিক। এত ব্যাপক সংখ্যাকে নতুন ব্যবস্থায় আনতে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও তা এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, কর প্রদানের সংস্কৃতি তৈরির ওপর নির্ভরশীল এই যন্ত্রের সাফল্য। এ ব্যবস্থায় যেহেতু কর ফাঁকির সুযোগ সীমিত, তাই যাঁরা এটি ব্যবহার করবেন এবং মনিটর করবেন তাঁরা কতখানি আন্তরিক হবেন তা দেখতে হবে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো কোনো ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রিতে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ে উৎসাহিত হন না। আদায় করলেও তা তাঁরা নিজস্ব মুনাফা বাড়ানোর জন্য যথাযথভাবে জমা দেন না। তাঁরা এই নতুন ব্যবস্থাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন তা আরো গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের একটা অংশ বেশ সংগঠিত এবং এই নতুন যন্ত্র বসানো ও ব্যবহারে কোথাও কোনো দীর্ঘসূত্রতা হলে বা কারিগারি ত্রুটি দেখা দিলে তাঁরা নতুন করে এর বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেন। অন্যদিকে দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত মেশিন ব্যবহার না করেও বিক্রেতা তাঁর পণ্যটি নগদে লেনদেন করতে পারেন। যন্ত্রে এন্ট্রি না দিয়েও বিকল্প পথে তিনি পণ্য বিক্রির সুযোগ খুঁজতে পারেন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কেউ কেউ বাড়তি সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় এই ব্যবস্থার প্রতি যত্নবান না-ও হতে পারেন। এসব চ্যালেঞ্জকে মাথায় রেখে এনবিআর ইএফডি চালু করতে যাচ্ছে।

ইএফডি অন্য দেশে সাফল্য এনে দিয়েছে। রাজস্ব আহরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এখানে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা মোকাবেলা করার জন্য এনবিআরে প্রস্তুতি রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট অন্যতম বিকল্প হওয়ায় এ ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি প্রবর্তন একটি বড় অগ্রগতি হবে। যেহেতু খুচরা পর্যায়ে কোটি কোটি লেনদেনের হিসাব ম্যানুয়ালি পদ্ধতিতে কোনোভাবেই ট্রাক করা সম্ভব নয়, সেহেতু স্বচ্ছতার স্বার্থেই এবং ভ্যাট আহরণে সময় ও খরচ বাঁচাতে ইএফডিকে স্বাগত জানানো দরকার। এতে ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ সীমিত হওয়ায় রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থার ‘চেইন ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে এই ইএফডি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ইএফডিও তথ্য অন্যান্য সূচক ও মাপকাঠির সঙ্গে যাচাই-বাছাই করার সুযোগ বাড়বে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পদচিহ্নের সূচনা করবে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির দ্বার খুলে দেবে।             

লেখক : কমিশনার অব কাস্টমস ও ভ্যাট, ঢাকা পশ্চিম, এনবিআর

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা