kalerkantho

শনিবার । ২১ চৈত্র ১৪২৬। ৪ এপ্রিল ২০২০। ৯ শাবান ১৪৪১

নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস

রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনো কখনো অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ সব লোকেরই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সব সময়ের এবং আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব হয়। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটে-ছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো হচ্ছে এ রোগের সাধারণ লক্ষণ। যাঁদের বংশে রক্ত-সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়-স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, যাঁদের ওজন খুব বেশি, যাঁদের বয়স ৪০-এর ওপর এবং যাঁরা শরীরচর্চা করেন না—গাড়িতে চড়েন এবং বসে থেকে অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অত্যধিক চিন্তাভাবনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম খাবার, গর্ভাবস্থা এবং ওজন বেশি বেড়ে যাওয়া এ রোগ বাড়ায় সহায়ক। এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষামতে নগরায়ণ, ‘ওয়েস্টার্ন ফুড’ আর সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতায় এই রোগের বিস্তারকে করছে বেগবান। বিশ্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতে, এই শতকের মাঝামাঝি তক পৌঁছার আগেই এটি মানবভাগ্যে মারাত্মক মহামারিরূপে উদ্ভাসিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য নিকাশ কেন্দ্রের হিসাবমতে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘাতক ব্যাধি বছরে ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন করে সে দেশের জাতীয় অর্থনীতির।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব কয়টি দেশই এক থেকে পাঁচ দশক ধরে স্বাধীনতা ভোগ করে এলেও দেশগুলো আজও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মূল (স্থূল) জাতীয় উত্পাদনের (Gross National Product) স্বল্পতা, অক্ষরজ্ঞানের নিম্নহার, অনুন্নত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, অপর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ব্যাপক অপুষ্টি, উচ্চজন্ম ও শিশু মৃত্যুর হার এবং পৌনঃপুনিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলছে। এত সব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি দমনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের আয়ুষ্কাল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যথা—ডায়াবেটিস মেলাইটাস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির প্রকোপ বেড়েছে।

ডায়াবেটিস মেলাইটাস সংক্রামক রোগ না হওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশের স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অগ্রাধিকার তালিকায় সংক্রামক রোগের তুলনায় এর স্থান অনেক নিচে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাঁদের আঞ্চলিক অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সুতরাং ডায়াবেটিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কর্মসূচি এসব দেশে সন্তোষজনকভাবে গড়ে ওঠেনি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনা মূল্যে চিকিৎসা করা হয় ঠিকই; কিন্তু রোগীকে ইনসুলিন দেওয়া হয় শুধু হাসপাতালে ভর্তি হলেই, বহির্বিভাগের রোগীকে কখনোই ইনসুলিন দেওয়া হয় না। দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ অধিবাসী যে পল্লী অঞ্চলে বাস করে, সেখানে ইনসুলিন পাওয়া যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডায়াবেটিসের মতো আজীবন রোগের ক্ষেত্রে যে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন, এসব উন্নয়নশীল দেশে সে সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতাও নেই। যেসব হাসপাতালে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা হয়, সেখানেও এসব রোগীর কোনো নথি কিংবা তালিকা রক্ষা করা হয় না; এমনকি কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধনও নেই।

দেহে বহু ব্যাধির আহ্বায়ক, নীরব ঘাতক স্বভাবের ডায়াবেটিস রোগটির অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সবাইকে এটি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ সচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সব সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৬ সালে ৬১/২২৫ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দুই শর অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা কম্পানি পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসও নানা প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৫-২০১৯) মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘ডায়াবেটিস রোগকে জানা, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসের প্রচার-প্রচারণায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে যাদের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে আর এ চিকিৎসায় নিবেদিত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী—সবারই শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের বিস্তার থামানো, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়াকে সীমিতকরণ। এসব প্রচার-প্রচারণা মূলত 3E (Education, Engage and Empower) বা তিনটি প্রতিপাদ্যে প্রতিষ্ঠিত—অর্থাৎ সবাইকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষার প্রসার, অধিকসংখ্যক রোগী-অরোগী-চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সেবায় সম্পৃক্তকরণ এবং ডায়াবেটিক রোগীদের নিজেদের কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে ক্ষমতায়ন।

 

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সাবেক চিফ কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা