kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

সাদাকালো

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে যেকোনো মূল্যে

আহমদ রফিক

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে যেকোনো মূল্যে

‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও’—বেশ কিছুদিন থেকে এমন এক শিরোনামে লেখালেখি কম হয়নি। কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর তারা যথারীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যেমন দেখা গেছে পার্শ্ববর্তী শীতলক্ষ্যা নদীর ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ও খুব একটা কার্যকর হয়নি—এমনই শক্তিমান নদী দখলের তৎপরতা। অজগর-ক্ষুধা নিয়ে নদী আগ্রাসন।

বুড়িগঙ্গা দূষণে বড় পক্ষ ট্যানারি বর্জ্য নিষ্কাশন বুড়িগঙ্গার বুকে, বছরের পর বছর। বুড়িগঙ্গার সান্নিধ্য থেকে ঢাকার শিল্প সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও অনেক দিনের। কিন্তু নানা প্রতিকূল শক্তির চাপে সরকার এ সম্পর্কে কঠোর সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করতে পারেনি। নানা অজুহাতে ট্যানারি শিল্পের মালিকরা তাদের কারখানা স্থানান্তরের কাজ বিলম্বিত করেছে। আর কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে বুড়িগঙ্গার পানি দিনের পর দিন দূষিত হয়েছে। মাছ মরেছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে। এসব খবর নিয়মিত সাংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে, লেখা হয়েছে নানা হাতে প্রতিবাদী উপসম্পাদকীয়।

কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। বুড়িগঙ্গার সমস্যা একাধিক। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বোক্ত বিষাক্ত দূষণ, যার ফলে এর পানি শুধু অপেয়ই নয়, সাধারণ ব্যবহারেরও অযোগ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত প্রধান সমস্যা অবৈধ স্থাপনা নদী ভরাট করে। এ ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে সব আইনি বাধা অতিক্রম করে। নদীখেকোরা এমনই শক্তিমান। এবং নদীকে নিয়ে এসব অপতৎপরতা চলছে বাংলাদেশজুড়ে।

বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত ছোট ছোট নদীগুলোকে কেন্দ্র করে চলেছে নদী দখলের মহোৎসব। বাধা দেওয়ার, প্রতিবাদ করার কেউ নেই, যাঁরা আছেন তাঁরা দুর্বল, তাঁদের প্রতিবাদ বা বাধা গ্রাহ্যের মধ্যে আনে না শক্তিমান নদী দখলকারীরা। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে কিছুদিন পরপরই এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাতে করে কর্তৃপক্ষের তরফে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ প্রায়ই দেখা যায় না।

ফলে এমন সংবাদও মাঝেমধ্যে পরিবেশিত হয় সংবাদপত্রে যে ছোটখাটো শাখা নদী মজে-হেজে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে এবং তা প্রাকৃতিক কারণে নয়, কিছুসংখ্যক অসৎ, লোভী মানুষের অবৈধ তৎপরতায়। তাদের স্বার্থের তাড়না ও প্রতাপ এতই প্রবল যে মনে হয় তা অপ্রতিরোধ্য।

দুই.

বাংলাদেশ প্রধানত নদীমাতৃক দেশ। এর যাতায়াতব্যবস্থা, কৃষিকর্ম, জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য, সর্বোপরি অর্থনৈতিক দিকগুলো নদীনির্ভর, জলস্রোতনির্ভর। সুপেয় পানির উৎস পরিশ্রুত নদীর জল। একদা পূর্ব বাংলার শহর সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে, নদীতীরে। একইভাবে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র, এমনকি গঞ্জগুলো।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবন যাপনের বহুবিধ বৈচিত্র্যসহ নদী ও জলস্রোতের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে সমাজ এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতির। যেমন জীবনধারার সঙ্গে জলস্রোতের মিলে সাহিত্য সৃষ্টি, তেমনি ভাটিয়ালি গানের বিষাদঘন বিষণ্নতার সুরে হৃদয়ের ভিন্ন এক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ। নদী ও জীবন এভাবে নানা মাত্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদী ও জলস্রোতকে ঘিরে নৌকাশিল্পেরও বিকাশ। এ দিক থেকে ঢাকার রয়েছে বিশেষ খ্যাতি।

এককথায় বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবন আপন বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। তাই নদীর জলপ্রবাহ বিশুদ্ধ ও বাধামুক্ত রাখা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য। নদী, জলস্রোত, প্রাকৃতিক সম্পদ, তাই সেদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টির অভাব উদাসীনতার পর্যায়ে পড়ে। নদীতে চর পড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অন্তর্গত হলে মানুষের হাতে সৃষ্টি কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাও এ জন্য কম দায়ী নয়।

বেশ কিছুকাল থেকে এ জাতীয় ঘটনা বহুলদৃষ্ট। অনেক খবর প্রকাশ পেয়েছে দৈনিক পত্রিকায়—যমুনায় কৃত্রিম উপায়ে বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাছ চাষ এবং মাছের ব্যবসা ইত্যাদি। ক্ষমতাবানদের এজাতীয় অন্যায়, অবৈধ অনাচার থেকে ছোট-বড় কোনো নদী রক্ষা পায় না—বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাই বা বাদ যাবে কেন?

একটি ছোট খবর, তুরাগ নদের তীরে অবৈধ স্থাপনা ভাঙতে অভিযান। এ ঘটনা আজকের নয়। একাধিকবার তুরাগে অবৈধ স্থাপনা নিয়ে ভাঙাগড়ার খেলা চলেছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, সমাজবিরোধীদের হাত কতটা শক্তিশালী। হয়তো তাই কালের কণ্ঠ’র বুড়িগঙ্গা নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রথম পাতায়: ‘ভরাট হয়ে মরে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা’/‘সদরঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা’।

৩.

অনেক বছর আগেকার কথা। দক্ষিণ ভারতের নদী নর্মদাকে নিয়ে ‘নর্মদা বাঁচাও’ আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেটার উৎস অবশ্য ছিল ভিন্ন, পানির হিসসা নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে বিরোধ। পরিণামে নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং শেষ পর্যন্ত নিস্তরঙ্গ হয়ে মৃত্যুবরণের সম্ভাবনা বিচলিত করেছিল সংশ্লিষ্ট সচেতন ব্যক্তিদের। তাই আন্দোলনের স্লোগান: ‘নর্মদা বাঁচাও’।

ঢাকার মাটি স্পর্শ করে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা—একসময়কার শিশু পাঠ্য বইয়ে প্রবাদতুল্য বাক্যে চিহ্নিত—‘ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত’ উভয়েরই ইতিহাসখ্যাতির পরিচয় বহন করে। সেই ইতিহাসখ্যাত মোগল আমলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা দূষণে, অবৈধ দখলদারিত্বে, কৃত্রিম স্থাপনার বাধায় ও ভরাটের টানে এখন নির্জীব, মৃতপ্রায় ও অনাচারে দূষিত যে কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকাবাসী এক শ্রেণির মানুষেরই চরম লোভ-লালসা ও স্বার্থপরতা এবং অনাচারের শিকার বুড়িগঙ্গা। এসবের প্রতিরোধ না হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এখন দেখা দিয়েছে সদরঘাটসংলগ্ন বুড়িগঙ্গার বুকে জলস্রোত ব্যাহত করা চর। লঞ্চ, স্টিমার, পণ্যবাহী, মনুষ্যবাহী নৌযানের জন্য এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই চর—ক্রমে এর ব্যাপ্তি ঘটবে। চাই কি প্রতাবশালী নদীখেকোরা এখানে এসে মাটি ভরাট করে ভবন তৈরির কাজে লেগে যাবে। বুড়িগঙ্গা পরিণত হবে সংকীর্ণ খালে, ক্রমে একসময় এই নদী তথা জলস্রোতের বিলুপ্তি—কোনো সদাশয় ইতিহাস-ঐতিহ্যমনস্ক ব্যক্তি এখানে একটি ফলক স্থাপন করে লিখে রাখবেন—‘এই খানে বুড়িগঙ্গা নামে একটি নদী ছিল’।

তখন ঢাকাবাসীর নানা প্রয়োজনে ‘এপার-হেপার’ করতে হবে না। ঢাকা-জিনজিরা-কেরানীগঞ্জ একাকার—মাঝখানে বহুতল সুরম্য ভবন, শপিং মল, রকমারি বিকিকিনির মার্কেট—যেভাবে বিলুপ্ত হয়েছে বুড়িগঙ্গা তীরে বাকল্যান্ড বাঁধের এক পাশে ইতিহাসখ্যাত ‘করোনেশন পার্ক’—রবীন্দ্রনাথ থেকে বহু খ্যাতনামা কীর্তিমান ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া ও বক্তৃতা-ভাষণে ধন্য করোনেশন পার্ক। তেমন পরিণতি কি অপেক্ষা করছে একদা খ্যাত নদী বুড়িঙ্গার জন্য?

চার.

নদী আমাদের প্রাণ। তবু নদীর কান্না আমরা শুনতে পাই না। ছোট ছোট নদী মরে যাচ্ছে, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের জলমান চিত্র থেকে। অথচ কার্যকর, ফলপ্রসূ ব্যবস্থায় ত্রুটি বা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে যেকোনো মূল্যে, সেই সঙ্গে ইতিহাসগন্ধি শীতলক্ষ্যাকে। বিশেষজ্ঞগণের মতামত নিয়ে সরকারের প্রধান কর্তব্য হবে ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও’ প্রকল্পের সূচনা ঘটানো এবং তা এখনই, কালবিলম্ব না করে।

এর আগে অনেক প্রতিবাদমুখর সমালোচনার মুখে এবং জাতীয় প্রয়োজনের বিবেচনা মাথায় রেখে ২০১০ সালে বুড়িগঙ্গা খনন করে নদীটিকে বাঁচাতে এবং এর নাব্যতা বৃদ্ধি করতে সরকার ১৪৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, দীর্ঘকাল পার হয়ে যাওয়ার পরও প্রকল্পের অগ্রগতি অর্ধেক পার হয়নি।

বলতে হয়, বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেরও বুড়িগঙ্গার মতোই মরণদশা। একটি দৈনিকে এ বিষয়ে একটি সংবাদ শিরোনাম: ‘বুড়িগঙ্গা খননের কাজ শেষ হয়নি ১১ বছরেও’ (৭-২-২০২০)। প্রশ্ন করতে হয়, এ উদাসীনতা, অবহেলার দায় কার বা কাদের। সংশ্লিষ্টদের এ কর্মকাণ্ড কি জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না?

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে প্রথমত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে, এক হাতে নয়, চার হাতে। অন্যদিকে খনন প্রকল্পটিতে প্রাণ সঞ্চার করে দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে জরুরি কার্যক্রমের তাগিদে। সেই সঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি এক্সপার্ট কমিটি গঠন করে তাদের সিদ্ধান্তক্রমে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত লিখেছেন : ‘বুড়িগঙ্গা একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত ও যোগাযোগে এর গুরুত্ব অপরিসীম।’ এ প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনায় না গিয়ে শুধু তাঁর মতামতটুকু তুলে ধরতে চাই। তাঁর মতে, ‘বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে একে যমুনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’ এ সম্পর্কে উল্লিখিত তারিখেরই এক ছোট্ট প্রতিবেদনে তিনি একটি ব্যবস্থাপত্রে সারকথা উল্লেখ করেছেন।

আমাদের কথা বিশেষ সর্বজনগ্রাহ্য মতামত নিয়ে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীকে কর্মসূচি গ্রহণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার হাল ধরতে হবে। বুড়িগঙ্গাকে মরতে দেওয়া যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, একে জরুরি প্রকল্পের আওতায় এনে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।

 লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা