kalerkantho

শনিবার । ২১ চৈত্র ১৪২৬। ৪ এপ্রিল ২০২০। ৯ শাবান ১৪৪১

বশেমুরপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন কেন জরুরি?

ড. সুলতানা আক্তার

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বশেমুরপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন কেন জরুরি?

সাম্প্রতিক সময়ে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরপ্রবি) ইতিহাস বিভাগের অনুমোদনের জন্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইউজিসির এক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইতিহাস বিভাগে আর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে না। কারণ হিসেবে ইউজিসি জানিয়েছে, বশেমুরপ্রবিতে কোনো অনুমোদন ছাড়াই ইতিহাস বিভাগ চালু করা হয়েছে এবং যেহেতু বশেমুরপ্রবি একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সে জন্য এখানে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন দেওয়া হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ইতিহাস বিভাগে ভর্তি বন্ধের নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করেছেন বশেমুরপ্রবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। গত ৬ ও ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। বশেমুপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদনের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। বশেমুরপ্রবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেছেন, তাঁদের দাবি মেনে না নিলে তাঁরা আমরণ অনশন করবেন। তাঁদের এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য, গত ১২ ও ২০ ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমাবেশ করেছেন। এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গত ১৬ ও ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমাবেশ করেছেন। এ ছাড়াও গত ১৮ ও ২০ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমাবেশ করেছেন। ওই সমাবেশগুলোতে বক্তারা বশেমুরপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন যাতে দেওয়া হয় সে বিষয়ে কথা বলেছেন। এদিকে গত ১৮ ও ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠক করে। ওই দিনই ইতিহাস বিভাগের অনুমোদনের বিষয়সহ সার্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইউজিসি অধ্যাপক ড. দিল আফরোজ বেগমকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির প্রতি আস্থা রেখে এবং ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান রেখে ২০ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, বশেমুরপ্রবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরুদ্দিন তিন বছর আগে ইউজিসির অনুমোদন না নিয়েই ইতিহাস বিভাগ চালু করেছিলেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইতিহাস বিভাগে প্রথম শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। বর্তমানে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪১৩ জন। এখন ইতিহাস বিভাগ বন্ধ হয়ে গেলে এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী? শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগের জন্য কি শিক্ষার্থীরা দায়ী? ইউজিসি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?

বশেমুরপ্রবিতে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইতিহাস বিভাগ চালু করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ইউজিসিকে একটি চিঠি দেন। কিন্তু ইউজিসি ইতিহাস বিভাগ খোলার অনুমতি দেয়নি। পরবর্তী সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরুদ্দিন ইতিহাস বিভাগ খোলার অনুমতি প্রদানের জন্য ইউজিসিকে আবারও চিঠি দেন। কিন্তু ইউজিসি চিঠির গুরুত্ব না দিয়ে ইতিহাস বিভাগ খোলার অনুমতি দেয়নি। অথচ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ইউজিসির চেয়ারম্যান নিজে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন। তখন তিনি কেন সেই বিষয়টি নজরে আনেননি? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়মের দায় কেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা বহন করবেন? উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সন্তান বৈধ বা অবৈধ যে প্রক্রিয়ায় জন্ম নিক না কেন জন্মের পরে কি তাকে মেরে ফেলবেন, না কি সঠিকভাবে লালন-পালন করবেন? অবৈধভাবে যদি সন্তান জন্ম নেয় তাহলে তার জন্য মা-বাবা দায়ী হতে পারেন। কিন্তু সন্তান কেন তার দায়ভার গ্রহণ করবে?

বশেমুরপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন কেন জরুরি সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করি। বশেমুরপ্রবিতে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদনের বিষয়ে ইউজিসি জানিয়েছে, যেহেতু এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাই এখানে ইতিহাস বিভাগ চালু করা যাবে না। কিন্তু ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজি বিভাগ চালু রয়েছে। তাহলে ইতিহাস বিভাগ কেন নয়? আবার ইউজিসির কথামতো অনুমতি না নিয়ে চালু করা হয়েছে তাই ইতিহাস বন্ধ করে দেওয়া হবে। অথচ তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনুমোদনহীন আটটি বিভাগ চালু করেছিল। এর মধ্যে সাতটি বিভাগের অনুমোদন দেওয়া হলেও একমাত্র ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ অন্যায় অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান নিজে একজন ইতিহাসবিদ এবং আশা করি তিনি ইতিহাস বিভাগের অনুমোদনের বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত দেবেন।

আমরা জানি ইতিহাস হচ্ছে জাতির পথ প্রদর্শক। ইতিহাসের মধ্যেই রয়েছে একটি জাতির গৌরবের বিষয়বস্তু। রাষ্ট্রের প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা উচিত। একটি জাতির অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে, যা দেশপ্রেম ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করতে হলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ইতিহাসবোধ তৈরি করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন না হলে আমাদের জাতীয় সংকটগুলো দূর হবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবোধের বীজ বপন করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঠিক চর্চা করা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঠিক চর্চা করার জন্য বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ বাধ্যতামূলক করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন না দেওয়া। যদি ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন না দেওয়া হয় তাহলে হেরে যাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, হেরে যাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, হেরে যাবে বাঙালি জাতি। তাই একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে ইউজিসির চেয়ারম্যানের উচিত ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা এবং অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অনুমোদন দেওয়া।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা