kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

কেন্দ্রীয় পরীক্ষার জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত

ড. মো. সহিদুজ্জামান

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কেন্দ্রীয় পরীক্ষার জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা একসঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। গত ২৩ জানুয়ারি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ইউজিসির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমন্বিত বা গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার যৌক্তিকতা নিয়ে কারো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। দেশের প্রেক্ষাপট, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি এবং আর্থিক অপচয়ের বিষয়টি বিবেচনা করে গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার বিকল্প নেই। তবে যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথমত এটি ইউজিসির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না? দ্বিতীয়ত সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে। প্রশ্নগুলোও নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার এ সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী, ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয়। তবে যাদের জন্য এই পরীক্ষা পদ্ধতি, তারা সত্যিকার অর্থে এই কাঙ্ক্ষিত পদ্ধতির সুফল কতটুকু ভোগ করবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।

কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রয়েছে, যেখানে একই রকম বিষয়ের জন্য (যেমন—প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপনা) আলাদা করে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। পাকিস্তানে সমন্বিত পদ্ধতিতে অথবা আলাদাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া (তাসমানিয়া বাদে) এবং নিউজিল্যান্ডের সব প্রদেশে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অথবা প্রাদেশিক আবেদন সার্ভিসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। ব্রাজিলে এজাতীয় সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি চালু আছে। চীনে ন্যাশনাল কলেজ এন্ট্রান্স এক্সাম পদ্ধতি চালু আছে। জার্মানিতে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা (আবিট্যুর) পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। হংকং সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে থাকে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে থাকে।

ইউজিসি এরই মধ্যে কৃষিসংশ্লিষ্ট সাতটি প্রতিষ্ঠানের গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা ও ভর্তি সুসম্পন্ন করেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে তারা বড় পরিসরে কাজটি করতে চাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে হলেও ভর্তিপ্রক্রিয়ায় ঝামেলা বেড়েছে। বেগ পোহাতে হয়েছে ভর্তি পরীক্ষা কমিটি ও শিক্ষার্থীদের। যেমন—প্রাথমিকভাবে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীকে অটোমাইগ্রেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখা, সিট ফাঁকা হওয়া সাপেক্ষে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে শিক্ষার্থীর পছন্দক্রম অনুসারে ভর্তি করাতে কালক্ষেপণ হওয়া। সর্বশেষ কিছুসংখ্যক ফাঁকা আসন থেকে যাওয়া। আবার আবেদনকৃত যোগ্য ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীদের আবেদন ফি নিয়ে তাদের নৈতিকভাবে বঞ্চিত করার বিষয়টি বেশ সমালোচিত। অল্প পরিসরে এ অভিজ্ঞতা অর্জন হলেও বড় পরিসরে বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় কতটুকু সফল হওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তা ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় ইউজিসির মূল দায়িত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত বছর সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে সেটিই দেখা গেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা (২০২০-২০২১) তিন স্তরে আয়োজন করা হবে বলে ইউজিসি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য—এই তিন শাখার জন্য আলাদাভাবে এক দিন করে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। পরবর্তী সময়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত পদ্ধতিতে (কিংবা যেভাবে তারা উপযুক্ত মনে করে) তাদের নিজ নিজ প্রয়োজনীয় শর্ত সংযোজন করে পৃথক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। নতুন করে আর পরীক্ষা না নিয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় পাওয়া স্কোরকে বিবেচনা করেই শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। ভর্তির পুরো কাজটি হবে অনলাইনে। ফলে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য আলাদা করে শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হলেও দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকবে। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী অভিন্ন প্রশ্নে পছন্দ করা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তাদের পরীক্ষা নেওয়ার সামর্থ্যের অতিরিক্ত আবেদন পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে মেধাক্রমানুযায়ী নিকটতম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষায়িত বিভাগগুলো, যেমন—স্থাপত্য, চারুকলা ও সংগীত তাদের প্রয়োজনমতো শুধু ব্যাবহারিক পরীক্ষা নিতে পারবে।

কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় আবেদনের যোগ্যতা কী হবে? সর্বনিম্ন কত জিপিএ লাগবে? আবেদনকৃত যোগ্য সবাইকে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে কি না? দ্বিতীয়বার পরীক্ষার সুযোগ থাকবে কি না? কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় পেছনের দিকের স্কোরপ্রাপ্তরা যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সুযোগ না পায়, তাহলে তাদের কী হবে? এক শাখার শিক্ষার্থীদের অন্য শাখায় পরীক্ষার সুযোগ থাকবে কি না? অসুস্থতা বা কোনো কারণে পরীক্ষা খারাপ হলে বা অংশগ্রহণ করতে না পারলে তাকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, নাকি বিশেষ কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। বিজ্ঞান শাখায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে প্রকৌশলী বা কৃষি পড়তে যারা আগ্রহী, তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে না। আবার যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ১০০-তে ৮০ নম্বরের বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাতে চায় সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মোট জিপিএ ১০ পেয়েও কেন্দ্রীয় পরীক্ষার স্কোর ৮০-এর কম হওয়ায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সুযোগ পাবে না। কেন্দ্রীয় পরীক্ষার স্কোর এ ক্ষেত্রে তাকে দারুণভাবে বঞ্চিত করবে।

আবেদনকৃত সব শিক্ষার্থী যাতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। জায়গা সংকুলান না হলে আবেদনকৃত সব যোগ্য প্রার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দুই শিফটে ৫০ শতাংশ করে আসন বণ্টন করে ভিন্ন সেট প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যেটি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় করে থাকে। অথবা আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভর্তির কাজগুলোর (প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, প্রিন্টিং, প্যাকেজিং ও সরবরাহ করতে) নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি থেকে যাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও আনুষঙ্গিক ফির ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য নিয়ে আসা উচিত। মোট কথা বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে আমাদেরও পরিপূর্ণ প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রয়োজনে আলাদা কোনো স্বাধীন সরকারি বা আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যেতে পারে, যা অন্যান্য দেশে রয়েছে। একটি প্রতিনিধিদলকে দু-একটি দেশে গিয়ে বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝা উচিত। এ ছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে ইউজিসির কোনো সদস্য নয়, কেন্দ্রীয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারী বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের রাখা উচিত।

যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষা ও পরবর্তী ভর্তিপ্রক্রিয়া একটি জটিল বিষয়, তবু দেশের যোগাযোগ, জনসংখ্যা, ভোগান্তি ও আর্থ-সামাজিক দিকগুলো বিবেচনা করে এ পদ্ধতির ব্যবহার প্রয়োজন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনভাবে পরীক্ষা নেওয়ার অধিকার আছে। তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত এই কেন্দ্রীয় গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি কমবে সেটি যেমন কাম্য, তদ্রূপ শিক্ষার্থীরা যাতে এর পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারে সেটিও কাম্য। অন্যথায় এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা