kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

ঘুরে দাঁড়ানো, বাস্তবতা আর আমাদের ক্রিকেট

ইকরামউজ্জমান

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ঘুরে দাঁড়ানো, বাস্তবতা আর আমাদের ক্রিকেট

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে ক্রীড়াঙ্গনের পক্ষ থেকে তারুণ্যের সবচেয়ে বড় উপহার আইসিসির বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। অসাধারণ এই বিজয় পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে, উদ্বেলিত, আনন্দিত, অনুপ্রাণিত ও বিশ্বাসকে মজবুত করেছে। তারুণ্যের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও প্রাণশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর প্রতিদান মাঠে মিলেছে। পাশাপাশি এই বিজয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সঠিক পদ্ধতির মধ্যে সযত্নে তারুণ্যের সম্ভাবনাকে ‘গ্রুম’ করা হলে দেশের ক্রিকেট চিত্র ধাপে ধাপে পাল্টাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

একসময়ের রাজরাজড়াদের খেলা, এখন গণমানুষের খেলা। ক্রিকেট এখন আর রাজার খেলা নয়, খেলার রাজা। যে ১৫ জন খেলোয়াড় জাতিকে গৌরান্বিত করেছেন পারফরম্যান্সের মাধ্যমে—এই তরুণরা কেউ রাজধানী ঢাকার নন। তাঁরা উচ্চমধ্যবিত্ত বা বিত্তবান পরিবারের সন্তান নন। সবাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন। তাঁদের বেশির ভাগের পারিবারিক ও সমাজ-জীবনের গল্প ব্যতিক্রমী।

দেশে যখন ক্রিকেট রসিক মহল অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট সেনাদের সাফল্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনায় মেতে আছেন, এমন সময় আজ ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে জাতীয় দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে খেলতে নামবে এক নাগাড়ে ছয় টেস্টে বড় বাজেভাবে পরাজয়ের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে। ছয়  টেস্টের মধ্যে আবার পাঁচ টেস্টে ইনিংস পরাজয়। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ দল পরাজিত হয়েছে ইনিংস ও ৪৪ রানে। আগামী এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানে গিয়ে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলবে করাচিতে। অর্থাৎ কর্মসূচি অনুযায়ী জিম্বাবুয়ের পর আবার পাকিস্তানের মুখোমুখি।

টেস্ট ক্রিকেটে এসেছে অনেক পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন টেস্ট ক্রিকেটকে করেছে আকর্ষণীয়। টেস্ট ক্রিকেট এখন হরহামেশাই ফলাফল উপহার দিচ্ছে। ফলহীন টেস্ট ক্রিকেট হারিয়ে যাচ্ছে।

জিম্বাবুয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নেই। তারা ১৪ মাসের বেশি সময় টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে ছিল বিভিন্ন কারণে। গত জানুয়ারি মাসে নিজ দেশে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটি টেস্ট খেলার মাধ্যমে ফিরে এসেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি টেস্টে হেরে সিরিজ পরাজিত হলেও দারুণ লড়াই করেছে। দ্বিতীয় টেস্ট, যেটি ড্র হয়েছে, এখানে শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে।

শনউইলিয়ামস—নিয়মিত অধিনায়ক, বাংলাদেশ সফরে আসেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব দেবেন ক্রেগ আরভিন। এ ছাড়া দলের দুই ‘পেসার’ রাইন জারভিস ও টেন্ডাই অতারা চোটে থাকায় দলে নেই। এই তিনজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি পূরণ করে খেলতে হবে জিম্বাবুয়ে দলকে। সফরকারী দলের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকায় এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক ক্রেগ আরভিন বলেছেন, আমরা টেস্টে জিততে এসেছি। ২০১৮ সালের নভেম্বরে সিলেটে প্রথম টেস্টে আমরা ১৫১ রানে জিতেছি। এরপর ঢাকার মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে ২১৮ রানে হেরেছি। সিরিজ ১-১ ড্র হয়েছে।

দেশের ক্রিকেট ভক্তদের কাছে জিম্বাবুয়ে সবচেয়ে পরিচিত দল। কখনো শক্তিশালী ভারসাম্যময় দল কখনো বা সাদামাটা দুর্বল দল নিয়ে বারবার এসে খেলেছে। টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে জিম্বাবুয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার বাংলাদেশ সফর করেছে। বাংলাদেশও বেশ কয়েকবার জিম্বাবুয়ে খেলতে গেছে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট মান নিয়ে কথা উঠলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভালো বন্ধু। যখনই তাদের চাওয়া হয়েছে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।

আজ মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭তম টেস্ট খেলতে নামবে জাতীয় দল। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেক হওয়ার পর থেকে আজকের টেস্ট শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ১১৮টি টেস্ট খেলেছে। এর মধ্যে জয় ১৩টি। আবার এই ১৩টির মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ছয়টি। ছয়টি টেস্টের মধ্যে (২০১৩ সালের এপ্রিলে হারারেতে বাংলাদেশ জিতেছে ১৪৩ রানে) পাঁচটি জিতেছে দেশের মাটিতে। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় ২২৬ রানে চট্টগ্রামে ২০০৫ সালে। প্রথম সিরিজ বিজয়ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। আজ আবার সব সংস্করণ মিলিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরু হওয়ার অপেক্ষা।

টেস্ট ক্রিকেট পরিবারে জিম্বাবুয়ের ভাবমূর্তি ভালো নয় বিভিন্ন কারণে। তারা অনেকটা অবহেলিত, ক্রিকেটের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ তাদের বিষয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। আগেই উল্লেখ করেছি, জিম্বাবুয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই সিরিজ এফটিপির অংশ। নিকট-ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হয়তো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট খেলার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাবে বলে মনে হয় না। ক্রিকেটের বাস্তবতায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় তেমন কিছু নয়, তবে হেরে গেলে কিন্তু রক্ষা নেই। সমালোচনার নদীতে প্রচুর নাকানিচুবানি খেতে হবে। বাস্তব ও ভবিষ্যতের মাঝখানে একটা ধূসর এলাকা থাকেই বারবার।

জাতীয় দল কঠিন সময়ে খর্ব শক্তির অধিকারী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলতে নামবে। যে প্রশ্নটি ক্রিকেট প্রেমিকদের মুখে মুখে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ কি পারবে টানা ছয় টেস্টে পরাজয়ের বৃত্ত থেকে জয়ের স্বাদ নিয়ে বেরিয়ে আসতে? যদি সম্ভব হয় এটি হবে মনের অন্ধকার ঘরে বাতি জ্বালানো, অস্বস্তি থেকে মুক্তি এবং হাঁফ ছেড়ে বাঁচা। ‘পরাজয়’ সব সময় পেছনে ফেলে রাখে। আর জয় রোগ সারানোর ভালো পথ্য। বাংলাদেশ কি পারবে এবার ‘হোম অ্যাডভানটেজের’ সুযোগ নিতে? সব দেশ যেভাবে নিশ্চিত করে। সমস্যা হলো, নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্ট তো নিজের দেশের উইকেট চিনতে ব্যর্থ। বুঝতে ব্যর্থ উইকেট কী ধরনের আচরণ করতে পারে। এর জন্যই ২০১৮ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এবং ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে করুণ পরাজয়ের স্বাদ হজম করতে হয়েছে। অতীতে কিন্তু ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শতভাগ ‘হোম অ্যাডভানটেজকে’ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ জিতেছে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষবারের মতো টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছিল ২০১৮ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। জয়ের নায়ক (২১৯ রান) মুশফিকুর রহিম। ধৈর্যের সঙ্গে অসাধারণ ব্যাটিং। এবার সেই মুশফিক আছেন, সাকিব, মাহমুদ উল্লাহ নেই। জিম্বাবুয়ের শনউইলিয়ামস নেই, নেই কাইল-জার্ভিস প্রমুখ। উভয় দলেই পরিবর্তন এসেছে। ক্রিকেটে অতীতের গুরুত্ব আছে ঠিকই, তবে নতুন সময়ের নতুন খেলাটাই আসল। যুদ্ধ তো শুধু ব্যাটে-বলে হয় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টেস্ট খেলার মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য, সাহস, মানসিক শক্তি, শৃঙ্খলা, মাইন্ডসেট এবং সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে ম্যাচ পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার বিষয়।

লাল বলের দীর্ঘ সময়ের টেস্ট ক্রিকেট খেলা সব ক্রিকেটারের স্বপ্ন। কিন্তু এই খেলা খেলতে হলে যে বিষয়গুলো রপ্ত করতে হয়, সেগুলো রপ্ত করতে না পারলে টেস্ট ক্রিকেটে সফল হওয়া সম্ভব হবে না। টেস্ট সবচেয়ে কঠিন ক্রিকেট। খেলোয়াড়দের মধ্যে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ইতিবাচক উপলব্ধি লক্ষণীয় হচ্ছে সেটি, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিম্নমানের উইকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন খেলায় প্রচুর রান করা আর উইকেট নেওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটের অনেক পার্থক্য।

জাতীয় দলের প্রধান সমস্যা হলো, যোগ্য খেলোয়াড়ের অভাব। বহুল আলোচিত পাঁচজনের মধ্যে  একসঙ্গে  তো তিনজনকে বেশ লম্বা সময় ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। এবার তো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুজন। মাহমুদ উল্লাহকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, গত কয়েক টেস্টে পারফরম করতে না পারায় তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অতএব নির্বাচকরা সব সময় যুদ্ধ করছেন।

এ ছাড়া ‘চোট’ তো লাগাতারভাবে শত্রুতা করে চলেছে জাতীয় দলের বিরুদ্ধে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরমাররা শূন্যস্থান পূরণ করতে পারছেন না। খেলোয়াড়রা সবাই মিলে খেলতে পারছেন না একটি দল হিসেবে। খেলোয়াড়দের মাঠের লড়াইয়ে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ভাটার টান চলছে। যিনি ড্রেসিংরুমে এবং মাঠে লড়াইয়ের মনোভাবের উষ্ণতার আমেজ দিয়ে রাখবেন, তাঁকে তো পারফরমার এবং অনেক গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফরমার কেউ কেউ। প্রচুর বিশ্লেষণে ভূষিত টাইগার। বাইরে গেলে সেই টাইগার বিড়াল। এই রোগ সারানোর পথ্য কী?

টেস্ট ম্যাচে ব্যাটিংয়ে করুণ দশা। ৩০০ বা এর বেশি রানের ইনিংস তো অকল্পনীয়। ছন্নছাড়া ব্যাটিং আর বড় সাধারণ মানের মাথা না খাটিয়ে বোলিং টেস্ট দলকে ডোবাচ্ছে। বাংলাদেশকে এবার বেশি টেস্ট খেলতে হবে বিগত বছরের তুলনায়। এতে করে শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানের রসকষহীন বইয়ে কী লক্ষণীয় হবে, এটি অবশ্যই ভাবার বিষয়।

দল নির্বাচন নিয়ে সব সময় এক ধরনের লুকোচুরি এবং অস্বচ্ছ খেল চলে। এতে বিতর্কের জন্ম হয়। অথচ সোজাভাবে সহজ কথাগুলো বললেই অনেক আলোচনার আর অবকাশ হয় না। চাকরি, কম্প্রোমাইজ—এ সব কিছু আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কাকে কেন বিবেচনা করা হয়েছে, কেন বিবেচনা করা হয়নি—এটা মিডিয়া জানতে চাইবে। এটা তার কাজ। স্কোয়াড গঠনের নামে অবাস্তব চিন্তাভাবনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা—সব কিছু বুঝেও নন-পারফরমারকে তুলে ধরার চেষ্টা, চোটে আছেন এমন খেলোয়াড়কে সুযোগ দেওয়া—এসব নিয়ে কথা উঠবেই।

পাঁচজন ‘পেসার’ আর দুজন স্পেশালিস্ট স্পিনার। ১৩ জনের দলে দুজনের বেশি ‘প্রেসার’ থাকছেন না। স্পিন ধরা উইকেটে স্পিন আক্রমণ বাংলাদেশের ক্রিকেটে অন্যতম শক্তি। এ ক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে স্পিন আক্রমণ কতটুকু কামিয়াব হবে, এটি নিয়ে কথা উঠেছে। বাস্তবতায় যাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন তাঁদের প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখতে হবে। নির্বাচকরা প্রতিবারই একই কায়দায় স্কোয়াড ঘোষণা করেন। নতুন কিছু দেওয়ার অবস্থা তো নেই। এবার কার স্কোয়াডে নতুন নাম—ইয়াসির আলী এবং হাসান মাহমুদ। ব্যাটসম্যান এবং বোলার—একজনের মাথায় কি তিনি উঠবেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি (১১৩) উইকেট নিয়েছেন সাকিব আল হাসান। তাহলে তো স্পিনাররাই এগিয়ে দুই দেশের লড়াইয়ে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা