kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

ভাষার মাসে ভাষার প্রশ্ন

ড. মো. আনিসুজ্জামান

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভাষার মাসে ভাষার প্রশ্ন

যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম ভাষা। ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ভাষা নয়। ভাষাহীন ভাব প্রকাশ করা যায়, পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। ভাষা অপরিবর্তনীয় কোনো স্থির বিষয় নয়। ভাষা পরিবর্তিত হয়। গবেষকদের বর্ণনা অনুসারে বাংলা বর্ণমালা উদ্ভব হয় ব্রাহ্মীলিপির ‘কুটিল’ রূপভেদ থেকে সপ্তম শতাব্দীতে। অষ্টম শতাব্দীতে রচিত আর্যমঞ্জুশ্রী-মূলকল্প সংস্কৃত গ্রন্থে দেখা যায়, গৌড় ও পুণ্ড্রের লোকেরা ‘অসুর-ভাষা’-ভাষী (অসুরাণাং ভবেৎ বাচা-গৌড়-পুণ্ড্রোদ্ভবা সদা)।’ মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, “এই ‘অসুর-ভাষা’ যে ‘অস্ট্রিক’-বুলি তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। বর্তমান বাংলা ভাষা প্রচলিত হইবার পূর্বে আমাদের দেশে যে এই ‘অসুর-ভাষা’ বা ‘অস্ট্রিক’ বুলি প্রচলিত ছিল, তাহাতে কোনো সন্দেহ নেই।” বাংলা ভাষায় অস্ট্রিক ভাষার কিছু শব্দ এখনো রয়েছে।

ভাষা পরিবর্তিত হয়। ভদ্রজনের ভাষা সব সময় এক থাকে না। শাসক শ্রেণির ভাষা ভদ্র সমাজ এবং ভদ্রজনেরা আত্মস্থ করে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর ভাষার গুরুত্ব নির্ভর করে। রাজ ভাষা সব সময় গুরুত্ব পেয়েছে। শাসনক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ভাষা গুরুত্বহীন হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাষা বেশির ভাগ সময় গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। রাজার ভাষা ভুলভাবে লিখতে এবং বলতে পারলেও আর্থিকভাবে সুন্দর ও ভালোভাবে জীবনযাপন করা যায়। বর্তমানে চায়নিজদের ইংরেজি এবং উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক ইংরেজি ভাষার ব্যবহার দেখলে কিছুটা অনুমান করা যায়।

বাংলাদেশের রাজধানীকেন্দ্রিক মানুষের অফিশিয়াল কাজকর্মের ভাষা প্রায় ইংরেজি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের পূর্বে ইংরেজি ভাষার এ অঞ্চলে কোনো গুরুত্ব ছিল না। এ অঞ্চলের মানুষ তখন ইংরেজি জানত—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ভদ্রজনের ভাষা ছিল রাজ ভাষা ফার্সি। মীর মশাররফ হোসেনের বাবা বাংলা ভাষাকে ঘৃণা না করলেও লিখতেন না। তিনি ফার্সি ভাষায় চিঠিপত্রে সাইন করতেন। নবাব আব্দুল লতিফের মোহামেডান লিটারেরি সোইসাটিতে ফার্সি, ইংরেজি, উর্দু ভাষায় আলোচনা হলেও বাংলা ভাষার স্থান হয়নি। বাঙালি মুসলিম নবজাগরণের অগ্রদূত নবাব আব্দুল লতিফ মনে করতেন, বাংলা ছোটলোকের ভাষা। বাংলা ছিল সাধারণ লোকের, শ্রমজীবী মানুষের ভাষা। বাংলা ভাষা এখনো তথাকথিত অভিজাত সমাজে মূল্যায়ন হয়নি। বর্তমানে আরবি, ফার্সি, উর্দুর মানসিকতা দূর হলেও ইংরেজি চেপে বসেছে অর্থে-বৃত্তে প্রভাব প্রতিপতিত্বে এবং ক্ষমতাবান বাঙালি সমাজে। কিছুদিন আগে সিলেবাসসংক্রান্ত কাজে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে এক সভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অভিজ্ঞ শিক্ষক বললেন তিনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভালো বলে। আরেকজন প্রফেসর বললেন, তাঁদের ওখানে একটি কোর্স বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজিতে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি লেখে কেমন? তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। বাংলা বলতে পারলেও লিখতে পারে না। একাধিক ভাষায় দক্ষতা থাকলে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ আশানুরূপ না হলেও মোটামুটি হচ্ছে। কিন্তু জার্মান, গ্রিক, সংস্কৃত, ল্যাটিন, হিব্রু থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ নেই বললেই চলে।

মাতৃভাষা ভুলে বিদেশি ভাষা ভুলভাবে আয়ত্ত করার মধ্যে মাহাত্ম্য কি বোঝা কঠিন। কোনো ব্রিটিশের কাছে শুনিনি যে ইংরেজি জানে না অথচ আরবি কিংবা উর্দু জানে। লন্ডনের রাস্তায় চলতে-ফিরতে অনেককেই বলতে শুনেছি ‘নো অ্যাংলে’। তারা ইংরেজি জানে কিন্তু বলবে না। বাঙালি মুসলমানরা ইংরেজি জানাকে আভিজাত্য প্রকাশের রূপ হিসেবে গণ্য করে। বাংলা ভাষার মধ্যে ইংরেজি কোটেশনের ব্যবহার করার অভ্যাস বহু পুরনো। আজকাল ওয়াজের মধ্যেও ইংরেজি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ফলে মাতৃভাষা এবং ইংরেজি দুটিই বিষাদগ্রস্ত হচ্ছে।

উচ্চ শিক্ষায় একাধিক ভাষার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তবে মাতৃভাষার জ্ঞান সবার আগে। মাতৃভাষাকে দ্বিতীয় স্তরে বা শ্রমজীবী মানুষের ভাষার স্তরে রেখে অর্থকরী ভাষাকে প্রধান হিসেবে দেখার মধ্যে জাত্যাভিমান কাজ করে। আরবি, উর্দু, সংস্কৃত, ফার্সি বিভাগের শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজি পড়তে হয়। কিন্তু ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীকে বাংলা পড়তে হয় না। ল্যাটিনও পড়তে হয় না। কারণ ধরেই নেওয়া হয়েছে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা একাধিক ভাষায় দক্ষ। কিন্তু এই ধরে নেওয়াটা কতটা সত্য? ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষার্থীদের বাংলার অবস্থা দেখলে কিছুটা অনুমান করা যায়। এর উল্টো পিঠে গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি ভাষার জ্ঞান সস্তোষজনক নয়। তাদের বাংলার অবস্থা খুব যে ভালো এমন নয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত উচ্চমানের বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ রয়েছে, যেগুলোতে ভুল বাক্য এবং ভুল শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য বইগুলোতে ভুল বাক্য  ভুল শব্দের ব্যবহার যেন দেখার কেউ নেই।

ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রয়োজন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রধান মাধ্যম ইংরেজি ভাষা। পৃথিবীর যেকোনো ভালো গ্রন্থ ইংরেজি ভাষায় দ্রুত অনুবাদ হয়। বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদকের সমস্যার কথা সর্বজনবিদিত। ইংরেজি ভাষার অর্থনীতি মজবুত। ফলে আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং বহির্বিশ্বে সমাদৃত হওয়ার একমাত্র ভাষা ইংরেজি। রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, আমলা, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নিজেদের আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা ইংরেজি মাধ্যমে নিশ্চিত করেন। ঢাকায় যখন হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছিল তখনো অভিজাত সম্প্রদায় বক্তব্য বিবৃতিতে বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান নিলেও নিজের সন্তানের লেখাপড়া ইংরেজি মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন। এ সম্পর্কে আহমাদ শরীফ লিখেছেন, ‘যত দূর মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশকে ইংরেজি বিভাগের খান সারওয়ার মুর্শিদ এবং বাংলা বিভাগের মুনীর চৌধুরীই বাংলায় দরখাস্ত ও সই করা শুরু করেন। কিন্তু দুজনই সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই পড়িয়েছেন এবং ঘরেও ইংরেজিতেই সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতেন তাদের কথ্য ইংরেজিতে পাকা করে তোলার লক্ষ্যে। একদিন বাংলা মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের এবং জীবনের সব সময়ে সরকারি ও বেসরকারি সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের ঔচিত্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মুনীর চৌধুরী কোনো এক সভায় বক্তৃতা দিয়ে আমার সঙ্গেই ফিরছিলেন। আমি কথা প্রসঙ্গে তাঁকে বললাম, বাংলার পক্ষে তো জোড়ালো বক্তৃতা দিয়ে এলেন, কিন্তু নিজের সন্তানদের তো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছেন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘পাগল নাকি, আমার নিজের সন্তানের সর্বনাশ করব নাকি!’ দেখা যাচ্ছে, গোড়া থেকেই আজ অবধি এবং পরেরও সব ধনী-মানি শিক্ষিত লোকের ইংরেজি প্রীতি এবং বাংলার প্রতি অবজ্ঞা চালু রয়েছে এবং থাকবে। আগেও শিক্ষিত ভদ্রজনরা নিজের সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করেছেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। উনিশ শতকের শুরুতে বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে সন্তানকে ইংরেজি শিখিয়েছেন কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রজনরা। বর্তমানেও শিক্ষিত ভদ্র অভিজাতজনরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট কম করেন। ইংরেজি প্রীতি রয়েছে। বিপরীত মেরুতে রয়েছে গ্রামের স্কুল, যেখানে ইংরেজি শেখানো হয় বাংলা মাধ্যমে। ফলে ইংরেজি আর শেখানো হয় না। মাদরাসায় ইংরেজি এখনো প্রবেশ করেনি। ফলে শ্রেণিবিভক্তি প্রবল হচ্ছে।

বঙ্গীয় রেনেসাঁসের শুরুর দিকে রাজ ভাষা ইংরেজি প্রীতি প্রবল ছিল। অফিসের ভাষা ফার্সির স্থলে ইংরেজি হওয়ায় সরকারি চাকরিতে ইংরেজি জানা লোকের একচেটিয়া অধিকার ছিল। বাঙালিদের মধ্যে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার নিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, ‘একবার ঝড় হইয়া একখানি জাহাজ গঙ্গীর তীরে লাগিয়া আড় হইয়া পড়ে। পরদিন সেই জাহাজের সরকার বাবু ইংরেজ প্রভুকে আসিয়া বলিতেছেন, শার্ শার্ শিপ ইজ এইট্টিওয়ান। অর্থাৎ জাহাজ একাশি হইয়া পড়িয়াছে।’ এমন ইংরেজি জানা লোকের এখনো সমাদর কমেনি। যেমন আমার এক বন্ধু গল্প করেছেন তার চায়নিজ সহযোগী বলেছেন, ‘মি অ্যান্ড ইউ গো সেইম। অর্থাৎ তুমি আর আমি এক সঙ্গে যাব।’ ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম হওয়ায় এ ধরনের বাক্য প্রয়োগে কারো বোঝার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হয়নি। একটা সময় ছিল, যখন ভাষা জানাকে জ্ঞানী মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে ভাষায় দক্ষতা কিছুটা প্রযুক্তি লাঘব করেছে। ভবিষ্যতে হয়তো প্রযুক্তির কল্যাণে ভাষা আরো সহজ হবে। প্রযুক্তি বিশ্বায়নকে সম্ভব করেছে, ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদায় উন্নীত করতে হলে প্রথমে মাতৃভাষা এবং পরে অন্যান্য ভাষায় দক্ষতা প্রয়োজন। শুধু ইংরেজি ভাষাভাষিদের নজরে আসার জন্য ইংরেজি জানা কি খুব জরুরি?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা