kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

ভারতে নানা বিভাজিকা আবার জেগে না ওঠে!

জয়ন্ত ঘোষাল

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতে নানা বিভাজিকা আবার জেগে না ওঠে!

কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন থেকে প্রকাশিত হয় ‘বৈশাখী’ নামের পত্রিকাটি। আগামী বৈশাখ মাসে এটি ১৬ বছরে পা দেবে। দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক-বাহক এই পত্রিকা। কোনো একটি দূতাবাস থেকে এই ধরনের উন্নত মানসম্পন্ন পত্রিকা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকাশ করে যাওয়া সহজ কাজ নয়। বৈশাখীর সর্বশেষ সংখ্যায় অশোকেন্দু সেনগুপ্তর বাংলাদেশ ভ্রমণ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক লিখেছেন, যদি সুজলা-সুফলা বাংলার ছবিটা দেখতে চান, যদি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত কেমন বুঝতে চান, যদি মাতৃভাষার প্রতি নিজ কর্তব্য কী তা বুঝতে চান, তাহলে যেতেই হবে বাংলাদেশে। কক্সবাজার সমুদ্রতট না দেখলে যেমন সমুদ্র দেখার সাধ অসম্পূর্ণ থাকে, যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ না থাকলে ভাষা ও ভালোবাসার সম্পর্কটি অপরিচিত থেকে যায় চিরতরে, তেমনি পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশ না থাকলে বাংলা সংস্কৃতির আবেগ আর প্রাসঙ্গিকতা অস্পষ্ট থাকে।

এই রচনাটি পড়তে পড়তে মনে হলো, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দুটি সত্তার সন্মিলন আছে—একটি ধর্মীয় সত্তা আর অন্যটি হলো ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র আর পশ্চিমবাংলা নানা ভাষার দেশ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য।

ভারতের নাগরিকত্ব বিল, সিএএ ক্যা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তাতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে সেটি এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদির সরকার কতটা বুঝতে পেরেছে জানি না, তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে এই বিলটি নিয়ে যে ‘মিস হ্যান্ডলিং’ হয়েছে ভারতের বিদেশ নীতিতে তার জন্য অনেক বড় খেসারত আমাদের দিতে হতে পারে। মোদি এই আইনের মাধ্যমে এখনই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের ঢাকায় পাঠাবেন—এমন কখনোই নয়; বরং মোদি নানা মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন একজন বাংলাদেশি মুসলমানকেও ঢাকায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে না; বরং উদ্বাস্তু হিন্দুদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিয়ে তো ঢাকা সরকারের শঙ্কা দূর করছেন। তবু যেভাবে বিজেপি, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, এ বিষয়ে প্রচার চালাচ্ছে, অনুপ্রবেশকারী মুসলমান ও হিন্দু শরণার্থীদের মধ্যে মেরুকরণ হচ্ছে। এর ফলে বিপদটা কোথায় হচ্ছে?

প্রথমত ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের মধ্যেও মৌলবাদী জামায়াত ও উগ্র ইসলামিক শক্তি আছে। শেখ মুজিব অন্য সব ধর্মীয় সংগঠন স্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের মূল সুর বারবার প্রাধান্য পেয়েছে। বৈশাখীর প্রবন্ধেও এই ভাষার সংস্কৃতির মূল সুরটি ধরা পড়েছে। কিন্তু ভারত যদি মুসলমানবিরোধী রাষ্ট্র বলে বিশ্বের কাছে প্রতিপন্ন হয়, তবে কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ভেতর পাল্টা ইসলামিক শক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়তে থাকবে। এরই মধ্যেই জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধির বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগের সমর্থনকারী গোঁড়া ইসলামিক সংগঠন ও প্রবীণ মৌলবাদী নেতাদের ভূমিকা বেশি প্রাসঙ্গিক হচ্ছে।

অতএব সাধু সাবধান! নাগরিকপঞ্জি গঠন করা কোনো অন্যায় নয়। যেকোনো সভ্য দেশে ভিসা ছাড়া ভিনদেশের নাগরিককে থাকতে দেওয়া হয় না। অবৈধ বসবাসকারী নিয়ে গোটা দুনিয়াজুড়ে রক্ষণশীল রাষ্ট্রবাদীরা তুলকালাম করছেন। এই নাগরিকপঞ্জি হওয়া উচিত বলে আমিও মনে করি। কিন্তু এই মুহূর্তে ভারতের সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বন্ধুরাষ্ট্র হলো বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারত তার বন্ধুত্বের এই নিদর্শন রাখল—এ প্রশ্ন উঠেছে। আমি আশা করি দল বা সংঘ পরিবার যা-ই বলুক, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি অবিলম্বে এ ব্যাপারে সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দেবেন। তা না হলে মৌলবাদের প্রসারের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াবে। প্রায় তিন বছর ধরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের কোনো হাইকমিশনার ছিলেন না। এর আগে যিনি ছিলেন তাঁর সম্পর্কে অভিযোগ উঠে যে তিনি মৌলবাদীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকে ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ জন্য তাঁকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে  দেওয়া হয়। আজ এত বছর পর ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনার নিযুক্ত হয়েছেন। খুব সংক্ষিপ্ত ঘটনা কিন্তু তাত্পর্যবহ। শেখ হাসিনার সর্বশেষ দিল্লি সফরের আগে ইমরান খান হঠাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন এবং তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নেন। শেখ হাসিনার দিল্লির রিসেপশনে আমি দেখেছিলাম পাকিস্তানে কর্মরত উপহাইকমিশনার এসেছিলেন তাঁকে সম্মান জানাতে। এসব ছোট ছোট ঘটনা কূটনীতিতে তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখন তো সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে যে ইমরান খান ঢাকা সফরে যেতেও আগ্রহী। পাকিস্তান এ ব্যাপারে সরকারিভাবে না হলেও ঘরোয়াভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব ঘটনাবলি কি ভারতের উদ্বেগ এখনো বাড়াচ্ছে না? চীন ও পাকিস্তান এই ঘটনায় যে বিশেষ আহ্লাদিত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে কি? কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা অবলুপ্তিতে মুখে না বললেও বাংলাদেশের ইসলামিক মননে অসন্তোষ আছে। পাকিস্তান প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলেও শেখ হাসিনা এটাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেছেন বটে; কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে বিরূপতা আছে তা মানতেই হবে।

এদিকে শেখ হাসিনার বয়স হচ্ছে। তিনি তো চিরকাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়েও বহু খবর পড়ছি ঢাকার সংবাদপত্রে। তাঁর সুদীর্ঘ জীবন কামনা করি, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে মনে মনে প্রশ্ন জাগছে তাঁর পর কে হবেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী? আওয়ামী লীগেও নানা সংকট। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মতো। আবার সম্প্রতি বহু প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুও হলো। শেখ হাসিনার পর তাঁর ছেলে বা কন্যা বা বোন কেউ রাজনীতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কি না তাও স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় ক্যা নামক আইনটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিজেপির বড় অস্ত্র হলেও বিদেশনীতির জন্য শিরপীড়ার কারণ।

পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘু তাত্পর্যহীন। অস্তিত্বহীন। অতীতে পাকিস্তানে হিন্দু বা শিখ ধর্মাবলম্বীদেরও ভূমিকা ছিল। গুরু নানক তো জীবনের দীর্ঘ সময় পাকিস্তানেই কাটান। সে দেশেই তাঁর জন্ম ও মৃত্যু। নানকের লেখা বাবুর নামার কবিতা আজও শিখ ধর্মাবলম্বীরা পড়েন, আলোচনা করেন। পাকিস্তানে কত গুরুদ্বার। (জিজ্ঞাসু পাঠক পড়তে পারেন ‘কত স্থানে নানক পরিব্রাজক হয়ে ঘুরেছেন। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্বের গবেষক হারুন খালিদের লেখা ডধষশরহম রিঃয ঘধহধশ বইটি থেকে জানা যায় কিভাবে নানক তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় পাকিস্তানেই কাটান। বাবুর পাকিস্তান (তৎকালীন) এলাকায় আক্রমণ হানেন সেই মোগল আমলে। নানক বাবুর বাণী নামে এক কবিতা লেখেন। এই রচনা থেকে জানা যায় নানক উর্দুপ্রেমী হয়েও কিভাবে সব ধর্মের সমন্বয় চেয়েছিলেন। নানক জন্মান দিল্লির সুলতান এলাকায় আর তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ হয় আজকের পাকিস্তানের কর্তারপুরে)।’ কিন্তু আজ পাকিস্তানে মুসলিম, হিন্দু, শিখ, বা খ্রিস্টানরা কতটুকু? ইসলামিক মুসলমান রাষ্ট্র হয়েও পাকিস্তান কি যথার্থ হোমোজেনিয়াম রাষ্ট্র হতে পেরেছে? উল্টো মুসলমান সমাজের মধ্যেই কত ভেদাভেদ বেড়েছে। শিয়া বনাম সুন্নি, বালুচ বনাম পাঞ্জাব কত সংঘাত! তাই ভয় হয়, ভারত যদি সত্যি সত্যিই শুধু হিন্দুদের রাষ্ট্র হয়ে যায়, তবে এ দেশে ব্রাহ্মণ বনাম দলিত, হিন্দিভাষী বনাম বাঙালি, আর্য বনাম দ্রাবিড় নানা বিভাজিকা আবার ঘুম থেকে জেগে না ওঠে।

ভারতীয় মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, আরব দেশ থেকে তুর্কি ও আরো নানা সম্প্রদায় ভারতে একদা এসেছে। মোগলরা এসেছে এ দেশে, এক দীর্ঘকাল শাসন করেছে, নানা জাতির সংমিশ্রণে এক নব্য ভারতীয়ত্ব গড়ে উঠেছে। এই ভারতীয়ত্বর মধ্যে মিশ্র সংস্কৃতির স্বরূপ আছে; বরং ব্রিটিশরা ইংরেজি শিক্ষা ও প্রশাসন বদলেও তারা বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসকই থেকে গেছে, তারা কখনোই ভারতীয় হয়নি। মোদি সরকার অবশ্য বারবার বলছে বিজেপি বা তার সরকার মুসলিমবিরোধী নয়। তবু বাস্তবের জমিতে এই ধারণা যে তৈরি হয়েছে তা তো অস্বীকার করা যায় না। তা হলে মোদি যে পৃথিবীর মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, তা কি ভ্রান্ত ধারণা? বাস্তব নয়? কয়দিন আগে শুনেছিলাম, তুরস্কের মতো রাষ্ট্রের সঙ্গেও আজকাল ফোনে কথাবার্তা বলছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। আর এখন শুনছি তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান পাকিস্তান যাচ্ছেন ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করতে।

সাধু সাবধান! এখনো সময় আছে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা