kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বোতলবন্দি দৈত্য অথবা শাসকের ইচ্ছা

বাহারউদ্দিন

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বোতলবন্দি দৈত্য অথবা শাসকের ইচ্ছা

অহিংস আন্দোলনে, সত্যাগ্রহের পুনর্বিন্যাসে তরুণ ভারত  আবার জাগ্রত। ছদ্মবেশী বীভেসর বিরুদ্ধে তার লড়াই যেমন বাড়ছে, ছড়াচ্ছে নানা প্রান্তে। তেমনই উগ্রতার বমন আর উদ্গীরণ লাগামহীন হয়ে উঠছে।

তাবড় তাবড় নেতারা মন্ত্রগুপ্তি লঙ্ঘন করেই বারবার উসকানিমূলক মন্তব্য ঝেড়ে যাচ্ছেন। ভোটের ময়দানে, কখনো বা বহুজনের মঞ্চে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় স্তরে এ রকম প্ররোচনা বহু দিন দেখা যায়নি। বিরোধী নেতারাও আক্রমণাত্মক অস্ত্রে অনবরত শাণ দিচ্ছেন। যেন নাগরিকপঞ্জি কিংবা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বাইরে অন্য কোনো সমস্যা নেই। মন্দা, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট কি কোনো ইস্যু নয়? হাঙ্গামায় মৃত্যু, গার্হস্থ্য অপরাধ, চোখের আড়ালের দুর্নীতি, কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ইত্যাদি বিষয় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখতেই কি শাসক আর তার আপাতবিরুদ্ধ সহযোগীরা তাদের ভেতর ও বাইরের দৃশ্যমান, ভাসমান কলরবকে ক্রমাগত চওড়া করছেন?

সর্বভারতীয় নাগরিকপঞ্জির নবায়ন এখনো আঁতুড়ঘরে। অসন্তোষের হুমকিতে সরকার সংশয়াচ্ছন্ন। সিএএর মতো নির্বোধ আইন আত্মঘাতী হাতিয়ার ছাড়া আর কী? যা ক্রমেই ভারী হচ্ছে, ঢেউ তুলছে জনস্রোতে। এ রকম ঘটনা—ব্রিটিশ আমলের সিপাহি বিদ্রোহে, গত শতাব্দীর ৮০-৯০-এর দশকে, এর পরেও শিখ গণহত্যায়, শাহবানু মামলার সদর্থক রায় ও সুপারিশকে উড়িয়ে দিয়ে শাসকের আপসকামী সিদ্ধান্তে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসে, অসমের নেলি ও গুজরাটে নির্বিচারে মানুষ খুন প্রতিটি অপকাণ্ডে বারবার দেখা গেছে। যেখানে রাষ্ট্র আর তার সহযোগীদের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। বিরুদ্ধশক্তির তৎপরতাও কখনো রহস্যময়, কখনো স্বার্থসর্বস্ব।

সাম্প্রতিক ভারত যে সংকটে আর সংক্রামক অসুখের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, তার উপশম খুঁজতে বহুমুখী রাজনীতির সংযত ভাষণের চেয়ে অনৈক্য আর সংশয়ের মূর্তিরূপী হল্লার ধার অনেক বেশি। কিন্তু প্রতিবাদের মঞ্চে, শ্রেণিহীন, বর্ণহীন সমাবেশে নবপ্রজন্ম এবং আমাদের মায়েদের সমবেত নির্ভয়, সজল কণ্ঠস্বর প্রমাণ করছে—ব্যক্তি ও সমষ্টির শক্তিমুখর রাজনীতি তাদের কাছে তুচ্ছ। ভাষিক কিংবা সাম্প্রদায়িক স্বার্থের চেয়ে দেশপ্রেম অনেক বড়। প্রেমের মহিমা ও মানবতাকে দলীয় ক্ষুদ্রতা, আপসপন্থা, যতটা হেয় করছে, যেভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে, এসবের বিরুদ্ধে তার চেয়ে অধিকতর, কঠোর, কঠোরতম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে যেমন দিল্লির শাহিনবাগ, কলকাতার পাকসার্কাস, লখনউর ঘড়ির মোড়। গুলির বদলে, হুমকির বদলে, কর্কশ গালির বদলে সংযত আবেগ আর যুক্তির জোর যে কী প্রবল, কী দীর্ঘস্থায়ী—কালজয়ী, আমাদের ইতিহাসে, আমাদের ঐতিহ্যে ছড়িয়ে আছে তার স্বশাসিত, স্বনির্ভর অসংখ্য দৃষ্টান্ত। গান্ধীজির সত্যাগ্রহ ও যুদ্ধজয়ের অহিংস সংকল্প আবার ফিরে আসছে। গণ-আন্দোলনে, দ্রোহের অহিংস উচ্চারণে মহাত্মার প্রাসঙ্গিকতাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ভারতের সরব ও আত্মপ্রত্যয়ী চতুষ্কোণ। বিশেষ করে এই মুহূর্তে। বিভেদের নাগরিকপঞ্জি, নাগরিকত্ব আইন যার অন্য এক সম্প্রসারণমাত্র, তার শঙ্কাজনিত বিরোধিতা গান্ধীজিকে যেভাবে ফিরিয়ে আনল, তা এক বিরল ঘটনা। অবশ্যই। আবার এই দুই অনাকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াকে চাপিয়ে দিতে গিয়ে যাঁরা রুচি, যুক্তি ও আবহমান ঐতিহ্যে বিষ ছড়াচ্ছেন, ঘনঘন জাহির করছেন নিজেদের বিষাক্ত উপস্থিতি—নিকটতম, ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশীকেও হেয় করতে ব্যস্ত, তাঁরাও প্রকারান্তরে গান্ধীজির সত্যাগ্রহের শক্তিকে জড়িয়ে ধরতে বাধ্য করছেন সমাজকে। অহিংস শাহিনবাগই যেন তাদের ক্রোধ আর আক্রোশের, বিভেদ আর অসহিষ্ণুতার নিশানা। 

ভোটের প্রচার দিয়ে, উসকানি দিয়ে, এনআরসির হুমকি দিয়ে, দূরদৃষ্টিহীন আইনের বাহুবল দিয়ে বৈষম্যের রাজনৈতিকীকরণ অসম্ভব। ইতিহাস পেছনে হাঁটে না। অতীতে বসবাস করার সম্মতি দেয় না, এক দেশ দুই বা ততোধিক মানচিত্রে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও সম্মুখপ্রবণতাকে গুরুত্ব দেয়। তাত্ক্ষণিক ক্ষমতামত্ততা যাঁদের দৃষ্টিকে ঔদ্ধত্যময়, বিজ্ঞাপনময় করে তোলে, ধস আর ধ্বংস তাঁদের নিয়তি। তাঁরা নিজেরাই একসময় নিজের বোঝা হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে, বিভেদ আর বৈষ্যমের বৃহদায়তন যাঁরা দাবি করতে অভ্যস্ত, তা পাকিস্তান কিংবা ভারতে কিংবা বাংলাদেশে কিংবা ইউরোপ ও আমেরিকায়, যেখানেই হোক না কেন, মঙ্গলবোধের সমবেত ঘৃণা থেকে তাঁদের দূরত্ব নিছক একটি রেখা, রেখাটিকে মুছে দিয়ে সীমান্তহীন মানুষ আর এক মানবের অনিঃশেষ উপাসকের তর্জনীতে সম্ভবত অচিরে গর্জে উঠবে—এই দুষ্ট ছায়া, হেই!

যে রাজনীতি অন্ধতার খোরাক জোগায়, যে অন্ধতা অহংকার আর আত্মম্ভরিতার সঙ্গী হতে থাকে, যে শাসক নিরীহ শাসিতের অর্জিত সম্মান লুট করে, হরণ করে নিঃশর্ত যাপনের পূর্বাপর প্রতিশ্রুতি, তাঁদের যেকোনো ন্যাস ও বিন্যাসে, সর্বনাশের বীজটি পুঁতে দেয় তাদেরই সূচি ও কর্মসূচি। নাগরিকপঞ্জি, জনপঞ্জি আর নাগরিকত্ব আইনের অভিব্যক্তি এ রকমই এক মৃত্যুমুখী প্রক্রিয়া। দৃষ্টি যার পেছনে, দূরের অন্ধকারে।

দুর্ভাগ্য, রাষ্ট্রবিধাতার ছলনা এখনো আমাদের ধাওয়া করছে। নিষ্ঠুর খেলা তার থামেনি। দ্বিজাতিতত্ত্বের নবীন সঙ্গীরা ফিরিয়ে আনতে চায় ওই অতীতকে—যেখানে মূঢ় ঐক্যের বড়াই আর হিংসা, দাঙ্গা, রক্তক্ষয় ও অমিত্রাক্ষরের ভুল নৃত্য ছাড়া ভিন্ন কোনো ছবি নেই। মুক্ত পরিসর নেই। সেটাই কি রাষ্ট্রের অনুশাসিত লক্ষ্য? তাহলে কি সবার জন্য বন্দিশালা গড়তে চায় বোতলবন্দি দৈত্য?

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা