kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

লিবিয়া যুদ্ধের শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ

অনলাইন থেকে

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সম্প্রতি বার্লিনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উপসংহার সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করা যায়—আসুন সবাই মিলে ভালো থাকার চেষ্টা করি। এ সম্মেলনের ন্যূনতম উদ্দেশ্য ছিল একটি যুদ্ধের অবসানের কাজ শুরু করা, যে যুদ্ধের কারণে লিবিয়ায় হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হন যে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া উচিত এবং সব পক্ষের উচিত জাতিসংঘের অস্ত্রনিষেধাজ্ঞা মেনে চলা।

শান্তির জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকার পরও উন্নাসিক হওয়ার বেশ ভালো কারণ রয়েছে। সম্মেলনের স্বাগতিক অ্যাঙ্গেলা মার্কেল নিজেই নিশ্চিত নন, সত্যি কী কী বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে; তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে উদগ্রীব হয়েই এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলেন। সম্মেলনের পরই লিবিয়ায় আবার সংঘাত শুরু হয়। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ঘোষণা দেয়, তারা ত্রিপোলিতে তাদের একটি শিবিরের কার্যক্রম স্থগিত করতে যাচ্ছে এবং শরণার্থীদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কারণ অবনতিশীল পরিস্থিতিতে শরণার্থীদের এবং তাদের স্টাফ ও সহযোগীদের নিরাপত্তার শঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘ অভিযোগ করে, বার্লিন সম্মেলনের কিছু অংশগ্রহণকারী সম্মেলন শেষ হওয়ার পরই অস্ত্রনিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে লিবিয়ায় অস্ত্র ও ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়েছে।

ইমানুয়েল ম্যাখোঁ যখন লিবিয়ায় তুর্কি যুদ্ধজাহাজ ও সিরিয়ান ভাড়াটে সেনা পাঠানোর অভিযোগ তোলেন, হস্তক্ষেপ বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার জন্য এরদোয়ানকে তুলাধোনা করেন, তখন মনে হয়, আগে কখনো এমন ভণ্ডামি দেখা যায়নি। ফায়েজ আল-সারাজের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘসমর্থিত জাতীয় সম্মতির সরকারের (জিএনএ) প্রতি তুরস্কের সমর্থন রয়েছে। জিএনএ তুরস্ককে লিবিয়ার উপকূলে গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকার দিয়েছে। বিস্ময়করভাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের নাম উল্লেখ করেননি, তারা ফরাসি অস্ত্রের ক্রেতা ও খলিফা হাফতারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ) গত বসন্তে ত্রিপোলি বরাবর অগ্রসর হয়; ওই সময় জাতিসংঘ মহাসচিব লিবিয়ায় ছিলেন। তিনি নির্বাচনের উপায় বের করার উদ্দেশ্যে আলোচনার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। রাশিয়া জেনারেলকে সহায়তা করার জন্য ভাড়াটে সেনা পাঠিয়েছে, একই সঙ্গে জিএনএর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার প্রয়াসও করছে। কিন্তু ফ্রান্সও ন্যূনতম মাত্রায় হলেও তাঁকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফোন করে তাঁর এপ্রিল অভিযানের প্রতি সম্মতি দেন। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই মোলাকাতের উদ্দেশ্য জেনারেল হাফতারকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাজ্য সমর্থিত একটি প্রস্তাবকে ব্লক করা।

লিবিয়ার জনগণ কয়েক দশক ধরে মুয়াম্মার গাদ্দাফির একনায়কতন্ত্র দেখেছে। ২০১১ সালে তাঁর বিদায়ের পর থেকে তারা ন্যাটোর সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের সৃষ্ট গোলযোগের মধ্যে বাস করছে। কিন্তু পরিহাস ও বিপদের বিষয় হলো, একজন লৌহমানব এসে দেশকে স্থিতিশীল করবে, এমন একটি ধারণা লিবিয়ায় বিরাজ করছে। জেনারেল হাফতারই সমাধান—এমনটি ভাবা লজ্জাজনক এবং খুবই অস্বাভাবিক। তিনি কর্তৃত্ববাদী হলেও তাঁকে লৌহমানব বলা কঠিন। তাঁর বয়স এখন ৭৬ বছর, গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যাও রয়েছে। পর্যাপ্ত বিদেশি সমর্থন থাকার পরও তিনি তাঁর প্রত্যাশিত ফল লাভে ব্যর্থ হয়েছেন। অল্পসংখ্যক লোকই বিশ্বাস করে যে তাঁর পরে তাঁর বাহিনী ঐক্যবদ্ধ থাকবে। তবে তাঁর কাছে এটা পরিষ্কার করা হয়েছে যে তিনি ইচ্ছানুগ কাজ করতে পারেন। ইত্যবসরে চলমান ছায়াযুদ্ধ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল হয়েছে এবং স্নায়ু উত্তেজক হয়ে উঠেছে। তুর্কি সমর্থনকে অংশত রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। আমিরাতও তৎপরতা বাড়াচ্ছে; কারণ তারা মনে করছে, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি বোঝাপড়া হয়ে গেলে তারা অপাঙেক্তয় হয়ে পড়তে পারে।

লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা কামনার সব কারণই রয়েছে ইউরোপের। বিশেষভাবে তাদের মধ্যে এ ধারণা রয়েছে যে এই গোলযোগের কারণে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট লাভবান হয়েছে; শরণার্থী প্রবাহ বন্ধ করার প্রবল তাগিদও রয়েছে—এর মূল্য যা-ই হোক। যখন জেনারেল হাফতার ও তাঁর সমর্থকদের লাগাম পরানোর জন্য ফ্রান্সের ওপর চাপ বাড়ানো দরকার তখন বার্লিন সম্মেলন থেকে কার্যকারিতাহীন কিছু বিষয় পাওয়া গেল। এর মানে হলো, সমস্যার সমাধানে পশ্চিমের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের কোনো বাসনা নেই।

বাইরের বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধরত পক্ষগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন বাড়াচ্ছে; যুদ্ধরত পক্ষগুলো এ অবকাশে তাদের সামরিক অবস্থানকে সংহত করেছে। বিদেশি পক্ষগুলো শুধু তাদের তৎপরতার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত লাভের বিষয়টিই বিবেচনা করছে। এসব কারণে সংঘাত আরো প্রবল হতে থাকবে। আর লিবিয়ার জনগণ এর মূল্য দিতে থাকবে।

 

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা