kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সঠিক নির্বাচন বেঠিক নির্বাচন

মোস্তফা মামুন

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সঠিক নির্বাচন বেঠিক নির্বাচন

নির্বাচন কারো কারো কাছে এখন কৌতুক। বেশির ভাগের কাছে অবশ্য কৌতূহল। কী হবে! ভোট দিনে হবে নাকি রাতে হবে? বিরোধী দল মাঝপথে বর্জন করবে?

সরকারি সমর্থকরা বলছেন, খুবই উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং ব্যাপক ভোটারের উপস্থিতিতে...যা তাঁরা সব সময় বলে থাকেন।

এক এলাকায় ভোটে খুবই খারাপ অবস্থা। কেউ ভোট দিতে পারছেন না। কেন্দ্র দখল করে রেখেছে গুণ্ডারা। প্রিসাইডিং অফিসার মহোদয় ওদের যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করছেন। স্বভাবতই ভোটার তমিজউদ্দিন ভোট দিতে পারলেন না। হতাশ হয়ে তিনি ভায়রাভাইকে ফোন করে নিজের দুঃখের কথা বলেন। ভায়রা শুনে বললেন, ‘বলো কী! তোমাদের এলাকায় এ রকম ভোট হচ্ছে?’

‘কেন, তোমাদের এলাকায় কি তোমরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছ?’

‘পারছি মানে...একেকজন ১০-১২টা করে ভোট দিচ্ছে। আমিই তো কয়েকটা দিয়ে খেতে এসেছি। খেয়ে গিয়ে আবার দেব। তুমি বরং চলে আসো। তোমাদের এলাকায় আরো যারা ভোট দিতে পারেনি ওদেরও নিয়ে আসো। এখানে ভোট দেওয়ার কোনো সমস্যা নেই।’

এ রকম নির্বিঘ্ন এবং ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার ভোট হলে অবশ্য আমাদের কোনো কথা নেই।

বিরোধী সমর্থকদের দাবি, সাজানো নির্বাচন হবে। ভোট হয়ে যাবে আগের রাতে। ভোটের দিন যা হবে তা হলো প্রহসন। লোক-দেখানো নাটক।

তাদের মতামত ধরলে ভোট আসলে হবে এ রকম। এক বিরোধী সমর্থক ভোটকেন্দ্রে গেছেন। তিনি আসলে গেছেন এ জন্য যে গিয়ে দেখবেন, ওখানে সরকারি দলের সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে রেখেছে। কেউ ভোট দিতে পারছে না। তিনি ছবি ওঠাবেন। তাঁদের দলের সংবাদ সম্মেলনের সময় ঠিক করে রাখা হয়েছে। ওখানে ভোটে কী কী অনিয়ম হয়েছে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হবে। তিনি সেখানে উপস্থিত থেকে নিজের অভিজ্ঞতা শোনাবেন। দুঃসহ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তিনি পকেটে করে সাবধানে মোবাইলও লুকিয়ে এনেছেন। প্রামাণ্য ছবি তুলবেন। কেন্দ্রে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, মানুষ সুন্দর লাইন করে দাঁড়িয়েছে। তিনি ভাবলেন, লাইনটা লোক-দেখানো। লাইন আগাবে না। মজা দেখার জন্য লাইনে দাঁড়ালেন। আর দেখলেন, লাইন আগাচ্ছেও। ভাবলেন, লাইন আগাবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে কেউ ঢুকতে পারবে না। কী আশ্চর্য, কেন্দ্রে ঢুকেও যাচ্ছে। ভাবলেন, সামনে সব সরকারি দলের লোক দাঁড়ানো। ওদের ঢোকানো হচ্ছে। তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। দেওয়া হলো। ভাবলেন, ঢুকলেও তাঁকে ব্যালট দেওয়া হবে না। ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে যেন সাংবাদিকরা সমস্যা না করে। ভেতরে তো আর সাংবাদিক নেই। তাঁর হাতে ব্যালটও ধরিয়ে দেওয়া হলো। না, ব্যালট দিলেও ভোট দিতে পারবেন না। ওর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ওরা ওদের মার্কায় ভোট দেবে। কিন্তু এবারও অন্যথা। ওকে নির্বিঘ্নে ভোটের জায়গায় ঢুকতে দেওয়া হলো। তিনি চাইলেই এখন তাঁর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে দিতে পারেন। না, এর মধ্যে কোনো কারসাজি আছে। এই কারসাজির অংশীদার হওয়া যাবে না। নিজের প্রার্থীকে ভোট দিলে তো এই ভোট মেনে নেওয়া। তিনি করলেন কী, সরকারি দলের প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে দিলেন। রাতের বেলা ঘোষিত ফলে দেখা গেল, বিপুল ভোটে সরকারি দলের প্রার্থী জয়ী এবং কোথাও কোনো গোলমালের খবর নেই।

তিনি নেতাকে গিয়ে কানে কানে নিজের অভিজ্ঞতা বললেন। নেতা সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বাতিল দাবি করলেন। তাঁর দাবি, ‘এই ভোট তো অবৈধ। আমাদের সমর্থকরা সরকারি দলের লোককে ভোট দিয়েছে, কাজেই তিনি পেয়েছেন সব অবৈধ ভোট। এই ভোটে জয়ী লোককে নির্বাচিত বলা যায় না।’

এটা কৌতুক হয়তো; কিন্তু এখন বিরোধী দলের কাছে ভোট মানে একটা অনিয়মের প্রত্যাশা করা। ভাঙচুর-মারামারি। ওরা জেতার চেয়ে এসবের অপেক্ষায়ই থাকে বেশি। তারা বিপদেও আছে। ভোটে জিতে গেলে আবার আরেক সমস্যা। সরকার বলবে, প্রমাণ হয়ে গেল এ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। সত্যি বললে, নির্বাচনী রাজনীতিতে সরকারি দল এমন সব ফাঁদ তৈরি করে রাখে যে বিরোধীরা বুঝতেই পারে না। এটাও আসলে এখন একটা কৌতূহল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সরকার আসলে নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে খেলাটা কিভাবে খেলে।

আর তাই নির্বাচনটা আসলে কৌতূহলের। কৌতূহল পৃথিবীর সব নির্বাচনেরই অনিবার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সেখানে কৌতূহল থাকে, কে জিতবে? এখানে কৌতূহল, নির্বাচনটা আসলে কী রঙের হবে!

জাভেদ ভাই সব কিছুতেই উল্টা কথা বলে। আজও বলল, ‘আমার কাছে একটা ব্যাপার একটু অদ্ভুত লাগে। বাংলাদেশে কোনো নেতা বা কোনো পদাধিকারী মারা গেলে তাঁদের পরিবারের কেউ সাধারণত মনোনয়ন পান। সহানুভূতি ভোট পেয়ে জিতেও যান। আনিসুল হকের চেয়ে তো বেশি সহানুভূতি কেউ পেত না। তাহলে তাঁর পরিবারের কেউ কেন এলেন না।’

বললাম, ‘আনিসুল হক তো অনেক পুরনো গল্প। এরপর একটা নির্বাচনও হয়ে গেছে।’

‘সিটি নির্বাচনে আনিসুল হক কখনো পুরনো হবেন না। সব সময়ই তাঁর কথা আসবে।’

‘কথা ঠিক; কিন্তু তাঁর পরিবারের কেউ মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলে তো জানি না। তা ছাড়া তিনি রাজনীতিক ছিলেন না, ফলে তাঁর পরিবারে তো রাজনীতির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ ছিলেন না।’

‘রাজনীতি!’ জাভেদ ভাই হাসে, ‘আনিসুল হক কিন্তু আমাদের প্রচলিত অনেক ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন।’

‘কী রকম ধারণা?’

‘ধরো, আমরা ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে সমালোচনা করি। সাধারণত এটা সমস্যার; কিন্তু আনিসুল হক দেখিয়ে দিলেন, ব্যবসায়ীরা এসে অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের চেয়ে বেশি সফল হতে পারেন। সত্যি বললে, বাংলাদেশ হওয়ার পর যে অল্প কয়েকজন জনপ্রতিনিধি কাজ দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে ওপরের দিকেই থাকবেন।’

‘কিন্তু আনিসুল হকের ক্ষেত্রেও মজাটা দেখো...তাঁর নির্বাচন নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল।’

‘ওই যে বললাম, অনেক ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। আমরা সাধারণত মনে করি, সঠিক নির্বাচন হলে সঠিক লোক আসবে। আনিসুল হক দেখালেন, বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমেও সঠিক লোক চলে আসতে পারে। সেই নির্বাচন বিএনপি দুপুরের আগে বর্জন করেছিল, তবু বিএনপি প্রার্থী কয়েক লাখ ভোট পেয়েছিলেন। সত্যি বললে, বিএনপি বর্জন না করলে অন্য রকম ফলও হতে পারত।’

‘তা ঠিক। অনিয়মের অভিযোগও ছিল যথেষ্ট।’

‘এর মানে দাঁড়াল, আমরা যে বলি ব্যবসায়ী নয়, রাজনীতিক দরকার, অবাধ ভোট দরকার—সেগুলোতে আসলে সব ক্ষেত্রে ভালো ফল না-ও আনতে পারে।’

‘তোমার কথা মানলে তো রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ভোট এখন যেভাবে হয় সেভাবে হলেই হয়।’

‘আনিসুল হক কেসটা নিয়ে রাজনীতিকদের ভাবা উচিত। ভাবা উচিত, তাদের ব্যর্থতা এমন জায়গায় গেছে যে মানুষ এখন অন্য জায়গায় ভরসা খুঁজছে। কিন্তু আমার মনে হয়, রাজনীতি-ব্যবসায়ী না ভেবে আসলে এখন ভাবা উচিত সেই মানুষটাকে নিয়ে, যার মধ্যে আসলে নতুন চিন্তা আছে।’

‘তাই বলে তো যা-তা ভাবে ভোট করাকে আমরা সমর্থন করতে পারি না।’

‘সমর্থন করার দরকার নেই। বিরোধিতাই করো। কিন্তু সেই বিরোধিতায় মানুষ সাড়া দেয় না কেন জানো? কারণ মানুষ দেখেছে, সঠিক নির্বাচন হলেও বেঠিক লোক আসে। আবার কখনো বেঠিক নির্বাচনে সঠিক লোক। আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াটা এমন দ্বিদলীয়-মার্কাভিত্তিক, টাকা এবং শক্তিসর্বস্ব যে ভালো লোকের পক্ষে এই সংস্কৃতির সুষ্ঠু নির্বাচনেও জেতা সম্ভব নয়। আবার এই গোলমেলে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা আনিসুল হককে পেয়ে গেলাম। তিনি দেখালেন, এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের মধ্যেও অনেক কাজ করা সম্ভব। সত্যি বললে, আনিসুল হক আমাদের রাজনীতি এবং নির্বাচনী ধারণাকেই একটা বড় ধাক্কা দিয়েছেন। আমার তো মনে হয়, আমাদের রাজনীতি এবং নির্বাচনে ‘আনিসুল হক ফ্যাক্টর’ নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। বিদেশে কিন্তু হয়। একটা দিক বদলে দেওয়া ঘটনা নিয়ে গবেষণা করে নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়। আর হ্যাঁ, এমন যা-তা নির্বাচনে যদি আনিসুল হককে পাওয়া যায়, তাহলে আর তথাকথিত সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য হা-পিত্যেশের দরকার কী! সুষ্ঠু নির্বাচন তো কিছু দেখেছি। কী পেয়েছি বাড়তি।’

জাভেদ ভাইয়ের সব কথাই উল্টা ধরনের। মেনে নেই না। কিন্তু একটা নতুন ভাবনার খোরাক পাই।

মনে হলো, এই কথাটা বোধ হয় ঠিকই। আমাদের রাজনীতি আর নির্বাচনী ভাবনায় আনিসুল হক পাঠটা আরো গভীরভাবে হওয়া উচিত। একটা মোড় ঘোরানো ঘটনা নিয়ে বিদেশে বিস্তর গবেষণা হয়। আমাদের দেশে একটুও নয়।

এ এমনই অন্ধের দেশ যে নতুন পথের চিহ্নটাকেও কেউ চিনতে পারে না।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা