kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

সময়ের প্রতিধ্বনি

উৎসবের ভোট, শঙ্কার ভোট

মোস্তফা কামাল

২৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



উৎসবের ভোট, শঙ্কার ভোট

‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’—এটাই হচ্ছে সাধারণ ভোটারের স্লোগান। এই দেশে একসময় ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন করেছিলেন। তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনাও ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মাঠে নেমেছিলেন। পিতা দিয়েছেন দেশ, আর কন্যা দিয়েছেন সচ্ছলতা। তাই স্বাধীনতার ৫০ বছরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে বাংলাদেশ আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এখন আমরা বলতে পারি, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে আমাদের সরকার পরিচালিত হয় না। আমাদের বাজেট প্রণয়নের জন্য এখন আর দাতা দেশগুলোর কাছে ধরনা দিতে হয় না।

আমরা যদি আরেকটু পেছনে—মানে ১৯৫৪ সালের দিকে তাকাই, তাহলে কী দেখতে পাই? বাঙালি তখন   হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত জোট যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করতে ভোট উৎসবে শামিল হয়েছিল। ১৯৭০ সালেও শেখ মুজিবের ছয় দফার পক্ষে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। চুয়ান্ন সালের নৌকা প্রতীক সত্তর সালেও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল বাঙালি জাতি। এরপর খুব বেশি ভোট উৎসব আমরা উপভোগ করতে পারিনি।

অনেক সময়ই উৎসবের ভোট প্রতিহিংসার আগুনে পুড়েছে। ভোট উৎসব শুরুর আগেই শুরু হয় সংঘাত, মারামারি, কাটাকাটি। ভোট যতই এগিয়ে আসে, সংঘাতও ততই বাড়তে থাকে। কেন্দ্র দখল, ভোটের বাক্স ছিনতাই, সিল মারার ঘটনা প্রায়ই আমরা দেখেছি। তার পরও বাঙালির কাছে ভোট হয়ে উঠে উৎসবের একটি উপসর্গ।

আসছে ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী শহর ঢাকা সিটির ভোটের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও তীক্ষ দৃষ্টি রেখেছেন। নির্বাচনটি উৎসবের হবে, নাকি সংঘাতের! সেই প্রশ্নও দানা বাঁধছে সবার মনে। আর মাত্র দুই দিন বাকি। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে আশঙ্কার কিছু দেখছি না। আগামী দুই দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা আমরা বলতে পারব না।

এবারই প্রথম ঢাকা সিটির নির্বাচন ইভিএমে হচ্ছে। ইভিএমে ভোটগ্রহণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আছে।

আওয়ামী লীগ ইভিএমের পক্ষে, আর বিএনপি বিপক্ষে। নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা থেকেই বিএনপি ইভিএমের বিরোধিতা করছে। আর আওয়ামী লীগ বলছে, ইভিএমে কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। তবে ঢাকার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ আছে। মেশিনে ভোটের বিষয়টা তাঁরা পরখ করে দেখতে চান। তাঁরা বিরোধীপক্ষের শঙ্কার বিষয়টাকে অন্ধভাবে মেনে নিতে চাচ্ছেন না।

নানা শঙ্কার পরও বিএনপি নির্বাচনের মাঠে আছে এবং শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে বলেই দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দিয়েছেন। মাঠে আছে জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং সিপিবির মেয়র প্রার্থীরাও। এ নিবন্ধ লেখা (২৮ জানুয়ারি) পর্যন্ত ঢাকা সিটির কোথাও বড় কোনো নির্বাচনী সহিংসতা না হলেও বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের ওপর হামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। আগামী দুই দিনে বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটলে ১ ফেব্রুয়ারি তারিখেই ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন হবে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আন্তরিক বলেই ধারণা করছি। কারণ এই নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে ইসির ভাবমূর্তির ওপর আঘাত আসবে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে ইসির ভূমিকা। অতীতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সংগত কারণেই ইসির প্রতি এক ধরনের অনাস্থা মানুষের। আস্থা ফেরানোর জন্য হলেও এবার ইসি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে চাইবে।

অবশ্য এটাও ঠিক যে ইসি একা চাইলেই যে শান্তিপূর্ণ ভোট করতে পারবে তা নয়। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা লাগবে। বিশেষ করে সরকারপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নির্বাচন সফল করা সম্ভব নয়। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে যে শুধু ইসির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে তা নয়, সরকারি দলের জন্য ইতিবাচক হবে। সরকারি দলের ওপর বিরোধীপক্ষের যে আস্থার অভাব আছে, তা অনেকটাই কেটে যাবে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতিবাচক ভূমিকা। তাবিথ আউয়ালের ওপর হামলার পর প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটানো যাবে না, যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়; নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হয়। প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার তিনি নিন্দা প্রকাশ করেন। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বারবারই বিরোধীপক্ষকে আশ্বস্ত করছেন এই বলে যে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সরকার পূর্ণ সহযোগিতা করবে। আরেকটা বিষয় নিয়ে খুব জোর দিয়ে বলেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হলে সরকারের ওপর আকাশ ভেঙে পড়বে না। কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তার মানে, সরকার চাচ্ছে নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। এতে যদি বিরোধীপক্ষের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন তাহলেও তাদের আক্ষেপ থাকবে না।

সরকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও চায় না প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচন। তাহলে কারা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত?

এর জবাবে অনেকেই বলেছেন, যারা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায় তারাই এর নেপথ্যে কাজ করছে। নির্বাচন বানচাল করে যদি অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায় তাহলে ষড়যন্ত্রকারীদের লাভ। তারা কখনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে উসকে দিচ্ছে, আবার কখনো কিছু ধর্মীয় সংগঠনকে উসকানি দিয়ে মাঠে নামানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা আসলে এই দেশের উন্নয়ন মেনে নিতে পারছে না। উন্নয়ন ব্যাহত করার জন্যই ভেতরে ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।

সবার মনে রাখতে হবে, এই দেশ আমাদের সবার। দেশের স্বার্থে সবাইকে এক হতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে এক সুরে কথা বলতে হবে। আমরা যেন নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ না করি। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা যেন ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের পেছনে না ছুটি।

আমরা আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকালে দেখি, সেখানে জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দল এক সুরে কথা বলে। সেখানে অন্য কোনো দেশ নাক গলাতে পারে না। আমাদের দেশে কিছু রাজনৈতিক দলকে দেখি, কথায় কথায় তারা বিদেশিদের কাছে নালিশ জানাতে যায়। যেন বিদেশিরাই তাদের ক্ষমতায় বসাবে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশে ক্ষমতার পালাবদল হবে ভোটের মাধ্যমে। অন্য কোনো পন্থায় নয়। মনে রাখতে হবে, জনগণই ক্ষমতার উৎস, বন্দুকের নল নয়। যারা এই দেশে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তাদের রাজনীতি অচল হয়ে গেছে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে। কোনো রকম কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে নয়।

বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা দেখছি, কৌশলের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল অনেকটাই এগিয়ে আছে। বিএনপির রাজনীতিতে পরিপক্বতার অভাব আছে; যদিও বিএনপির সঙ্গে অনেক বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বুদ্ধি-পরামর্শ নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায় না। সংগত কারণেই বিএনপি রাজনীতিতে তাল সামলাতে পারছে না। সব কিছুই কেমন যেন এলোমেলো, অগোছালো। কোনো কর্মসূচিরই কোনো ধারাবাহিকতা নেই।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধীপক্ষ থাকে। এর মধ্যে জনমতের বিচারে সরকারপক্ষের পাল্লা বেশি ভারী হলে গণতন্ত্র ভারসাম্য হারায়। গণতান্ত্রিক চর্চাও ব্যাহত হয়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও সরকার হয়ে উঠে একনায়কতান্ত্রিক। এ অবস্থার অবসানের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো বিকল্প নেই।

পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সব পক্ষের পরমতসহিষ্ণুতা দরকার। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পরস্পরের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ছাড়া গণতান্ত্রিক চর্চা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হয়। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে গণতান্ত্রিক চর্চা হবে না। ঢাকার দুই সিটির আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সুসম্পন্ন হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ভোটাররা যাতে উৎসবের আমেজে ভোট দিতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচনের আগের রাতে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র চাইলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলোও মেনে চলতে হবে। সামান্য দুই মেয়র প্রার্থীকে জেতানোর জন্য দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কোনো কোনো পক্ষ থেকে নির্বাচন বানচালের উসকানি থাকতেই পারে। সেই ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।

আমরা আশা করি, সরকার ও নির্বাচন কমিশন সতর্কতার সঙ্গে সব প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিয়ে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দেবে। আমরা সাধারণ ভোটাররা ১ ফেব্রুয়ারির ভোট উৎসবে শামিল হতে চাই। এটাই আমার একমাত্র চাওয়া।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা