kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুর্নীতি নির্মূলে চাই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা

ড. মো. নাছিম আখতার

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতি নির্মূলে চাই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয়তা ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ নবপ্রজন্মের দেশপ্রেমের কাছে অর্থ ও লোভের হাতছানি অনেকটাই গৌণ। তাই তো ২০১৯ সালে খবরের শিরোনাম হয়েছে বিনা ঘুষে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি। এসব রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সশ্রদ্ধ সালাম জানাই, যাঁদের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও সততায় এমন নৈতিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা ও পদধারী যেসব ব্যক্তি চেতনা ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অর্থ রোজগারে ব্যস্ত নন, এঁরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। সম্প্রতি আমার এক আত্মীয় সিরাজগঞ্জ জেলায় শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে মন্তব্য করেন, ‘এবার শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে নিরপেক্ষ।’ তাঁর ভাষায় এমন সব ব্যক্তি নিয়োগ পেয়েছেন যাঁদের সারা বাড়ি খোঁজ করলেও ১০ হাজার টাকা একসঙ্গে বের করা সম্ভব নয়। তাঁর ধারণা নিয়োগ স্বচ্ছ না হলে এঁদের চাকরি হওয়া সম্ভব হতো না। খবরটি শুনে মন ভরে গেল। বোঝা যাচ্ছে, ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে দেশের মানুষের মন ও মানসিকতার। তার পরও স্বাধীনতাবিরোধী ও স্বার্থান্বেষী একটি চক্রের চেষ্টায় ঘুষের নাম পরিবর্তন হয়ে ‘উপহার’ হয়েছে। সরকারি আমলা, রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে অভিসন্ধিমূলক কাজ করাতে তাঁদেরকে ফ্ল্যাট, গাড়ি, ঘড়ি ইত্যাদি উপহার হিসেবে দেওয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে। এগুলোর দাম লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু কোটি টাকার উপহারের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা নিয়ে দেশমাতৃকার যে বিশাল ক্ষতি করা হয় তা সচেতন জনগণমাত্রই উপলব্ধি করতে পারে। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নির্মূলে উপহার প্রথা রোধ করতে হবে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী হিসাব দিয়েছিলেন দেশে এক লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জনের কাছে পাওনা এক লাখ দুই হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এঁদের মধ্যে ৩০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছেন ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। খেলাপি রয়েছে ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। দেশের ভেতরে দুর্নীতি নির্মূলে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সততা ও আন্তরিকতা থাকতে হবে। দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করা দরকার।

সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম—‘দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে কানাডায়।’ খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ উজাড় করে বিভিন্ন ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে কানাডায়। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এভাবে লুটপাটের টাকা এনে কানাডায় গড়ে তুলছেন কথিত বেগমপাড়া। নগদ টাকায় মিলিয়ন ডলারের বাড়ি কিনে শুরু করছেন ব্যবসা। এমনকি বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে হয়ে উঠছেন কমিউনিটির পৃষ্ঠপোষক। কয়েক মাস ধরে দুর্নীতির কয়েকটি খবর ঢাকা-কলকাতা টরেন্টোর মূল ধারার কাগজে ছাপা হচ্ছে। এরপর তা ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সাম্প্রতিককালের এই খবরগুলোর শিরোনাম ছিল—‘ব্যাংকের টাকা মেরে কানাডায় বাড়ি’ করেছেন আব্দুল হান্নান রতন, ‘তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে চম্পট’ প্রশান্ত কুমার হালদার, ‘৩০০ কোটি টাকা মেরে কানাডায় ব্যবসায়ী’ গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু, ‘শত শত কোটি কানাডা পাচার করেন তাজুল।’ মাত্র দেড় লাখ কানাডিয়ান ডলার অর্থাৎ এক কোটি ১০ লাখ টাকা জমা দিলেই কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। অর্থ পাচারকারীরা এই সুযোগ নিয়েই কানাডায় পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে শান্তিপূর্ণ কানাডা হয়ে উঠছে খুনি, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাতে প্রবাসী বাঙালিরা উদ্যোগী হয়েছেন। আমি তাঁদের সাধুবাদ জানাই তাঁদের দেশপ্রেম, সততা ও সমাজসচেতনার গভীরতা দেখে। দুর্নীতির প্রতিবাদে প্রবাসী বাঙালিরা এগিয়েছে এক পা, এখন সরকারকে এগোতে হবে দশ পা। কানাডিয়ান সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এসব দুর্নীতিবাজকে দেশে ফেরত এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো উপহার বা আর্থিক সম্পর্ক যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এটাই হোক মুজিববর্ষে সরকার ও জনগণের অঙ্গীকার। দেশের বাইরে প্রবাসীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ তা সব দেশেই অব্যাহত থাকবে বলে আশা রাখি এবং সরকারকেও হতে হবে আন্তরিক। অন্যথায় একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্তই হাজার ঘটনার জন্ম দেবে। জনগণের টাকা ঋণ নামের নাটকের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে যদি প্রবাসে বিলাসবহুল ও সম্মানজনক জীবন যাপন করা যায়, তাহলে খারাপ কী! এ ধরনের জীবনদর্শন গড়ে উঠবে সমাজের ঠগ, বাটপার ও অসৎ ব্যক্তিগুলোর মধ্যে। পরিণামে দেশ হবে নিঃস্ব।

 কলকাতা সম্পর্কে একটা মিথ সব সময়ই কানে এসেছে, ওখানকার মানুষ খুব হিসাবি। একটা কৌতুক শোনা যায়, একটা শিঙাড়া খেতে দিয়ে হোস্ট বলেন, পুরোটাই খেয়ে যাবেন। কৌতুক বলে হয়তো অতিরঞ্জিত কথন; কিন্তু এ কথা ঠিক যে কলকাতার মানুষ মিতব্যয়ী। কেন এই মিতব্যয়ী! এর কারণ হচ্ছে কলকাতার মানুষ সত্ভাবে উপার্জন করে সারা জীবন আত্মনির্ভর সময় কাটাতে চায়। রাষ্ট্রক্ষমতা বা রাজ্যক্ষমতায় যে-ই থাকুক, তাতে সকাল-দুপুর-রাতের খাবারের পাতে যতটুকু খাদ্য প্রয়োজন তার পার্থক্য ঘটবে না। বাহুল্য খরচ কিংবা বড়লোকি দেখাতে গিয়ে আত্মনির্ভর বেঁচে থাকার কৌশলটি হারাতে চায় না তারা। এতে নাগরিক সমাজটি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে। দলনিরপেক্ষ দেশ ও মানবপ্রেমের শক্তি আছে বলেই কলকাতার নাগরিক সমাজে সর্বদাই সক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। মুখ বুজে কোনো অন্যায় মেনে নেওয়ার পাত্র তারা নয়। আমাদেরও মন, মানসিকতা ও অন্তরের ভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। দামি সামগ্রী ব্যবহার করলেই সমাজে দামি হওয়া যায়—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মহৎ, জ্ঞানী-গুণী ও সম্মানী ব্যক্তিরা কখনোই দুর্নীতিপরায়ণ হন না, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী বিল গেট্স প্রতি মিনিটে আয় করেন বাংলাদেশি টাকায় ১৩ লাখ টাকা। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১১০ বিলিয়ন ডলার। তিনি যদি ব্যক্তি না হয়ে দেশ হতেন, তাহলে বিশ্বের ৩৭তম ধনী দেশ হতেন। সেই মানুষটি ব্যবহার করেন বাংলাদেশি টাকায় ৮৫০ টাকা দামের হাতঘড়ি। সুতরাং আমাদের হতে হবে অন্তরের চিন্তাচেতনায় সৎ ও মিতব্যয়ী। তবেই আমরা পারব দুর্নীতিকে সমূলে বিদায় জানাতে। এখন শুধু দরকার দেশের ভেতর-বাইর ও অন্তরে প্রতিরোধের ত্রিমাত্রিক প্রচেষ্টা।

 

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা