kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

শুভ জন্মদিন

আদর্শে অবিচল এক বীর

হাসান-উজ-জামান

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আদর্শে অবিচল এক বীর

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্নেল (অব.) শওকত আলী অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জন্ম শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার লোনসিং বাহের দিঘিরপাড় গ্রামে ১৯৩৭ সালের ২৭ জানুয়ারি। তিনি পটুয়াখালী থেকে ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ওই বছরই ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে আইএসসিতে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে বিকম পাস করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৮ সালেই শওকত আলী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমিশন র‌্যাংকে যোগদান করেন। সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান সত্ত্বেও পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য তাঁর বিবেককে নাড়া দেয়। করাচিতে চাকরিতে থাকাকালীন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ সশস্ত্র বাহিনীর কিছু বাঙালির সঙ্গে তাঁর গোপন যোগাযোগ স্থাপন হয়, যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি দেশপ্রেমিক অফিসার ও সৈনিকদের সুসংগঠিত করে আকস্মিক হামলার মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে বাংলাদেশের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা আদায় করা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তৎকালীন ক্যাপ্টেন শওকত আলী ১৯৬৯ সালের ১০ জানুয়ারি করাচির বালির ক্যান্টনমেন্ট থেকে গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে নজরবন্দি করে রাওয়ালপিন্ডি সামরিক বন্দিশালায় আটক রেখে এক মাস পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অন্য বন্দিদের সঙ্গে আটক রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামি করে শওকত আলীসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। যে মামলার প্রকৃত নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’। পাকিস্তানের লৌহমানব হিসেবে খ্যাত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শাসনামলে এমন দুঃসাহসিক ও দেশাত্মবোধক তৎপরতা প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের পক্ষেই সম্ভব ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বোচ্চ দণ্ড অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের এমন ঘটনা দেশপ্রেমের বিরল বা অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জননেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে অন্যান্যের মধ্যে মুক্তি লাভ করেন তৎকালীন ক্যাপ্টেন শওকত আলীসহ তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামি। পাকিস্তান সরকারের দায়েরকৃত এ মামলা প্রকৃত অর্থে জননেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালিদের দুঃসাহসী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রথম উদ্যোগ। কর্নেল (অব.) শওকত আলী তাঁর লেখা ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইতে কিছু দেশপ্রেমিক কর্তৃক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার মহৎ উদ্যোগের কথা প্রকাশ করা হয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর ক্যাপ্টেন শওকত আলী ১৯৬৯ সালের জুন মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন। এরপর ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে যশোরের নোয়াপাড়ার কার্পেটিং জুট মিলে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে থাকাকালীন স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে ২৭ মার্চ মাদারীপুর-নড়িয়া ও চাঁদপুর হয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি ভারতের ত্রিপুরায় ২ নম্বর সেক্টর প্রধান মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নিয়ে মে মাসের মাঝামাঝি মাদারীপুর এসে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করে তাঁদের সব থানার দায়িত্ব প্রদান করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।

স্বাধীনতা লাভের পর শওকত আলী বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের নবগঠিত সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি তাঁর যোগ্যতার বলে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির পরিচালকের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ভীষণ ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। যেহেতু তিনি জাতির জনকের মতাদর্শিক সৈনিক ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিলেন, সেহেতু খুনি মোশতাক-জিয়া নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী থেকে ১৯৭৫ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি চাকরিচ্যুত হন।

ছাত্রজীবন থেকে শওকত আলী প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক ও বাহক ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাভাবিক কারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন থেকে কর্নেল (অব.) শওকত আলী বিচ্যুত হতে পারেননি। জিয়ার সামরিক শাসনামলে পিপিআরের আওতায় ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলে তিনি ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। চরম প্রতিকূল পরিবেশে অর্থাৎ যখন সেনাবাহিনীতে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা বা চাকরিচ্যুত করা হয়, তখন তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগে যোগদান করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার শপথ নেন।

জিয়ার শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তৎকালীন সরকারের তাঁবেদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান যখন বক্তব্য দেন ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক, শেখ মুজিব জাতীয় বেঈমান’ তখন এহেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং বানোয়াট বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৯৭৮ সালের ২৬ আগস্ট কর্নেল (অব.) শওকত আলীর নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ (Freedom Fighters solidarity council)। এই পরিষদের গঠনতন্ত্র অনুসারে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের এই সংগঠনের সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়।

কর্নেল (অব.) শওকত আলী ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জিয়ার আমলে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী এলাকা নড়িয়া (শরিয়তপুর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন (আওয়ামী লীগ থেকে মাত্র ৩৯ জন)। এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে বরাবর তিনি নিবেদিত; ফলে প্রতিটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন (শুধু এরশাদের আমলে জোর করে হারানো হয়েছে)। এরশাদের আমলে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন সত্ত্বেও তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আদর্শের প্রতি প্রতিটি মুহূর্ত অবিচল থেকেছেন। এরশাদের আমলে মিথ্যা হত্যা মামলায় তাঁকে ১৬ মাস কারাভোগ করতে হয়েছে। তখনকার সামরিক আদালতে সশস্ত্র প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার চক্রান্ত করা হয়।

নবম জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কর্নেল (অব.) শওকত আলী ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে তিনি অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। তিনি স্মরণশক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন। আগরতলা মামলার অভিযুক্তদের ৩৫ জনের মধ্যে এখন কর্নেল (অব.) শওকত আলীসহ মাত্র পাঁচজন জীবিত আছেন এবং তাঁদের মধ্যে জাতির জনকের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সবচেয়ে ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগের চরম দুঃসময়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করার মহতি উদ্যোগ গ্রহণকারী জাতীয় এই বীরদের রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান করলে এই লড়াইয়ের অগ্রনায়ক জাতির জনকের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এই মহতি উদ্যোগ বঙ্গবন্ধুকে আরো সম্মানিত করবে। কারণ তাঁর নেতৃত্বেই জাতীয় এই বীরেরা এমন দুঃসাহসী উদ্যোগ গ্রহণে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জন্মদিনে তাঁর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা।

লেখক : মহাসচিব, হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও যুগ্ম মহাসচিব, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা