kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

অনলাইন থেকে

করোনাভাইরাস আতঙ্ক নয় চাই সতর্কতা

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমরা আসলেই ঝুঁকির মধ্যে আছি। কোনো এক দূর দেশে নতুন কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা প্রথমে আমরা নিরুদ্বিগ্নভাবে চেয়ে দেখি। সেই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। এ অবস্থায় আমরা প্রসন্নতায় ভুগব নাকি সতর্ক হব, তা নিয়ে ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। কেউ হয়তো নিজেকে সেসব দুর্যোগের চলচ্চিত্রের ভূমিকায় বসিয়ে নেয়, যেখানে দৃশ্যপটে দেখা যায় পরিবারের লোকজন নাশতা নিয়ে ঝগড়া করছে আর টেলিভিশনে ঘাতক ভাইরাসের খবর দেখানো হচ্ছে। ওই পরিবার সেটা খেয়ালই করছে না। নতুন মহামারি কি বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের মৃত্যু ঘটাবে, যেমনটা ঘটেছিল স্প্যানিশ ফ্লুর কারণে?

নতুন করোনাভাইরাসের খবর প্রথম আসে গত মাসে চীনের উহান থেকে। এ ব্যাপারে জনগণের ঔদাসীন্য এখন উদ্বেগে রূপ নিয়েছে, এমনকি আতঙ্কের পর্যায়ে চলে গেছে। এ ভাইরাসের কারণে নিউমোনিয়া হয়। বেইজিং জানিয়েছে, ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় ছয়জন মারা গেছে এবং ৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছে। গত সোমবার কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, মানুষ থেকে মানুষে এ ভাইরাস সংক্রমিত হয়। থাইল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন ও অন্যান্য জায়গা থেকে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। তবে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের নিশ্চিত তথ্য শুধু চীনেই পাওয়া গেছে।

উদ্বেগের আগুনে রসদ জুগিয়েছে আরো দুটি বিষয়। প্রথমটি হলো, নতুন চান্দ্রবর্ষ এগিয়ে আসছে। চীনের কোটি কোটি মানুষ পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদ্‌যাপনের জন্য বাড়ির দিকে ছুটছে। দ্বিতীয়টি হলো, ২০০৩ সালে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) মহামারির ঘটনা সরকার কিভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেই স্মৃতি। ওই মহামারির প্রথম কয়েক মাস সরকার সব কিছু গোপন রাখতে চেয়েছিল। বিপর্যয়ের মাত্রাটা প্রকাশ করেন এক সাহসী ডাক্তার। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, চীন সময়মতো তথ্য দিলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০০ মৃত্যু ঠেকানো যেত।

সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এখনো খুব কড়া। ক্ষতিকর মনে হলেই তথ্য চাপা দিয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকদের অনুমান, ভাইরাসাক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি, প্রায় এক হাজার ৭০০। কিছু হাসপাতাল হয়তো রোগীদের পরীক্ষাই করছে না। আবার এমনো হতে পারে, অনেকে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেই না। সরকার অবশ্য ২০০৩ সালের তুলনায় দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তুলনামূলক বেশি তথ্য সরবরাহ করেছে। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং মহামারি মোকাবেলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া চীনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঘটনা কেউ গোপন করলে বা তথ্য জানাতে দেরি করলে তাদের লজ্জাজনক জীবন যাপন করতে হবে।

এ ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য খুবই অপ্রতুল এবং এর ভয়াবহতা খাটো করে দেখা উচিত হবে না। যারা রুগ্ণ, তারা তো বটেই, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পীড়া এরই মধ্যে উপলব্ধি করেছে তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা। তা ছাড়া এ ভাইরাস যে আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, সে আশঙ্কা তো আছেই। তার পরও ভাইরাসটি এখনো সার্সের মতো সংক্রামক হয়ে ওঠেনি কিংবা এতে মৃত্যুর হার মিডলইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোমে মৃত্যুহারের মতো নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সার্স ও অন্যান্য মহামারির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরো কঠোর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংক্রমণের ব্যাপারে অযথা হুঁশিয়ারি দিলে সেটা কিন্তু বিপদের কারণ হতে পারে। তাতে হয়তো মানুষ মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, মানুষ পরবর্তী সময়ে হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মনোযোগ দেবে না। চলাফেরার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে মানুষ ভাবতে পারে, এবার হয়তো পালাতে হবে। আলাপ-আলোচনা বন্ধ করে দিলে তখন উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেখানকার মানুষ তথ্য পেয়ে অভ্যস্ত এবং গুজব যেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেখানেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সংকট সামাল দেওয়ার জন্য চীনের সব পর্যায়ের কর্মকর্তার উদ্যোগী ও খোলামেলা হওয়া খুব জরুরি।

বাকিদেরও উচিত গভীরভাবে পরিস্থিতির দিকে খেয়াল রাখা। নতুন মহামারি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় বটে, তবে পরবর্তী সময়ে হুমকি মোকাবেলায় উন্নততর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগটি যেন আমরা পাই। গবেষণাব্যয় বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সেই প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। রোগ নিয়ন্ত্রণে হাত ধোয়া আর প্রতিষেধক গ্রহণের মতো তথ্য লেনদেনও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাও প্রস্তুতির অংশ হতে পারে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা