kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুর্নীতি রোধে আশানুরূপ অগ্রগতি কেন হচ্ছে না?

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতি রোধে আশানুরূপ অগ্রগতি কেন হচ্ছে না?

বর্তমান সরকার দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছে। এমনকি জিরো টলারেন্সের অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে দল ও সরকারের ভেতরে নানা ধরনের শুদ্ধি অভিযান আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শুদ্ধি অভিযানের ফলে সরকারের ভাবমূর্তিও কিছুটা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা বাড়লেও শুদ্ধি অভিযানের বর্তমান গতি ও পরিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা ছাড়া সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কিছু দৃষ্টান্ত সামনে আসছে। আর দুর্নীতির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বৈষম্য। যেকোনো সরকারের যতই উন্নয়নের যাত্রা হোক না কেন, বৈষম্যমূলক সমাজ গড়ে উঠলে দুর্নীতির স্তরে কোনোভাবেই অগ্রগতি ঘটবে না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা লক্ষ করি যে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ফলে তাদের জনপ্রিয়তার স্তর আগের চেয়ে যথেষ্ট বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত জরিপে গত এক বছরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। জনপ্রিয়তা বাড়া বা কমার পাশাপাশি আইআরআইয়ের জরিপে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে—দুর্নীতি ও বৈষম্য। ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করে বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ৩১ শতাংশ জানিয়েছে, দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের জীবনে। ১৯ শতাংশ দুর্নীতিকেই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে গত ২৩ জানুয়ারি বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) সারা বিশ্বে একযোগে দুর্নীতির ধারণা সূচক-২০২০ প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে গতবারের মতোই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে। আগের বছরের তুলনায় তিন ধাপ উন্নতি হলেও এই অবস্থানকে উদ্বেগজনক হিসেবেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

কারণ সরকার যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, ঠিক সে সময়ে টিআইয়ের প্রতিবেদনে আশানুরূপ উন্নতি আশা করাটাই ন্যায্য ছিল। কারণ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপে সরকারের জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি দুর্নীতির ধাপের আশানুরূপ অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত ছিল। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি থাকলেও তৃণমূল বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি দৃশ্যমান রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে খুব বেশি আগ্রহ কিংবা ভূমিকা লক্ষ করা যায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক। বিভিন্ন অফিস-আদালতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের নিজ পদে বহাল রেখে অনেক সময় তদন্তের মতো স্পর্শকাতর কার্যসম্পাদন করা হয়। এমনকি অভিযুক্তদের সাময়িকভাবেও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি না দিয়ে তদন্ত করতে দেখা যায়। একটি দেশের সুশাসন নিশ্চিত করতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশ সরকার সেই নীতিকে কাগজে-কলমে খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র যথেষ্ট সন্তোষজনক নয়। এ কথা অনস্বীকার্য, যেকোনো সমাজব্যবস্থায় বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে সুশাসন যেমন চরমভাবে ব্যাহত হয়, তেমনি দুর্নীতিও বেগবান হয়।

তত্ত্বগতভাবে যেসব দেশে দুর্নীতির মাত্রা বেশি, সেসব দেশে বৈষম্য প্রকট। উদাহরণ হিসেবে সোমালিয়া, ইয়েমেন ও উত্তর কোরিয়ার কথা বলা যায়। আবার যেসব দেশে দুর্নীতি কম, সেসব দেশে বৈষম্যও কম। যেমন—নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে বাংলাদেশও বিএনপির আমলে চারবার ও আওয়ামী লীগ আমলে একবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে এক দল অন্য দলকে এবং এক সরকার অন্য সরকারকে তাদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে। দুর্নীতিতে কোনো সরকার নিজেদের অবস্থান উন্নতি করতে না পারলে আগের সরকারের সঙ্গে তুলনা করেই সন্তুষ্টি অর্জনে মেতে থাকে। আবার কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির বৈধতা আনয়নের জন্য অন্যদের উদাহরণ সামনে আনে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই সুশাসনের জন্য কাম্য নয়।

গত ৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ৩০ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘এটা করতে হবে এই জন্য, আমরা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। আর সেখানে যদি কোনো অনিয়ম হয়, উন্নয়ন তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বরাবরই এ ধরনের আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। তবু দুর্নীতির মাত্রার আশানুরূপ অগ্রগতি কেন হচ্ছে না এমন প্রশ্ন মাথায় আসাটা অস্বাভাবিক নয়। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুদক যথাযথ ভূমিকা পালন করছে কি না সেটি নিয়েও এক ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাধারণের। অনেক ক্ষেত্রে আমরা অভিযোগ শুনি যে সরষের ভেতরের ভূত তাড়াতে হবে। কারণ যাঁরা দুর্নীতি করেন আর যাঁরা দুর্নীতি ধরেন, তাঁদের মধ্যে বহু বছর ধরে একটা আঁতাত গড়ে উঠেছে। ডিআইজি মিজান ও দুদকের পরিচালক এনামুল বাছিরই এর একমাত্র উদাহরণ নন। এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে।

যেকোনো সরকারের জন্য বিরাট একটি কাজ হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের স্বাধীনতার পর সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে, টেকসইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। দুর্নীতি রোধ করার জন্য যে ধরনের সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া দরকার, তা দেখা যায়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি এবং আন্তরিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে দেশের প্রশাসনিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়ে থাকে। এর মধ্যে সেবা খাতের দুর্নীতি মাত্রা ছাড়িয়েছে। এ খাতের দুর্নীতির কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অথচ সরকার, মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানেই রয়েছে যথোপযুক্ত নির্দেশনা। সংবিধানে ৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে। ১৯৭২ সাল থেকেই সংবিধানে এ বিধি বিদ্যমান আছে। পার্লামেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত ন্যায়পাল সরকার, মন্ত্রণালয়, সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করতে পারেন। কিন্তু ন্যায়পাল নিয়োগে বরাবরই অনীহা দেখিয়েছে প্রতিটি সরকার। দীর্ঘ ৪৭ বছরেও ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ন্যায়পাল নিয়োগ দিলে মন্ত্রী-সচিব সবার দুর্নীতির পথ কিছুটা হলেও বন্ধ হতো—এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা