kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

শুভ জন্মদিন

সাদা মনের মহানুভব ব্যক্তিত্ব

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাদা মনের মহানুভব ব্যক্তিত্ব

আজ থেকে ঠিক ৮৬ বছর আগে ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেটে তাঁর জন্ম। নিজের মেধা, শ্রম, কর্মচিন্তা আর সৃষ্টিশীল সুকুমারবৃত্তির চর্চায় যিনি নিজেকে তৈরি করেছেন হাজারোজনের একজন হিসেবে। ভাষাসৈনিক, আমলা, কূটনীতিক, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, পরিবেশবিদ, লেখক, গবেষক বহু অভিধায় তাঁকে অভিহিত করা যায়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আমার মতে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি সাদা মনের বিশাল হৃদয়ের এক মহানুভব ব্যক্তিত্ব। যাঁর শিশুসুলভ সরল হাসি যে কারো মন জয় করে নিতে পারে। বলছি আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা। বর্ণিল কর্মজীবনের ৮৬ বছর কাটিয়ে স্যার আজ ৮৭ বছরে পদার্পণ করছেন।

তাঁর মতো ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করার জ্ঞান ও যোগ্যতা কিছুই রাখি না। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সুবাদে স্যারের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি তুলে ধরতেই এই লেখা।

প্রথম তাঁকে সামনাসামনি দেখি ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হয়ে তিনি সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম নির্বাচন। আমি সেই সময় সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। নগরের উপশহরে অস্থায়ী নিবাস গড়েছি। সেখানেই এক নির্বাচনী সভায় তাঁকে প্রথম দেখি। গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তিনি সাবলীলভাবে বর্ণনা করেন তাঁর নির্বাচনী দর্শন ‘আলোকিত সিলেট’। প্রতিপক্ষকে দোষারোপ আর নিজ দলের গুণকীর্তনে ভরপুর জ্বালাময়ী বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত অনেকের কাছে,  স্যারের সেদিনকার বক্তব্য আকর্ষণীয় না হলেও তিনি যে নতুন কিছু করার চিন্তা নিয়ে রাজনীতির মাঠে নেমেছেন তা বুঝতে ভুল করিনি।

২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১০ সালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদান করলে তাঁর অধীনে কাজ করার সুযোগ হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল কাজই হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির দায়িত্ব পালন। মধ্যপ্রাচ্য শাখা-১-এর দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর। উন্নয়ন সহযোগী দেশ সৌদি আরব এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক করপোরেশন ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য প্রাইভেট সেক্টর (আইসিডি)’ ও  ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফিন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)’ সম্পর্কিত সব কার্যাদি মধ্যপ্রাচ্য শাখা-১-এর অন্তর্ভুক্ত। প্রায়ই এসংক্রান্ত নানা বিষয়ে মন্ত্রী বরাবর নথি উপস্থাপন করতে হতো। এরই ধারাবাহিকতায় একবার আইসিডির নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়। সংস্থার বোর্ড সভায় নীতিগত অনুমোদনপ্রাপ্ত তিনটি প্রস্তাবের মধ্য থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামত চাওয়া হয়। তিনটি প্রস্তাবনা নিয়েই বিস্তারিত বর্ণনা করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা সমর্থন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রী বরাবর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। দুই দিন পর অনুমোদিত সারসংক্ষেপ শাখায় ফেরত আসে। স্যার শুধু প্রস্তাব অনুমোদন করেননি, চমৎকারভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করায় সারসংক্ষেপের শেষাংশে স্বহস্তে ধন্যবাদজ্ঞাপক মন্তব্য লিখে দেন। সরকারি চাকরির তিন মাসের মধ্যে মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য প্রাপ্তি ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। বলতে দ্বিধা নেই, স্যারের কাছ থেকে এমন অনুপ্রেরণামূলক মন্তব্য শুধু আনন্দিতই করেনি, আমার কর্মস্পৃহাকেই অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। অতঃপর আরো কয়েকবার তাঁর এমন লিখিত অভিবাদন পাওয়ার সৌভাগ্য হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সাড়ে তিন বছর চাকরি শেষে নতুন কর্মস্থল অর্থ বিভাগে যোগদান করে স্যারের আরো কাছাকাছি কাজ করার এবং কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই। বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেটি অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে প্রস্তুত করে। রাজস্ব আহরণ, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং আমদানি ও রপ্তানি শুল্কসংক্রান্ত বিষয়াদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অন্য বিষয়গুলো অর্থ বিভাগ প্রণয়ন করে। রাজস্ব বোর্ডসংক্রান্ত বক্তব্য একেবারে শেষ মুহূর্তে সন্নিবেশ করা হয় বলে বাজেট বক্তব্য বাজেট পেশের আগের রাতেই মুদ্রণ করা হয়ে থাকে। দেখা গেছে মধ্যরাতে বাজেট বক্তব্যের খসড়া মুদ্রণের পর স্যার এর পুরোটা পড়ে তারপর চূড়ান্ত অনুমোদন দিতেন। এতে অনেক সময় গভীর রাত হয়ে গেলেও তাঁর মধ্যে কোনো ক্লান্তি বোধ দেখিনি। পরদিন সকালে ঠিকই মন্ত্রিসভায় উপস্থিত হয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিগত অনুমোদন নিয়ে দুপুরে দীর্ঘ বাজেট বক্তব্য সংসদে পেশ করতেন। এত বয়সেও তাঁর এমন কর্মতৎপরতা সত্যিই ঈর্ষণীয়।

আমাদের অনুবিভাগের অন্যতম প্রধান কাজ ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও ‘Bangladesh Economic Review’ প্রণয়ন করা। এর আগে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ বাজেট দলিল হিসেবে সংসদের বাজেট অধিবেশনে উপস্থাপন করা হতো। ‘Bangladesh Economic Review’ সাধারণত অক্টোবর মাসে প্রকাশ করা হতো। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে দুটি প্রকাশনাই বাজেট দলিল হিসেবে বাজেট অধিবেশনে সংসদে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি প্রকাশনই প্রায় সাড়ে ৩০০ পৃষ্ঠার। বাজেট উপলক্ষে অনেক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সাধারণত পুরো বই পড়ে মুদ্রণের অনুমোদন দিতেন। এমনও হয়েছে, ব্যস্ততার কারণে পুরো পাণ্ডুলিপি পড়তে না পারায় বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে বসে পুরোটা পড়ে অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিটি নথিতেই তিনি কিছু না কিছু লিখতেন। কখনো সংশ্লিষ্টদের অভিবাদন জ্ঞাপন, কখনো বা কোনো উপদেশ, আবার কখনো কোনো তথ্য সংযোজন বা বিয়োজনের নির্দেশনাসংবলিত মন্তব্য লিখতেন।

‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও ‘Bangladesh Economic Review’-তে অর্থমন্ত্রীর একটি মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রতিবারই আমাকে এ দায়িত্ব নিতে হয়েছে। খসড়ায় শব্দগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া স্যার কখনো তেমন কোনো পরিবর্তন করেননি। ‘Bangladesh Economic Review 2018’-তে স্যারের সর্বশেষ মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। যথারীতি খসড়া উপস্থাপন করা হলে তিনি কয়েকটি শব্দ অদল-বদল করে দেন। সংশোধিত খসড়ায় তাঁর স্বাক্ষর আনতে গেলে পুরোটা পড়ে হঠাৎ স্বভাবসুলভ সরল হাসি দিয়ে বলেন, সব কিছুই ঠিক লিখেছ, শুধু নামের বানান ভুল। উল্লেখ্য, তিনি ‘Muhith’ লিখুন, যা ভুলবশত ‘Muhit’ লেখা হয়েছিল। এ ঘটনায় যতটা না লজ্জিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি বিমোহিত হয়েছি স্যারের আচরণে। এমন ভুলের কারণে রাগান্বিত হয়ে রূঢ় আচরণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক। অথচ স্যার এত সহজভাবে ভুলটা ধরিয়ে দিলেন যেন তা হতেই পারে।

শুরুতে বলেছি, তাঁর প্রথম বক্তব্য শুনেই মনে হয়েছিল নতুন কিছু করার প্রত্যয় নিয়েই তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। স্বেচ্ছায় নির্বাচন ও মন্ত্রিত্ব থেকে সরে গিয়ে  প্রমাণ করেছেন, তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। মন্ত্রী হিসেবে শেষ কার্যদিবসে অর্থ বিভাগের দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি বলেন, লেখালেখি আর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বই পড়ার মাধ্যমেই কাটাতে চান তাঁর অবসর জীবন। আজকের শুভ দিনে আমাদেরও প্রত্যাশা, স্যার আপনি আরো বহু দিন আমাদের মাঝে থাকুন। আপনার লেখনী সমৃদ্ধ করুক বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিকে। আপনার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক নতুন প্রজন্ম, আগামী দিনের বাংলাদেশ।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সচিব

অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা