kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

অনলাইন থেকে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাব কী হতে পারে

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা গুরুত্ববহ। সতর্ক হিসাব কষে প্রতিশোধমূলক এ হামলা চালানো হয়েছে, এতে যে স্বস্তির বোধ রয়েছে তা বোধগম্য; এতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রয়েছে। ঘটনাটি অনেক বিপর্যয়কর হতে পারত। যা হোক, এ ঘটনার মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিরোধ-বিপর্যয় খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখা গেছে, তবে এড়ানো সম্ভব হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও বলেছেন, ইরান পশ্চাৎপসরণ করেছে; কিন্তু ইরানের হামলার প্রকৃত প্রভাব (ক্ষয়ক্ষতি) আসলেই কী তা হয়তো কয়েক মাসেও বা কয়েক বছরেও জানা সম্ভব হবে না।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে, যেখানে তার ও কোয়ালিশনের সৈন্যরা থাকে সেখানে হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলা ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস অবরুদ্ধ করার পর মার্কিনদের ওপর ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা এবং কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে প্রথম সরাসরি হামলা। এটি খুবই সাহসিকতাপূর্ণ এবং স্মারক হামলা : জেনারেলের (সোলাইমানি) নিহত হওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যথাসময় বিবেচনা করেই হামলাটি চালানো হয়েছে, যদিও তা সীমিত মাত্রার। ইরান বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮০ জন মার্কিন নিহত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, কোনো মার্কিন এ ঘটনায় হতাহত হয়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদিল আব্দুল-মাহদি বলেছেন, হামলার ঠিক আগে ইরান তাঁকে অভিযানের বিষয়ে অবহিত করে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ টুইটারে বিবৃতি দিয়েছেন যে তাঁর দেশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কাজ সম্পন্ন করেছে। তিনি এ কথাও বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে বা যুদ্ধ বাধাতে চাই না।’

সর্বাত্মক যুদ্ধ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের নেই—এটা ধরে নিয়ে বলা যায়, এই হামলাকে বিবেচনাপ্রসূত প্রতিক্রিয়াই মনে হয়; কঠিন প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলে যে কথা বলেছিল, এটাকে সেভাবে দেখা কঠিন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের গালে চপেটাঘাত। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে কী হবে না—সে ভাবনা আপাতত দূরে রেখে বলা যায়, গত সপ্তাহের ঘটনাবলি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার অনিবার্য করে তুলেছে। ইরানের গর্ববোধে আঘাতের বেদনা প্রশমনের জন্য সেটা পর্যাপ্ত। ইরান তখন বলতে পারবে—সোলাইমানি অনেক দিন ধরে যা চেয়েছেন, তারা মার্কিনদের তাড়িয়েছে। সেটা হলে ২০০৩ সালের বিপর্যয়কর আগ্রাসনের ঘটনার কোনো অর্জন দাবি করার মতো কিছু যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে না।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানকে তার ‘যৌক্তিক’ অস্বীকৃতির অবস্থানে, প্রক্সি বাহিনীগুলোর ওপর নির্ভর করার জায়গায়, সাইবার হামলা চালানোর অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিরা আক্রান্ত হচ্ছে, আঞ্চলিক মিত্রদের তেল অবকাঠামোগুলোতে হামলা হচ্ছে, সিরিয়া থেকে ইসরায়েলে আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের তৎপরতা আফগানিস্তানেও অনুভূত হতে পারে। আরো অনেক দূরবর্তী স্থানেও মার্কিনরা আক্রমণের শিকার হতে পারে।

সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড ইরানকে প্রচণ্ড হামলা পরিচালনার অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে। মার্কিন কমান্ডার-ইন-চিফের (ট্রাম্পের) বিপর্যয়মুখী প্রবণতা ও নির্বুদ্ধিতার বিষয়ে ইরান আরো বেশি সতর্ক-সচেতন; তাঁর ওপর মার্কিন প্রশাসনের ইরানবিরোধী যুদ্ধবাজদের প্রভাবের ব্যাপারেও তারা অবহিত। গত সপ্তাহের ঘটনাবলি আরো স্পষ্ট করেছে, মিস্টার ট্রাম্পের কোনো ইরান পলিসি নেই, গোঁয়ার্তুমি আর এক বস্তা কুসংস্কার ছাড়া। মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটোর আরো সক্রিয় হওয়া উচিত—তাঁর এ পরামর্শ ঘোলাটে পরিস্থিতিকে আরো ব্যাপ্ত করেছে। তিনি অভিশংসন প্রক্রিয়া থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য মরিয়া। নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি আরেক দফায় জিততে চান। হোয়াইট হাউসে ঢোকার আগে তিনি প্রায়ই বলতেন, পুনর্নির্বাচনের জন্য বারাক ওবামা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাতে পারেন।

বলতেই হয়, বারাক ওবামা পরমাণু চুক্তিটি করতে পেরেছেন, যেটি নস্যাৎ করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। জেসিপিওএর কারণে তেহরানের পরমাণু অস্ত্র বানানোর চেষ্টা স্থগিত হয়েছে। গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আরো ভালো চুক্তি করার জন্য যুক্তরাজ্য ও অন্যদের উচিত তাঁকে সহায়তা করা। তাঁর প্রশাসনের সদিচ্ছা যদি থেকেও থাকে, তাহলেও এমন চুক্তিতে যাওয়া অথবা এর জন্য মধ্যস্থতা করা অযৌক্তিক কাজ হবে। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে তিনি তেহরান ও অন্যদের এ বার্তাই দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই বিশ্বাসের অযোগ্য (ইরাকে হামলা চালিয়ে জর্জ বুশও একই কাজ করেছিলেন)। তিনি এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছেন যে মানববিধ্বংসী অস্ত্র বানানো ও মজুদ করা অস্তিত্ব রক্ষার মূল শর্ত। বিদ্যমান সংকটে স্বল্প মেয়াদে অর্জন যা-ই হোক, দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব শঙ্কাজনক।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা