kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

বঞ্চনার শিকার উত্তরের কৃষক

ড. শফিক আশরাফ

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বঞ্চনার শিকার উত্তরের কৃষক

অন্যান্য বছরের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে এবারের শীত বেশ জেঁকে বসেছে। যেহেতু উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত, সেহেতু শীতের দুর্ভোগ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর বেশি পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগের মতো নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। গরম কাপড়ের অভাবে খড়ের আগুনে শীত নিবারণ করতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনার মুখে পতিত হওয়ার খবর শোনা যায়। তবে এবারে শীতের চেয়েও বেশি যে কষ্টটা উত্তরের কৃষকদের তাড়িত করেছে সেটা হলো, কম উৎপাদনশীল সবজি ও ফসলের বীজ, ভেজাল বালাইনাশক ও সারের জোগান। আগে এখানকার কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় সবজি ও বিভিন্ন ফসলের বীজতলা তৈরি করত এবং নিজেদের উৎপাদিত চারা দিয়েই তারা আবাদ করতে মাঠে নামত। এই তো প্রায় ২০-২৫ বছর আগে তাদের সেরা বীজগুলো কলসে-হাঁড়িতে বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ করত। সেই বীজের উৎপাদনশীলতাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বিভিন্ন বীজ ব্যবসায়ীর আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে নিজেরা বীজতলা তৈরি না করে তাদের সরবরাহকৃত প্যাকেটজাত বীজ কিনে ফসল ফলাতে উৎসাহিত হয়। প্রথম দিকে সরবরাহকৃত এসব বীজ বিজ্ঞাপনের মতো না হলেও বেশ ভালো ফলন দিয়েছে। ধীরে ধীরে তারা বাজার থেকে বীজ কিনেই সবজি ও ফসল উৎপাদনে অভ্যস্ত হয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাঝেমধ্যেই তাদের নিম্নমানের বীজ সরবরাহ করা হয়। মাঠে বীজ লাগানোর আগে জমি কর্ষণ করা, সার-গোবর-মই দিয়ে মাটিকে উর্বর ও উৎপাদন-উপযোগী করতে তাদের প্রচুর শ্রম-ঘাম ও অর্থ ব্যয় হয়। সেখানে বীজ বপন করার পরে যখন চারা গজায় না, তখন তারা প্রথমে ভাবে, এগুলো কোনো অভিশাপ কিংবা মাটির দোষ! এরপর তারা আবার নতুন করে মাটি কর্ষণ করে জমি তৈরি করে অন্য কোনো কম্পানির বীজ এনে হয়তো বপন করে, কিন্তু তাতে আগের চেয়ে হয়তো কিছুটা বেশি চারা গজায়, সেটা তাদের আশানুরূপ নয়। এ ছাড়া নিজেরা যখন বীজতলা তৈরি করত, সেখানে শুধু তাদের শারীরিক শ্রম ছাড়া অন্য কোনো ব্যয় খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এখানে তাদের বাজার থেকে বীজ কিনতে হয় অনেক বেশি দাম দিয়ে। এক কেজি ধানের দাম ২০ টাকা হলে সেই ধান বীজ হিসেবে কিনতে হয় প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দিয়ে। কখনো কখনো সেটা ৭০০-৮০০ টাকাও হয়! এক কেজি পেঁয়াজের বীজ দুই হাজার ৩০০ টাকা! এরপর তাদের সেই কষ্টের বীজ থেকে চারা বাড়তে থাকলে নানা ধরনের রোগজীবাণু আক্রমণ করে। তারা ডিলারদের কাছ থেকে বালাইনাশক জমিতে ছিটানোর পরও পোকা মরে না! উত্তরের কৃষকদের জিম্মি করে এক শ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর এই কারসাজিতে উত্তরের কৃষকরা অসহায়। তাদের পাশে নেই সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দল। কখনো কোনো এনজিও ভালো বীজ সরবরাহের প্রচেষ্টা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে জোটবদ্ধ বীজ-বালাইনাশক ব্যবসায়ীরা কৌশল করে তাদের এলাকা থেকে বিতাড়নের ব্যবস্থা করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসি থেকে কিছুটা উন্নতমানের বীজ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা শুধু অপর্যাপ্তই নয়, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছে এসব বীজ বিক্রি করে না, বিক্রি করে বিভিন্ন ডিলারদের কাছে। এরপর এসব বীজ দালাল ও ফড়িয়া বিভিন্ন মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে, সেটা কোনোভাবেই প্রান্তিক কৃষকদের কাছে নয়। আরো অবাক বিষয় হলো, এই বীজ কৃষকদের চাহিদার তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ, বাকি ৯৫ শতাংশ বীজ তারা সংগ্রহ করে বিভিন্ন কম্পানির ডিলারদের কাছ থেকে।

উত্তরাঞ্চল দেশের শস্য ও সবজি ভাণ্ডার। আমরা ভুলে যাই উত্তরের সমৃদ্ধি মানে দেশের সমৃদ্ধি। এই শীতকালে বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের শীতের শিশির ভেজা সবজি সারা দেশের ঘরে ঘরে পুষ্টি ও রসনা মেটাচ্ছে। এসব সবজির গায়ে লেখা থাকে না তাদের বঞ্চনা ও হাহাকারের কথা, ভোক্তা জানে না তাদের কষ্টের কথা। কিন্তু যাদের জানার কথা তাদের উদাসীনতা দুর্ভাগ্যজনক। সরকার সারা দেশে প্রতিটি জেলায়, থানায় কৃষি বিভাগ খুলে বসে আছে। এদের চালাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এসব অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেখানে তারা সফলতা দেখাতে পারছে না। উত্তরের কৃষকরা সার্বিকভাবে তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পায় না। নীলফামারীর ডিমলার এক প্রান্তিক কৃষক ছোহরাব মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, আধা বিঘা জমিতে তিনি দুই হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজের বীজ ছিটান, কোনো চারা হয়নি। দ্বিতীয়বারের মতো তিনি আবার বীজ কিনে ছিটান। এবারও তেমন চারা বের হয়নি। গত বছরও তিনি এ ধরনের সমস্যায় পড়েছিলেন। তিনি জানান, বিগত ৫০ বছরে তিনি মাঠপর্যায়ে কোনো কৃষি কর্মকর্তা দেখেননি। কীটনাশক বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা আরো তিক্ত। তিনি জানান, একবার তাঁর শস্যে পোকা আক্রমণ করলে এক-দেড় শ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে কৃষি অফিসারের সাহায্যের জন্য তাঁদের অফিসে যান। কৃষি অফিসার শস্যের স্যাম্পল দেখে প্রতিষেধক লিখে দেন। কিন্তু সেই প্রতিষেধক কোনো কাজ করেনি। উল্টো সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় বলে মনে করেন ছোহরাব মণ্ডল। তাঁরা এখন নিজেদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বা অভিজ্ঞ কোনো কৃষকের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে শস্যে রোগবিষয়ক সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেন। সরকারি কৃষি অফিসের এই বিফলতার কারণ হলো—এসব অফিসে কার্যকর ও যথাযথ নজরদারি করা হয় না। কোনো সমস্যা নিয়ে কৃষকরা তাদের কাছে পৌঁছতে পারলেও নানা সমস্যার কথা বলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে বীজ ব্যবসায়ী ও ডিলারদের কৃষকের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়ে উত্তরাঞ্চলে কয়েকজন কৃষি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের কেউ ভোক্তা অধিকার আইনে মামলার কথা বলেন, কেউ তাঁদের কোনো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকার কথা বলেন, আবার কেউ এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কথা বলেন। অন্যান্য সরকারি দপ্তরের মতোই আমলাতান্ত্রিক ঘোরপ্যাঁচের চক্রে আবদ্ধ এসব অফিস। যত দিন বুকের ভেতর দেশকে ধারণ না করে আমরা যখন শুধু চাকরি করব বেতনের জন্য, তত দিন এ ধরনের চক্র ভাঙবে বলে মনে হয় না। আর প্রান্তিক মানুষ বঞ্চিত হতে থাকবে সরকারি সেবা থেকে। সরকারের উচিত অধিক পরিমাণে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিএডিসিকে সক্ষম করে তোলা এবং বীজ সরবরাহকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারিতে নিয়ে আসা।

উত্তরের কৃষকদের কষ্টের কথা যেন কান পেতে শোনার কেউ নেই। আমরা পেঁয়াজের দাম, সবজি, চালের দাম বেড়ে গেলে হৈচৈ করি। কিন্তু উত্তরের যে কৃষক কনকনে হাড় কাঁপানো শীতে একখণ্ড শীতবস্ত্রের অভাবে কাঁপতে কাঁপতে আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য সূর্যোদয়ের আগে পরম মমতায় মাটিতে হাত রাখে, মায়াভরা চোখ দিয়ে ফসলের দিকে তাকায়, তাদের দিকে আমরা কেউ তাকাই না, তাদের সমস্যাটাও বোঝার চেষ্টা করি না। যত দিন সেটা না করব, তত দিন দেশ দাঁড়াবে না।

লেখক: সহয়োগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা