kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুটি রায় অন্ধকার রাজনীতির বিষয়ে সতর্ক করে দিল

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুটি রায় অন্ধকার রাজনীতির বিষয়ে সতর্ক করে দিল

এ দেশে আইনের শাসন স্বাভাবিক নিয়মে গড়ালে আজ এই লেখাটির আয়োজন একটু অন্যভাবে হতে পারত। ২০ জানুয়ারি একই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আদালতে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ মামলার রায় হলো। বলা যায় দুটি মামলাই বহু আগে হিমাগারে চলে গিয়েছিল। অন্ধকার রাজনীতির অচলায়তন সব সতর্কতার সঙ্গে ঢেকে রেখেছিল। পরে অনুকূল আলো-বাতাস থাকায় শেষ পর্যন্ত হিমাগার থেকে টেনে বের করা হয় মামলা দুটি। অবশেষে শত অন্ধকার ঠেলে মানবতার জয় হলো। নিম্ন আদালতে ঘোষিত হলো রায়। দেশে কয়েক শ মামলা প্রতিদিন আদালতে গড়াচ্ছে বা গড়াচ্ছে না, দেশবাসী তার কতটা খোঁজ রাখে! অথবা কয়টি মামলাই অন্যকে স্পর্শ করে। কিন্তু রায় ঘোষিত মামলা দুটি যে ধরনের অমানবিক ও হিংস্র ছিল তা ব্যক্তি বা দলে আটকে থাকেনি; বরং তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভয়ংকর হিংস্র চেহারা উন্মোচিত করে। দুটি ঘটনার চরিত্র একসঙ্গে মূল্যায়ন করলে বলতে হবে অগণতান্ত্রিকভাবে অন্ধকার থেকে জন্ম নেওয়া রাজনীতি এবং সেই রাজনৈতিক শক্তি যদি রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ পায়, তবে নরখাদক বাঘ হয়ে যায়। রক্তখেকো হায়েনার আচরণ করে।

১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে তৎকালীন বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় নেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশ গুলি চালায়। কপাল গুণে নেত্রী বেঁচে গেলেও অকুস্থলে জীবন হারায় ২৮টি তাজা প্রাণ। তখন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ক্ষমতায়। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিরক্ত মানুষ তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের জনসভা। এই পর্বে এরশাদ সরকারের হিংস্রতার অনেক প্রমাণ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটানো হলো রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর হাত দিয়ে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্র হাতে ক্ষমতা যারা দখল করে, তাদের অনেক সময় রাজনৈতিক দীক্ষা প্রখর থাকে না। তারা শক্তির মধ্য দিয়ে সব করায়ত্ত করতে চায়। গণতান্ত্রিক ধারা বিপন্ন করে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করে। তাই এমন ভয়ংকর গণহত্যার পরও মামলা নিতে পারেননি পুলিশ বা আদালত। দীর্ঘকাল বাদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অন্ধকার সরিয়ে যেটুকু আলো বিচ্ছুরিত হয়, তাতে নতুন করে আদালতে মামলা গড়ায়। আর এর পরিণতিতে ৩১ বছর পর এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য করা মামলার রায় প্রকাশিত হলো।

দ্বিতীয় মামলাটি সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত নয়—তবে রাষ্ট্রীয় মদদ এই হত্যাকাণ্ডেও যুক্ত ছিল। ২০০১ সালে রাজধানীর পল্টনে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা করেছিল হরকাতুল জেহাদের জঙ্গিরা। এতে পাঁচজন মৃত্যুবরণ করেন এবং ১৩ জন আহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। লালদীঘিতে এরশাদ সরকার রাজনৈতিক প্রবল প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছিল। এখানে বলা যায়, পল্টনের হামলায় ইসলামী জঙ্গিদল প্রথম মানুষ হত্যা করে নিজেদের পশুত্বকে জানান দেয়। সে সময় সরকার সক্রিয় হলে গোড়াতেই জঙ্গিদের নির্মূল করা যেত। কিন্তু তা ঘটেনি। বিএনপি সরকার সে পথে হাঁটেনি; বরং জঙ্গিদের আড়াল করতে চেয়েছে। তেমন তদন্ত না করেই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছিল। এর পরবর্তী সময়েও বারবার জঙ্গিদের আড়াল করতে ও ব্যবহার করতে দেখা গেছে বিএনপি সরকারকে। আসলে এরশাদের জাতীয় পার্টির মতো বিএনপিও জন্মসূত্রে অগণতান্ত্রিক দল। রাজনীতির মাঠে বারবার টিকে থাকার জন্য জনগণের শক্তির ওপর ভরসা না করে পেশিশক্তিকেই ব্যবহার করতে চেয়েছে। তাই বরাবর হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পথে হেঁটেছে। এরশাদের পুলিশের লালদীঘি ময়দানে শেখ হাসিনাকে মারার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করা আর ২১ আগস্ট বিএনপি আমলে গুলিস্তানে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাওয়া ভবন নিয়ন্ত্রিত শক্তির গ্রেনেড হামলা চালিয়ে অসংখ্য মানুষ আহত-নিহত করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

দীর্ঘদিন পরে হলেও রায় ঘোষিত হওয়ায় আমরা আনন্দিত। তবে একটি প্রশ্ন আমাদের মনে কাজ করছে। এই যে লালদীঘিতে পুলিশ সদস্যরা গুলি করে মানুষ হত্যা করল, এর শতভাগ দায় কি শুধুই দণ্ডিত পুলিশ সদস্যদের? নিশ্চয়ই বড় দায় রয়েছে, না হলে আদালত চরম দণ্ড দেবেন কেন! তবে এ প্রশ্নটি আসে যে কোনো পুলিশ সদস্যের হঠাৎ ছোড়া গুলিতে এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া কঠিন। কারো নির্দেশ পালন করতে হয়েছে। মামলার বিবরণে জানা গেল, চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি এরই মধ্যে মারা গেছেন। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, পুলিশ কমিশনারের তো স্ব-ইচ্ছায় ও স্ব-উদ্যোগে এত বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে নামার কথা নয়। যে সরকারি ও রাজনৈতিক অঞ্চল থেকে তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন তারা কি পর্দার অন্তরালে থেকে যাবে? এ বিষয়ে তো বক্তব্য পেলাম না। এখানেই আমাদের রাজনীতির বড় সংকট। অনেক নোংরা রাজনৈতিক বোঝাপড়া থাকে। ন্যায় শাসনের বদলে কাকে বা কাদের ঘাটানো যাবে বা যাবে না, এসব বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই এরশাদ আমলে এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরও মামলা নিতে পারে না পুলিশ। আবার সিপিবি তো বিএনপি সরকারের ক্ষমতার ভাগীদার ছিল না। আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে জঙ্গিরা বোমা হামলা করেছে। জঙ্গিবাদের ভয়ংকর উত্থানের সময় তখন। সৎ ও দেশপ্রেমিক সরকার হলে তখনই শক্ত হাতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে তৎকালীন সরকার ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করল। রক্ষা করতে চাইল জঙ্গিদের। কিন্তু কেন?

এখানেই সময়ের সুবিধায় আত্মপ্রকাশ করা বিএনপির স্বরূপ উন্মোচিত হলো। বিএনপির পাকিস্তান পন্থা তো জন্মকাল থেকেই প্রকাশ্য। পরাজিত পাকিস্তান শুরু থেকেই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাখতে চেয়েছে। তাই উগ্র জঙ্গিরা বারবার বিএনপি নেতাদের আশ্রয় পেয়েছে। ছদ্ম গণতন্ত্রে তো আর আসল চেহারা ঢাকা পড়ে না! এমন বাস্তবতায় দীর্ঘ ১৯ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বোমা হামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পথ তৈরি হলো।

কিন্তু অশনিসংকেত থেকে আমরা বেরোতে পারছি না! এই তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রয়েছে। রাজনীতির মাঠেই দলটির জন্ম, রাজনীতির ময়দানেই বেড়ে ওঠা। কিন্তু এর পরও কি আত্মপ্রত্যয়ী হতে পেরেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা? আইনের শাসন আইনের স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিয়েছেন? যদি তা-ই হতো, তবে আজ লালদীঘির হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডরা সামনে চলে আসত। আর তেমনটি হলে এ দেশের মানুষ স্বস্তি পেত। আস্থা বাড়ত আইনের শাসনের প্রতি। সরকারকে বিশ্বস্ত মনে করতে পারত। কারণ এটুকু সত্য, মানুষ বিশ্বাস করে যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ও ষড়যন্ত্র ছাড়া হয় না। প্রয়োগকারীরা তো নিমিত্ত মাত্র।

এই তুলনায়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ব্যর্থতার সুযোগে বিএনপি তো ঠিক শক্ত ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু দলটির নেতৃত্বের মধ্যে সততা ছিল না। বেরোতে পারেননি পাকিস্তানপন্থী মনোভাব থেকে। দলটিকে গণতান্ত্রিকভাবে দাঁড় করানোর কোনো পরিকল্পনাই যেন গ্রহণ করেনি। তাই শাসনক্ষমতা থেকে ছিটকে যাওয়ার পর আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। রাজনীতির মাঠে প্রবল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে মোকাবেলার জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক কুশলী দক্ষতা থাকা প্রয়োজন, তা এ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি বিএনপি নেতৃত্ব। তৃণমূলকে শক্তিশালী করার মতো তেমন ভূমিকাও নেই। এর মধ্যে আত্মঘাতী সংকট তৈরি হলো সিপিবির বোমা হামলার রায় ঘোষিত হওয়ার কারণে। জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপি নেতৃত্বের সংশ্লিষ্টতার কথা সাধারণ মানুষকে এখন ভাবাবে। অপরাধের বিচারে এরশাদের সমপর্যায়ে চলে আসবে। যুক্তি আর প্রমাণে এখন ২১ আগস্ট বোমা হামলা প্রসঙ্গটিও চলে আসবে সামনে।

স্বাভাবিকভাবে রাজনীতির হিসেবে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি রাজনীতির মাঠে আরো কোণঠাসা হয়ে যাবে ঠিকই; কিন্তু আওয়ামী লীগেরও কি মুক্তি আছে? যদি সামাজিক ন্যায়বিচারকে দলীয় লাভালাভের দৃষ্টিতে দেখা বন্ধ না করে, তাহলে এই প্রতাপশালী দলেরও সাধারণ মানুষের আস্থা থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। আশা করব এই দুটি রায় অনেককেই অনেক কিছুর শিক্ষা দিতে পারবে!

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা