kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

গলছে বরফ হুমকিতে বিশ্বের সব উপকূল

অনলাইন থেকে

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



থোয়েইটস হিমবাহ—আকারে গ্রেট ব্রিটেনের সমান। বরফের এ বিশাল নদী ধরে রেখেছে বিপুল পরিমাণ জমাট পানি। সেই জমাটবাঁধা পানি যদি গলে যায়, তবে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফভূমির অংশ থোয়েইটস উপমহাদেশের সবচেয়ে অস্থিতিশীল হিমবাহ। গেল শতকের আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত থোয়েইটসের ৫৪ হাজার কোটি টন বরফ গলে অ্যামুন্ডসেন সাগরে মিশে গেছে। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চার শতাংশের পেছনে আছে স্রেফ এই একটি হিমবাহের গলে যাওয়া।

থোয়েইটস যেভাবে গলে যাচ্ছে, তাতে বিজ্ঞানীদের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বরফ গলা অব্যাহত থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আধা মিটার কিংবা এরও বেশি বেড়ে যাওয়া ঠেকানো যাবে না। কারণটা খুব পরিষ্কার—বিশালকায় আন্তর্দেশীয় হিমবাহের অস্তিত্ব বিপন্ন করে ফেলছে থোয়েইটস। থোয়েইটস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে সংলগ্ন হিমবাহগুলোও গলে যাবে। তাতে সম্ভবত আগামী কয়েক শতকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পুরো দুই মিটার বেড়ে যেতে পারে।

বসবাসযোগ্য এ পৃথিবীতে একটা জায়গায় যতখানি বাস অযোগ্য হওয়া সম্ভব, থোয়েইটসের অবস্থা ঠিক ততখানিই নেতিবাচক। এক জরুরি অভিযানে সেখানে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ও তাঁদের সহযোগী মিলে প্রায় ১০০ জনের একটি দল। ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের সেই দলে ছিলেন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও যন্ত্রবিশারদ। থোয়েইটসের ঢালু পাড়ে তাঁবু গেড়েছিলেন তাঁরা। সেখানে নিরেট বরফের ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত সরু গর্ত খুঁড়ে গরম পানি প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করেন তাঁরা। ছোট ছোট কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তাঁরা কয়েক দিনের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করেন।

গর্তটা কেন করতে হলো? এ গভীর গর্তে গবেষকরা টর্পেডোর মতো দেখতে আইসফিন নামের এক রোবটিক সাবমেরিন প্রবেশ করাবেন। ওই আইসফিন গর্তের আরো গভীরে পথ করে এগিয়ে যেতে থাকবে এবং পৌঁছে যাবে সেই জায়গায়, যেখানে হিমবাহ ভূপৃষ্ঠ ছুঁয়েছে। সেখানে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য অপেক্ষা করে আছে, যেটা আরো কয়েক মাস আগেই আবিষ্কার করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। ওই সময় তাঁরা বিমানে চড়ে হিমবাহ পর্যবেক্ষণে গিয়েছিলেন। বিমানে ছিল এক বিশেষ রাডার, যা হিমবাহের একেবারে ভিত্তিমূল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে সক্ষম। সেবারের সফরেই বিজ্ঞানীরা থোয়েইটসের ভিত্তিমূলে এক বিশাল ফাঁপা জায়গার অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। সেটির দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার ও প্রস্থ চার কিলোমিটার। জায়গাটি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। এত বড় একটি ফাঁপা জায়গা তৈরি হয়েছে এক হাজার ৩০০ টন বরফ গলে গিয়ে, তাও মাত্র তিন বছরে। হিমবাহের রুক্ষ ভিত্তিমূল আর ভূপৃষ্ঠের মাঝখানে পথ করে ওই পানি বেরিয়ে গেছে। কেউ টেরই পায়নি। থোয়েইটস এখন নিঃসন্দেহে আরো দ্রুত গলে যাবে। 

বিজ্ঞানীরা এত দিন ধরে যেসব পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন এবং জটিল জলবায়ু মডেল দাঁড় করিয়েছেন, সেগুলোর বিপরীতে থোয়েইটস এক কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে—প্রকৃতি যেকোনো সময় এমন বিস্ময়ের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, যা হয়তো আমাদের কাছে সুখকর হবে না। আমাদের প্রস্তুতি এতটা সুগঠিত নয় যে আমরা বৈশ্বিক ব্যবস্থার অবিকল একটা মডেল দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারব। মনে রাখা উচিত, বৈশ্বিক ব্যবস্থাটা জলবায়ুর চেয়ে মোটেই কম জটিল নয়। এ ব্যবস্থার প্রতিটি প্রক্রিয়া, প্রতিটি পর্যায়, গতিপথ আর এর আঘাত করার ক্ষমতা-সম্পর্কিত সব খুঁটিনাটি যদি আমাদের জানা না থাকে, তবে বিস্ময়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সব সময়ই আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত। আর সেই শিক্ষাটাই সম্ভবত থোয়েইটস হিমবাহ থেকে নেওয়া আমাদের জন্য জরুরি। থোয়েইটসে অভিযান যদিও যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যই চালিয়েছে, তার পরও বলতে হচ্ছে উভয় দেশেই বিজ্ঞান আজ ধ্বংসের মুখে। রয়্যাল সোসাইটি এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, ব্রেক্সিট অনিশ্চয়তার কারণে শীর্ষ বিজ্ঞানীদের খোয়াতে চলেছে ব্রিটেন। আর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তো নিজেই বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বিশেষত পরিবেশ ইস্যুর বিপরীতে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে এবং এর জেরে এরই মধ্যে অনেক গবেষক ইস্তফা দিয়েছেন। থোয়েইটস থেকে আমাদের যে বার্তা গ্রহণ করা উচিত সেটা হলো বিজ্ঞানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি নয়; বরং জলবায়ু সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আরো বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। বিজ্ঞান ছাড়া আমরা ভবিষ্যৎ হুমকিটা পুরোপুরি বুঝতেই পারব না, পারব না ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রভাব প্রশমিত করতে। অনভিপ্রেত বিস্ময় থেকে আমরা যদি রেহাই পেতে চাই, তবে আমাদের রক্ষাকবচ কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা