kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বাণিজ্যযুদ্ধের আপাত অবসান এবং সংশয়

ফরিদুল আলম

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাণিজ্যযুদ্ধের আপাত অবসান এবং সংশয়

দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলেও কমবেশি প্রতিফলিত হয়। অবশেষে গত ১৫ জানুয়ারি চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ হুয়ে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে তাঁরা এই যুদ্ধ থেকে সরে আসতে সম্মত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আপাতত দুই দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে এলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই চুক্তি কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে দুই দেশের বিশ্লেষকদের মধ্যেই। এই চুক্তির ফলে চীনকে আগামী দুই বছরের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অতিরিক্ত পণ্য এবং সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। আর সমস্যাটা এখানেই। এমন না যে এই ২০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য এবং সেবা চীন তাদের ইচ্ছানুযায়ী ক্ষেত্রে আমদানি করবে; বরং এখানে কয়েকটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের হিসাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিপালিত হতে হবে যথার্থভাবে। চীনকে এখানে সমন্বয় করতে হবে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিকে পরিমার্জন করতে হবে, অতিরিক্ত আমদানির ফলে নিজ দেশে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে যেন তা সহায়ক হয় এবং একইভাবে নিজেদের প্রয়োজন পূরণে যেন তা যথার্থ হয়, এই সব কিছুকে একটি সহনীয় পর্যায়ে যদি চীন নিয়ে আসতে সক্ষম হয় তাহলেই শুধু সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এবং সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে এবং তার অর্থনৈতিক উত্থানের ধারাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। একই সঙ্গে মেধাস্বত্ব চুরির দায়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এত দিন ধরে যেভাবে দায়ী করা হয়ে আসছিল সে বিষয়ে চীন আরো নিষ্ঠাবান থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে সদ্য স্বাক্ষর হওয়া দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তিটি অনেকাংশেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান এই দুঃসময়ে এটি সিনেটে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন শুনানি এবং এ বছর অনুষ্ঠেয় পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর জন্য ইতিবাচক ফলাফলের একটি অন্যতম নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

চীন আগামী দুই বছর সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ২০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে বাধ্য থাকবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য, ৭৮ বিলিয়ন ডলারের উত্পাদিত পণ্য, ৫২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি এবং সেবা খাতে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। সেই সঙ্গে চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এর আগেকার বর্ধিত শুল্কহারের মধ্যে ১২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানীকৃত সেলফোন, খেলনা ও ল্যাপটপের ওপর শুল্কহার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে আরোপিত ২৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার ২৫ শতাংশ শুল্কহার অব্যাহত রাখলেও শর্ত মেনে চলার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে এই শুল্কহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে চীনও বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালীন যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কহার বৃদ্ধি করেছিল সেটাও বেশির ভাগই অব্যাহত রাখতে পারবে। এদিক বিবেচনায় সম্পাদিত এই চুক্তিকে তাই একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা যায়। দুই দেশ চুক্তির শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করলে পরবর্তী সময়ে উভয় দেশের সম্মতিতে শুল্কহার পুনর্বিন্যাস নিয়ে তারা নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে।

এখানে যে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত পণ্য আমদানির শর্ত চীনের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা নিয়ে খোদ চীনের ভেতরই শঙ্কা রয়েছে এই মর্মে যে তারা এ ধরনের শর্ত কতটুকু পরিপালন করতে পারবে। উল্লেখ্য, চীন স্বাভাবিকভাবেই দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে উদ্বৃত্ত ধরে রাখছিল। সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে তারা যদি নতুন শর্তের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত পণ্য ও সেবা আমদানি করে, তাহলেও তাদের এই উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকবে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভের জায়গাটি হচ্ছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে অসমতা দূর করে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্যের নিরাপদ বাজার খুঁজে বের করে নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য কল্যাণ নিশ্চিত করা। এখানে দেখে নেওয়া যাক চীনের ক্ষেত্রে অতিরিক আমদানি কতটুকু যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হতে পারে। বলা হয়েছে, আগামী দুই বছর সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ৫২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। উল্লেখ্য, বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি মাসে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে আসছিল। এই নতুন মাত্রা নির্ধারণের ফলে এখন থেকে আগামী দুই বছর সময়ের মধ্যে তাদের এই আমদানি গড়ে ২৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। চীনের দিক থেকে এটিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করা হচ্ছে এই কারণে যে বর্তমানে চীনের আমদানিকারকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি এবং ক্রুড অয়েল আমদানির প্রবণতা কমে গেছে। তারা এটিকে এখন আর লাভজনক হিসেবে মনে করছে না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনে চীনের রিফাইনারিগুলোর সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়। কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩২ বিলিয়ন ডলারের আমদানির যে শর্ত চীনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এর অর্থ হচ্ছে এ বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট উত্পাদিত পণ্যের রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ চীনকে ক্রয় করতে হবে, যা আগামী বছর গিয়ে দাঁড়াবে ৩০ শতাংশে। এখানে উল্লেখ্য যে বিগত বছরগুলোতে চীনের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের চাহিদা ছিল। সে হিসেবে তারা যদি এই কৃষিপণ্য আমদানির দুই-তৃতীয়াংশ সয়াবিন আমদানি করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সয়াবিনের একক ক্রয়কারী দেশ হবে চীন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনে সয়াবিনের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। সোয়াইন ফ্লুর প্রভাবে দেশের অর্ধেকের বেশি শূকর মেরে ফেলার কারণে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা এত অধিক পরিমাণে সয়াবিন এখন আর তাদের প্রয়োজন নেই। আবার বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালীন তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আমদানির বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়, এটিও একটি সমস্যা। যদিও চীনের পক্ষ থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ হুয়ে বলেছেন, এটা কোনো সমস্যার কারণ হবে না; কিন্তু কিভাবে, সেটা স্পষ্ট নয়।  

তবে চীনের তরফ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য দ্বন্দ্ব কমিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে ফিরে আসার এক ধরনের তাগিদ দেখা গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালীন তাদের বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব চুরির যে অভিযোগ করা হচ্ছিল চীন এটিকে আমলে নিয়ে গত বছর কিছু আইনি সংস্কার সাধন করেছে। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক এজেন্সিগুলোকে প্রযুক্তি ট্রান্সফারে জোর না করতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং তা প্রতিপালনে ব্যর্থতার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিদেশি কম্পানিগুলোকে দেশীয় কম্পানিগুলোর মতো সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদানও নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সরকারি কাজের ক্ষেত্রে তারা দেশীয় কম্পানিগুলোর মতো একইভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এদিকে চীনের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের মেধাস্বত্বের যাওয়া-আসা জেনেরিক নামের ওষুধগুলোকে নিরাপত্তা দিতে সরকারিভাবে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কম্পানির পক্ষ থেকে আপত্তি উত্থাপিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। 

এই চুক্তির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, চীনকে মেনে চলতে বাধ্য করা হয়েছে যে সে তার মুদ্রা ইউয়ানকে অবমূল্যায়ন করবে না, অর্থাৎ বাণিজ্যযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক বাজারে তার রপ্তানিকে ত্বরান্বিত করতে সে নিজস্ব মুদ্রামান যে হ্রাস করেছিল তা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে। এরই মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে যে ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মূল্য বাড়ছে, যা তাদের দিক থেকে সংকট সমাধানের এক তাগিদ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সব কিছু ছাপিয়ে এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে চীন কি সত্যিকার অর্থে এই চুক্তিকে দীর্ঘ মেয়াদে টেনে নিয়ে যেতে চায়। যদি সে রকমটা চায় তাহলে সংগত কারণেই আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, সে আসলে কতটুকু সক্ষম তার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার বিচারে এটিকে মেনে চলতে। অনেকের কাছে এটাও মনে হচ্ছে যে আগামী মার্কিন নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পক্ষই একটি উইন উইন পর্যায়ে আসতে চেয়েছে। আপাতত সেটাই হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ২০২১ সালে আবারও নতুন পরিস্থিতি এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে দেশ দুটি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected] 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা