kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের রাজনীতি

ড. মো. সহিদুজ্জামান

১৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পান। মুক্তচিন্তার বিকাশ ও চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। যখন অস্থির ও অসুস্থ সমাজে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধাররা আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়াবেন, তখন তাঁরাই পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রায় আড়াই দশক ধরে উপাচার্য নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়ে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় রাজনীতি প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে। লাল, নীল, সোনালি, রুপালিসহ বিভিন্ন রং ধারণ করে জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করে চলছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষকদের এসব সংগঠন আদর্শ ও নীতির কথা বললেও তা কতটুকু ধারণ করে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

শিক্ষক সমিতির নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব না ফেললেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অফিস সময়ে কাজকর্ম ফেলে নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটারদের অফিস ও বাসায় প্রার্থীর একাধিকবার দেখা করা, ঘন ঘন মিটিং-মিছিল, সভা-সমাবেশ, এমনকি নির্বাচন-পরবর্তী শোভাযাত্রা, প্রদর্শনী ও রাজনৈতিক স্লোগানে মুখরিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—এমনি ব্যস্ত পরিবেশ নেহাতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে একটি রাজনৈতিক অঙ্গন তৈরি করেছে, তা নিশ্চিতই বলা যায়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভোটের যে রাজনীতি পরিলক্ষিত হয় তা নির্বাচনের সময় না গড়ালে বোঝা মুশকিল। সাধারণত শিক্ষকদের নির্বাচন হয় দলীয় প্যানেলে। প্যানেল ভোট বাড়াতে বিভিন্ন সরকারের সময় দলীয় সংগঠনগুলো তত্পর থাকে। প্রাধান্য পায় শিক্ষক নিয়োগের চেয়ে ভোটার নিয়োগ। যার যত প্যানেল ভোট বেশি তাদের প্রার্থীর জয়লাভ অনেকটা পূর্বনির্ধারিত বলে গণ্য হয়। তবে অরাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সাধারণ শিক্ষকদের সমর্থন লাভ এবং নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেক সময় প্রতিপক্ষের আশীর্বাদ হয়ে ওঠে।  এ নির্বাচন যেন এক ধরনের খেলা, যেখানে নানা হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত থাকেন প্রার্থী, প্যানেল বা দলগুলো। অবস্থা দেখে মনে হবে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্বাচন এবং যেকোনো মূল্যে জয় ছিনিয়ে আনার প্রয়াস থাকে অংশগ্রহণকারী দলীয় প্যানেলগুলোর। যা হোক ইনটেলেকচুয়াল এই কমিউনিটিতে প্রতিনিধি নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে তা কৌশল ও আচরণগত দিক থেকে জাতীয় নির্বাচন থেকে পার্থক্য করা কঠিন।

দেখা যায়, সরকারদলীয় প্যানেলের ভোট ব্যাংক বড় হওয়ায় অনেক সময় অযোগ্য প্রার্থীর নির্বাচনে জয়লাভের সুযোগ হয়। সুযোগ হয় নেতা হওয়ার, অতঃপর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের। রাজনৈতিক সরকারগুলো পাল্লা দিয়ে দলীয় ভোটার (শিক্ষক) নিয়োগ প্রদান করায় অদলীয় বা সাধারণ শিক্ষকদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, ফলে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন বা বাছাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্যানেল ভোট বেশি থাকায় একদলীয় শাসন বিরাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। জবাবদিহি বা প্রতিপক্ষ না থাকায় খেয়ালখুশিমতো নিজে আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকছেন সরকারদলীয় শিক্ষক নেতারা। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বাস্তবায়নে এবং পেশার মানোন্নয়নে ভাটার সৃষ্টি হচ্ছে।

অন্যদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও অবাধ হয় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেক সময় বাধাগ্রস্ত করা হয়। ভোটারদের বিশেষ করে জুনিয়র সহকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদান ও আঞ্চলিকতার প্রভাব সঠিক নেতৃত্ব গড়তে বাধার সৃষ্টি করে।

সরকারদলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত নেতারা নিজেদের সম্ভাব্য উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে তত্পর থাকেন। এমনকি উপাচার্যকে সরিয়ে নিজেদের রাস্তা পরিষ্কার করার ফন্দি-ফিকিরেও লিপ্ত হন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষ সহকর্মীকে অপদস্থ, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত ও কোণঠাসা করে রাখা হয়, যা বিভাগীয় শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। ভোটের রাজনীতিতে একাডেমিক সম্পর্কের চেয়ে দলীয় সম্পর্ক প্রাধান্য পায়, যা শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শিক্ষক-সহকর্মী ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিক্ষকদের রাজনৈতিক বিভাজন ও কোন্দলের প্রভাব বিশেষ করে মাস্টার্স ও পিএইচডির ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পড়তে দেখা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন, মিটিং-মিছিল, মানববন্ধন, ঘেরাও বা ধর্মঘটের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়। এ ছাড়া অতি উত্সাহী কিছু রাজনৈতিক শিক্ষকের অতিরঞ্জিত অপরাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।  এসবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ইমেজ সংকটে পড়লে এর দায়ভার আসে সরকারের ওপর।

শিক্ষকদের কাজ ছাত্র-শিক্ষক, শিক্ষক-সহকর্মী সম্পর্ক তৈরি করা। আমাদের চরম ঘাটতির জায়গা এটিই। একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিবিদের মতো আচরণ করেন, নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন, তখন শিক্ষক হিসেবে তাঁর যেমন মর্যাদাটুকু থাকে না, তেমনি ছাত্র-শিক্ষক ও সহকর্মী সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় পারস্পরিক আস্থার জায়গাটুকু, যা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী দেশের চারটি পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পারেন না। জানামতে, শিক্ষক সমিতি ছাড়া এসব রাজনৈতিক সংগঠনের বৈধতা বা অনুমতি নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। চাকরির আচরণবিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শিক্ষকদের দলীয় কর্মকাণ্ড আইনের পরিপন্থী কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতিতে বিভাজন না হয়ে ইনডিভিজুয়াল দাঁড়াবেন অর্থাত্ শিক্ষকদের দলীয় প্যানেলবিহীন নির্বাচন করতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব গড়তে এর কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে একদিনে একই জায়গায় প্যানেল পরিচিতি এবং ই-মেইল বা চেম্বারে বায়োডাটা, জীবনবৃত্তান্ত পৌঁছানোর মধ্যে প্রচারণা সীমিত রাখা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক রাজনীতি থাকলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্ভব নয়। আবার যোগ্য শিক্ষক নেতৃত্ব বেরিয়ে না এলে সঠিক ছাত্র নেতৃত্ব তৈরিও সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারদলীয় রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি উপাচার্য। তিনি রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। এই জায়গাটিতে পরিবর্তন না এলে মূলত কোনো কার্যকর ফলাফল আসবে না। তাই টেস্ট কেস হিসেবে দু-চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে চুক্তিভিত্তিক উপাচার্য নিয়োগ দিলে শিক্ষকরা রাজনীতিতে আগ্রহ হারাতে পারেন।

রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। তবে পেশাগত দায়িত্ব আর রাজনীতি কোনোভাবেই এক করা যাবে না। যে রাজনীতির কারণে আমরা আমাদের শিক্ষক ও সহকর্মীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভোট দিতে পারব না, দূরত্ব সৃষ্টি হবে সে রাজনীতি আমরা চাই না। এই সঙ্গে একই ক্যাম্পাসে চাকরি করব, একজন প্রভু হবে, আরেকজন দাস হবে—এই রাজনীতি কাম্য হতে পারে না। অতএব যে রাজনীতি আমাদের প্রভু সৃষ্টি করে ও দাস বানায় সে রাজনীতি আমরা করব না। সবাই একসঙ্গে বসে এই অপরাজনীতির ধারা রিভিউ করতে হবে। সামনে আমরা কি রকম বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে চাই তা নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা