kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

মেরুকরণের রাজনীতিতে লাভ কার

জয়ন্ত ঘোষাল

১৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মেরুকরণের রাজনীতিতে লাভ কার

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতা গেলেন বেশ কিছুদিন পর। এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে প্রথম থেকেই আছে বেশ উত্তেজনা। রাজপথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সম্ভবত একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, যিনি নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে এতখানি আক্রমণাত্মক। তিনি নিজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছেন—‘ক্যা ক্যা ছি ছি’। ক্যা মানে CAA, পুরো কথাটি হলো সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট। এই আইনের বিরোধিতায় মমতা নিজে গানও লিখেছেন, সুর দিয়েছেন; গানটি গেয়েছেন গায়ক ও মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। গোটা দেশে অন্য সব রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবাংলাই হলো এমন এক রাজ্য, যেখানে বিজেপিও এই আইনের বিষয়টি নিয়ে আক্রমণাত্মক। আবার মমতাও গোটা দেশে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনে প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কলকাতায় এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একান্ত বৈঠকও হওয়ার কথা। মমতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি অনুষ্ঠানেও যাচ্ছেন মিলেনিয়াম পার্ক। ১৩ জানুয়ারি দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধীর ডাকা বিরোধী বৈঠকেও মমতা হাজির হচ্ছেন না। তিনি প্রথমে উৎসাহ প্রকাশ করেন। দিল্লি সফর চূড়ান্তও করে ফেলেন। পরে তিনি দিল্লি সফরও বাতিল করেন। রাজ্যে কংগ্রেস ও সিপিএম নেতারা বলতে শুরু করেছেন, মমতা নাকি বিজেপিকে খুশি করার জন্য এ কাজ করেছেন। প্রচার ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যে বিজেপি এবং মমতা বোঝাপড়া হচ্ছে। নিন্দুকেরা তো এমন কথাও বলছেন, সিবিআই তদন্তের ভয়ে মমতা এহেন বোঝাপড়া করছেন।

আমি নিজে কিন্তু এসব ভাসমান গুজবে আস্থা রাখি না। যে বিজেপির কাণ্ডারি অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে ছয় বছর ধরে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাংলা শেখার চেষ্টা করছেন। গত লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসনে জেতার পর বিজেপি আরো উৎসাহিত। আশা জেগেছে বিজেপি চাইলে রাজ্যে ক্ষমতাসীন হতে পারে। কারণ বাঙালি ভদ্রলোকেরা উত্তর প্রদেশে ভোটারের মতো উগ্র হিন্দু নয়; কিন্তু তারা গোপন হিন্দু। মানে ভোটের সময় বাইরে ইন্টেলেকচ্যুয়ালিজম দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা সব বিজেপিকেই ভোট দেবেন। এমন কথাও অনেকে বলছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার জন্যই মূলত নাগরিকত্ব বিলটি এনেছে। সে যা হোক, যে দল হিন্দি বলয়ের দল থেকে সেই কবে থেকে প্যান ইন্ডিয়ান দল হতে চাইছে, তারা যে মমতার সঙ্গে বোঝাপড়া করবেন সেটা কী জন্য? মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী রাখতে চাইবেন কেন? তাতে বিজেপির লাভ কোথায়? বরং বিজেপি যে বন্ধু বন্ধু একটা ভাব দেখাতে চাইছে, তাতে যদি মমতা মজে যান এবং আবেগতাড়িত হন, আর ২০২১ সালে মে মাসের বিধানসভা ভোটের আগে আবার বিজেপি হঠাৎই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তাতে কি মমতার লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি নয়? হতে পারে, এটা বিজেপির 'One Step forward' আর 'two steps backward'  রণকৌশল? তাই আমি, আপনি যখন বিজেপির এই কৌশলে সন্দেহ করছি, তখন মমতা সন্দেহ করবেন না, তিনি চোখ বুজে মোদি-অমিত শাহকে বিশ্বাস করবেন এমনটা ভাবারই বা কী কারণ থাকতে পারে?

মোদি এবং মমতার রাজনীতির এই ডাইনামিকসটা কিন্তু সব সময়ই এ ধরনের উত্থান-পতনের প্রহলিকা। মমতাও কিন্তু লোকসভা ভোটে বিজেপি যে এতগুলো আসন পেয়ে যাবে, সেটা কখনো ভাবতে পারেনি। তবু পশ্চিমবঙ্গে এতগুলো আসন পাওয়ার পর যে বিজেপির খিদে আরো বাড়বে, সেটা মমতা বিলক্ষণ জানেন। তাই তিনিই বা মোদি-অমিত শাহর সঙ্গে রাজনৈতিক আপস করতে যাবেন কেন?

কিন্তু এবার কলকাতা সফরে মোদি ও মমতা দুই পক্ষই কিন্তু তাঁদের কৌশল বদলেছেন। প্রথমত মমতা ২০১৪ সালে ভোটের আগে এবং পরেও যেভাবে মোদির নাম করে আক্রমণ শানিয়েছেন। কেন্দ্র-রাজ্য থেকে তীব্র থেকে তীব্রতর সংঘাতের পথ নিয়ে এসেছিলেন, এখন সেই কৌশল বদলে ফেলেছেন। এখন মমতা বলছেন, তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত যা-ই হোক না কেন, তিনি ২০১৯ সালে মোদি ফের বিপুল ভোটে জিতে আসার পর উন্নয়নের প্রশ্নে বয়কটের রাজনীতির পথ ত্যাগ করে রাজ্যের স্বার্থে বৈঠক করছেন। এমনকি নাগরিকত্ব বিল নিয়ে শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, অমিত শাহর সঙ্গেও দেখা করছেন।

রাজনীতিতেও সম্পর্ক নানা ধরনের হতে পারে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মতোই। একটা সম্পর্ক হলো প্রগাঢ় ভালোবাসার। আরেকটা সম্পর্ক হলো ‘টু টু ম্যায় ম্যায়’। আবার আরেকটা তৃতীয় অপশন থাকে, যেখানে সম্পর্কটা কূটতাপূর্ণ না হলেও প্রবল প্রেমেরও নয়। মার্ক্সীয় পরিভাষা নকল করে বলা যায়, non antagonistic normal neutral relation, সেখানে সংঘাত হলেও তা শত্রুতাপূর্ণ নয়। মার্ক্সবাদে সমাজতন্ত্রের শ্রেণিসংগ্রাম বোঝাতে গিয়ে antagonism-এর পাশাপাশি বলা হয়  non antagonistic class struggle.

তাই মমতা এখন একটা ন্যূনতম শিষ্টাচার রক্ষা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসের একটা সুষ্ঠু সমন্বয় বা কমিউনিকেশন আছে তাতে কেন্দ্র-রাজ্য ফেডারেল বোঝাপড়াও থাকছে। একটা লক্ষণরেখা রক্ষা করাও হচ্ছে, আবার ভোটের সময় লড়াইও হচ্ছে। শারদ পাওয়ার থেকে নবীন পট্টনায়েকে। আবার কেজরিওয়াল থেকে কমলনাথ অনেকেই এই সম্পর্ক এখন রক্ষা করেন। অতীতে বহু বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও এই কৌশল রক্ষা করেছেন কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে। ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাজীব গান্ধী, এমনকি নরসিমা রাওয়ের সঙ্গেও। অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জ্যোতি বসু প্রথমে বলেছিলেন, অসভ্য বর্বরদের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আমি দেখা করব না প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। পরে বুদ্ধদেব ভটাচার্য এই কৌশলটা সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন। বুদ্ধবাবু তো উপপ্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানির সঙ্গেও গভীর বন্ধুত্ব রক্ষা করেন। আমার এই মডেলটা কিন্তু বেশ ভালো লাগে। নেহরুর সময় তো এমনটাই হতো। ভোটের জন্য যা হোক, ব্যক্তিজীবন একই পেশায়—এ কলহ মারদাঙ্গা হিংসা কেন?

এখন পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন যা-ই হোক, কেন্দ্র পিছু হটা তো ভিন্ন কথা, আইন কার্যকরও করে দিচ্ছে। আবার এটাও সত্য যে এখন বাংলাদেশে কোনো অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। বাংলাদেশের মন্ত্রীরা দিল্লির সঙ্গে নিঃশব্দে বৈঠক করছেন, কিন্তু তাঁদেরও মোদি জানিয়ে দিয়েছেন, একজন মুসলিমকেও ঢাকায় বলপূর্বক ফেরত পাঠান হচ্ছে না। তাই বিরোধীদের প্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না। চিল কান কেটে নিয়ে চলে গেছে বলে প্রচার হচ্ছে; কিন্তু ভাই, আগে নিজের কানে হাত দিয়ে তো দেখুন আপনার কানটা আছে, না নেই! মিথ্যা বিরোধী প্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না।

বাংলাদেশের সদ্যঃপ্রয়াত হাইকমিশনার দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন মোয়াজ্জেম আলী। তিনিও যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান দিল্লি ছাড়ার সময়, তখনো প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক অটুট থাকবে। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তো মোদি মার্চ মাসে ঢাকায়ও যাওয়ার কথা। মোদি তাঁকে বলেছেন বিজেপির দলীয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।

তখন হাইকমিশনার সাহেব হাসতে হাসতেই নাকি তাঁকে প্রশ্ন করেন, এটা যদি বাস্তবায়িত না হয়, শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই হয়, তাহলে এত ঘটা করে এই আইন কার্যকর করার দরকার কী ছিল।

আসলে এ হলো মেরুকরণের রাজনীতি। আপাতত দুই পক্ষই ভাবছে ভোট তাদের লাভ হবে। বিজেপি মনে করছে সংখ্যালঘু আর বামপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ উদারবাদীরা নাগরিকত্ব বিলের যত বিরোধিতা করবে, বিজেপির ততই লাভ; আর মমতা মনে করছেন শুধু সংখ্যালঘু বাঙালি (৩০ শতাংশ) উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালিও তাঁর আন্দোলনে শামিল। ১৯৮৪ সালে তিনি প্রথম ভোটে জেতেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে যাদবপুরে পরাস্ত করে। তারপর মমতা উদ্বাস্তুদের নিয়ে আন্দোলন করেন। এখন তো তাঁরা বাংলায় নাগরিকত্ব পাবেন—এমন হিন্দু নাগরিক এবার কত হবে? সেই সংখ্যাটা ৫০ থেকে ৬০ লাখ হবে বলছে আরএসএস, মমতা বলছেন, অসম্ভব। এসব তর্কবিতর্কে আপাতত মমতার শাসন নয়, সিনডি সিন্ডিকেটে থেকে সারদা, আপাতত এসবের চেয়েও বড় ইস্যু হয়ে গেছে ‘ক্যা’। এতে লাভ কার, সেটাই প্রশ্ন।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা