kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

এনআরসি ও সিএএ ইস্যুতে ব্যাকফুটে বিজেপি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এনআরসি ও সিএএ ইস্যুতে ব্যাকফুটে বিজেপি

এনআরসি নিয়ে মোদি না অমিত শাহ, কে ঠিক কথা বলছেন, তা নিয়ে ধন্দ দেখা দিয়েছে খোদ বিজেপি শিবিরে। সাধারণ মানুষ বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছে দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগি করা নিয়ে যে রাজনীতি বিজেপি শুরু করেছে, তাতে তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই বিভাজন ও বি-মুসলিমায়নের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন নরেন্দ্র মোদিকে ঢোক গিলতে হচ্ছে।

গত ২৪ নভেম্বর ঝাড়খণ্ডের জনসভায় অমিত শাহ বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, ‘এনআরসি হচ্ছে, হচ্ছে হচ্ছে। কেউ একে রুখতে পারবে না।’ সংসদে দাঁড়িয়েও এনআরসির সমর্থনে ভাষণ দেন শাহ। অন্যদিকে রামলীলা ময়দানের সভায় মোদি বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে কোথাও কোনো কথা হয়নি। কেউ দেখাতে পারবে না এই নিয়ে কোনো স্তরে কোনো আলোচনা হয়েছে।’ প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কে ঠিক, মোদি না প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ, তাঁর একান্ত আপনজন অমিত ভাই শাহ?

জাতীয় নাগরিকপঞ্জি যে হবেই, তা সংসদের ভাষণে অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, সংসদের ভাষণে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে দিয়েও তাঁরা এই কথা বলিয়ে নিয়েছিলেন। মোদি বলেছেন, এ দেশে নাকি কোনো ডিটেনশন ক্যাম্প নেই। কেউ একটিও ডিটেনশন ক্যাম্প দেখাতে পারবে না। মোদির ভাষণ শুনে মুচকি হেসেছেন বিজেপির আসামের নেতারা। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা বিস্মিতও হয়েছেন। আসামে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হয়েছে অন্তত সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জায়গা নিয়ে। সেখানে হাজারখানেক মানুষের ঠাঁই হয়েছে। অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। কেউ বা আত্মহত্যাও করেছে। আর মোদি বলেন কিনা কেউ মারা যায়নি। কোনো ডিটেনশন ক্যাম্প নেই?

এনআরসি ও সিএএ নিয়ে এখন গোটা দেশে আগুন জ্বলছে। আপাতত বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার তুমুল জনবিক্ষোভের মুখে পড়ে ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দাবি করেন, “যিনি ভারতের মাটির মুসলমান, যাঁর পূর্বপুরুষ ‘মা ভারতীর’ সন্তান, নাগরিকত্ব আইন এবং এনআরসি নিয়ে তাঁর কোনো লেনদেন নেই।” রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই আশ্বাসবাণীর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অন্য বার্তা। মা ভারতীর সন্তান হলে চিন্তার কারণ নেই ঠিকই; কিন্তু নিজেকে মা ভারতীর সন্তান হিসেবে প্রমাণ করার দায় কিন্তু মুসলিমদের থাকছেই। বিজেপির যুক্তি, ‘সে তো হিন্দুদেরও প্রমাণ দিতে হবে। শরণার্থী এবং অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে ফারাকটি প্রধানমন্ত্রী আজ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন।’

রামলীলা ময়দানের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বামপন্থীদের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, বামপন্থীরা নাকি একসময় ভোটের স্বার্থে বাঙালি শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে সরব হয়েছিল। তিনি এ প্রসঙ্গে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাতের লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। মোদির বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে সিপিআই (এম)-এর পলিটব্যুরো নেতা প্রকাশ কারাত বলেন, কখনো সিপিআই (এম) ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেনি। একেবারে মিথ্যা বলছেন নরেন্দ্র মোদি।

বস্তুত সিএএর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভ গড়ে উঠার পরই বিজেপি নেতারা মুখে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার করছেন যে সিপিআই (এম) এর আগে বাঙালি সংখ্যালঘু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বললেও এখন সেই বাঙালি শরণার্থীদেরই নাগরিকত্ব দেওয়ার আইনের বিরোধিতা করছে। এর আগেই সিপিআই (এম) পলিটব্যুরো থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। বামপন্থীরাই এ দেশে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীদের জমির অধিকার, বাসস্থানের অধিকার সুরক্ষার জন্য বামপন্থীদের সংগ্রাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বামফ্রন্ট সরকার সেই অধিকারকে আইনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০১২ সালের এপ্রিলে সিপিআই (এম)-এর বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসে বাঙালি শরণার্থী বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। সেই রেজল্যুশনের ভিত্তিতেই প্রকাশ কারাত প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের কথা মাথায় রেখেই আসাম চুক্তি করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, সংসদেও বামপন্থীরা সিএএর বিরুদ্ধে তিনটি সংশোধনী জমা দেয়। এতে ধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা