kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও নতুন বছরের ভাবনা

এম হাফিজউদ্দিন খান

১২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও নতুন বছরের ভাবনা

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। নির্বাচনী আমেজ এবং মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জোর প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। এই নির্বাচন আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। সিটি নির্বাচনে কে জিতবে আর কে হারবে, তা তো আগে থেকে বলা যায় না। তবে আমি যেটা বিবেচনা করছি সেটা হচ্ছে—নতুন বছরের রাজনীতি ও ঢাকার অনেক কিছুর কী হবে এবং কেমন হতে পারে—বিষয়টা এ নির্বাচনের ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে। নতুন বছরের রাজনীতি এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অন্তত আমার নিজের ধারণা।

আমরা চাই সুষ্ঠু, সুন্দর ও অবাধ নির্বাচন হোক। মানুষ যেন তার মত প্রকাশ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে তার রায়টা দিতে পারে। গণতন্ত্র যেন ফিরে আসে। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বা সুধীসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এটাই আমার চাওয়া।

এবারের নির্বাচনে একটা বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে বা এর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সেটা হচ্ছে নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে। এখানে আমার একটা কথা বলার আছে—ইভিএম বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে যে ভোট গ্রহণ করা হবে, এতে ভোট কেমন হয়? এর ব্যবহারের সঠিক নিয়ম বা অনিয়ম এবং কারচুপির যে কথা শোনা যায়, তা পরের কথা। কিন্তু প্রথমে যে বিষয়টা নিয়ে ভাবার দরকার ছিল, ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পর্কে মানুষকে ভালোভাবে অবহিত করা। এ ধরনের একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে কোনো একটা বিষয় নিয়ে বা যন্ত্র নিয়ে মানুষের আপত্তি তোলার আগে সেটা মিটিয়ে ফেলা যেত। সেটা আলোচনার মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে সম্ভব ছিল, তা কিন্তু করা হয়নি। সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে। বিএনপি যেহেতু একটা বড় রাজনৈতিক দল, কাজেই তাদের মতকে আমলে নেওয়া দরকার ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আমলে নেওয়া হয়নি। এখানে বিএনপির আপত্তি ও সমালোচনাকে গ্রাহ্য করা হয়নি। কাজেই ইভিএম নিয়ে সন্দেহ ও দ্বন্দ্বের অবকাশ থেকে গেল।

আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, ভোটে ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কোনো অসুবিধা দেখি না। কিন্তু যেটা জরুরি ছিল, সেটা হচ্ছে—ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে ইভিএমের ভালোমন্দ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে মানুষকে জানার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার। রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকার মাধ্যমে যেমন এটা মানুষকে জানানো যেত, তেমনি দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতি করে, আলোচনা ও প্রদর্শনী করে ইভিএম সম্পর্কে মানুষকে জানানো যেত। এতে মানুষ এই যন্ত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারত। আবার কোনো ধরনের সন্দেহ ও সমালোচনা কম হতো; কিন্তু তা করা হয়নি। এ বিষয়ে সেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি। কাজেই ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টা মানুষ ভালো চোখে দেখছে বলে মনে হয় না। নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে বড় ও ভালো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এতে বরং তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকে গেছে। বিষয়টা আমার নিজের কাছেও ভালো ঠেকেনি।

এবারের ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের একটা বিষয় আমার খুবই ভালো লেগেছে। সেটা হচ্ছে, প্রত্যেক প্রার্থীই উচ্চশিক্ষিত। সেটা আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলি বা বিএনপির প্রার্থী। আগে কিন্তু এমনটা কম দেখা গেছে বা দেখা যায়নি। আমাদের জাতীয় নির্বাচনেও উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী একেবারে হাতে গুনে বলে দেওয়া যেত। কিন্তু ঢাকা সিটির নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত দিকটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এটা পরবর্তী রাজনীতি বা নির্বাচনের জন্য একটা ইতিবাচক দিক হিসেবে তোলা থাকবে বলে আমার মনে হয়েছে। বিষয়টা খুব সুন্দর একটা দিক; সুন্দর ও সম্ভাবনাময়। এতে রাজনীতির মাঠে নতুন যাঁরা আসবেন তাঁরা উৎসাহিত হবেন। সার্বিকভাবেই এটা দেশের রাজনীতিতে একটা প্রভাব রাখবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে হেরে গেলেও কোনো ব্যাপার নয়। এতে তাঁদের রাজনীতি বা সরকারি দল কোনোভাবেই প্রভাবিত হবে না। কিন্তু বিষয়টা অতটা সহজ বলে আমার মনে হয়নি। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ওপর নতুন বছরে রাজনীতি এবং সার্বিকভাবে সমগ্র দেশের রাজনীতিতে একটা প্রভাব ফেলবে—আমি অন্তত তেমনটাই মনে করি। দেখা যাক কী হয়। আগে থেকেই এ বিষয়ে কিছু বলা শক্ত। ঢাকাবাসী কাকে আগামী দিনে মেয়র হিসেবে দেখতে চায়, যদি ফেয়ার ইলেকশন হয়, তাহলে সেই জিনিসটা আমরা দেখতে পাব। এতে সরকারেরও জনপ্রিয়তার বিষয়টা অনেকটা বোঝা যাবে। কাজেই সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে—নির্বাচনে কী হয়।

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেমন দেখতে চাই—এ বিষয়ে একটা অপ্রিয় সত্যি কথা বলতে হয়। বর্তমানে যে নির্বাচন কমিশন আছে, সেটার ওপর আমার তেমন আস্থা নেই। কাজেই সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা আমরা করতে পারি; কিন্তু নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। কারণ তারা এ পর্যন্ত যে কয়টা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, সেই অর্থে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারেনি। সে কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের যে দাবি ও চাওয়া আমাদের, সেটা কতটা সুষ্ঠুভাবে হতে পারবে, বলতে পারি না। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা যেহেতু ভালো নয়, হাওয়া কোন দিকে মুখ ফেরাবে বোঝা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে এবার নতুন করে আগাম বিতর্ক তৈরি হয়েছে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে। ফলে আগাম কোনো আশা করা যাচ্ছে না—কী হয় নির্বাচনে। কিন্তু আমাদের চাওয়া, নির্বাচনে লড়াই করে যিনিই জয়ী হোন, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নির্বাচনটা যেন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়। মানুষ যেন অবাধে ভোট দিতে পারে—এটাই আমাদের চাওয়া।

বর্তমানে যেমন রাজনীতি দেখতে পাচ্ছি, তাতে সত্যি বলতে গেলে রাজনীতি তো নেই। আবার আছেও। সরকারি দল নির্বিঘ্নে রাজনীতি করছে। এখানে কোনো বিরোধী দল নেই। আন্দোলন নেই। আন্দোলন দমিয়ে বিরোধী দলকে কাবু করারও কিছু নেই। বিরোধী দল এমনিতেই কাবু ও কোণঠাসা হয়ে আছে। এখন রাজনৈতিক দল মানেই এক আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয়ত সরকারি দলও আওয়ামী লীগ। তারাই রাজনীতি করছে এবং তারাই দেশ পরিচালনা করছে। কোনো সমস্যা ও বাধা ছাড়াই তারা দেশ পরিচালনা করছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও নির্বিঘ্ন চলছে সব কিছু। কাজেই রাজনীতি কেমন চলছে দেশে, তা নিয়ে কথা বলারও কিছু আছে বলে মনে হয় না।

আর বিএনপির রাজনীতি তো নেই। তারা রাজনীতি ও গণতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছে বটে, কিন্তু সেই অর্থে তারা রাজনীতির ভেতরেই যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। উঠে দাঁড়াতে পারছে না। বিএনপির রাজনীতি এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির নীরব আন্দোলন এবং গণতন্ত্র উদ্ধার—এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এর বাইরে তারা যেতে পারছে না। তাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তারা কোণঠাসা হয়ে আছে এই দুটি বিষয়ে ঝুলে থেকে।

অর্থনীতির নানা দিক আছে। কিন্তু সরকার যেমন জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলাপ ও আলোচনায় খুশি আছে, অন্য কোনো অর্থনৈতিক দিক নিয়ে সেভাবে কথা নেই। সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েই যাচ্ছে। দু-একটা পণ্যের দাম নিয়ে কিংবদন্তি তৈরি হয়ে যাচ্ছে—এসবে খুব একটা গুরুত্বও নেই। সাধারণ মানুষ কিভাবে বাঁচবে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক ভাবনা ও চেষ্টা নেই। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে আটকে আছে অর্থনৈতিক উন্নতি ও ভালো খবরগুলো।

নতুন বছরে এটাই প্রথম নির্বাচন এবং এই নির্বাচন নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একদিকে দেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্র বাঁক বদল করতে পারে। আমরা সব সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হলে সেই গণতন্ত্র নতুন পথে হাঁটতে পারে। নতুন বছরে আমাদের চাওয়াও সেটাই—নতুন বছর হোক গণতন্ত্র উদ্ধার ও বিকাশের বছর। ফেয়ার ইলেকশন হোক। বিএনপি তাদের ভুল ও অব্যবস্থাপনা সংশোধন করে নতুনভাবে উঠে দাঁড়াক। দেশের মানুষ ভালো থাকুক। দেশ এগিয়ে যাক উন্নয়ন, গণতন্ত্র, দ্রব্যমূল্যের সহনীয় মাত্রা নিয়ে এবং দেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করুক।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা