kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

বিজয়ের গৌরব সংরক্ষণ জরুরি

গোলাম কবির

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিজয়ের গৌরব সংরক্ষণ জরুরি

জয় বা বিজয় শব্দের আভিধানিক অর্থের তেমন পার্থক্য নেই। তবে বিজয় শব্দটি উচ্চারিত হলে বোধের গভীরে একটা সূক্ষ্ম আবেগের আবেদন সৃষ্টি হয়। সেই বিজয়ের আবেগ জাতিকে মহিমান্বিত প্রেরণার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে আমরা জয় না বলে বিজয় বলতে অধিকতর শ্লাঘাবোধ করি। এ বিজয় সাধারণ কোনো দিনক্ষণ নয়। একটি জাতির অভ্যুদয়ের প্রভাব দ্যুতিতে আলোকোজ্জ্বল। তবে এ বিজয়কে শুধু একটি অবরুদ্ধ শোষিত ভূখণ্ডের অধিকার লাভের নয়; নয় অর্থনৈতিক মুক্তির প্রাণহীন সনদ। এ বিজয় মানবমুক্তির দিগন্ত প্রসারিত প্রশান্তির সুবাতাস।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের প্রিয় জন্মভূমির ভাঙাগড়ার নানা অভিজ্ঞতা কখনো গঠিত করে, আবার কোনো কোনো সময় বিমূঢ় করে ফেলে। তবু দিন-রাতের পালা বন্ধ হয়নি। আমরা অদৃষ্টে বিশ্বাসী। আমরা জাতির ঊর্ধ্বগামিতা এবং অধঃপাতকে বিধিলিপি বলে মেনে নিয়েছি। নিজেদের অপকর্মকে আমলে আনি না। তাই তো আমাদের প্রাজ্ঞ মুরব্বিরা একটি প্রবাদ উচ্চারণ করতেন, ‘হাতে ধরে পাপ করে কপালের দোষ!’

বলছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সূচনার কথা। কোনো জাতি অনায়াস স্বাধীনতা পেয়ে গেছে তার ইতিহাস রূপকথায়ও নেই। এর জন্য ‘দারুণ মূল্য’ দিতে হয়। আমরাও দিয়েছি। তবে এই ‘আমরা’ নিয়ে বিতর্ক কম নেই। সে বিতর্কে অবতীর্ণ না হওয়াই শ্রেয়। খোলা চোখে যা দেখা গেছে, তা-ই রোমন্থন করা যাক।

সত্তরের ১২ নভেম্বরের প্রাকৃতিক প্রলয়ের পর বাঙালির ভাগ্য নির্ধারণের ঐতিহাসিক নির্বাচন হলো। সুখের আশায় সর্বাত্মক সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায় দিল জনগণ। কী বিপুল উন্মাদনা নিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য গণমানুষের প্রতীক্ষা! পাকিস্তানি হঠকারিতায় আপাত স্বপ্নভঙ্গ হলেও সংকল্প ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠতে সময় বেশি লাগল না।

একাত্তরের ৭ই মার্চের আহ্বানে মানুষ দেশের সর্বত্র বন্ধনমুক্তির শপথ নেওয়া শুরু করল। জানে না কী কঠিন পণ তাদের। শপথের আগুন জ্বলল ঢাকায়, তা ছড়িয়ে গেল সবখানে। ২৫শের কালরাতে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের হত্যাযজ্ঞ কিছু সময়ের জন্য আশাবাদী মানুষকে বিমূঢ় করলেও সংবিৎ ফিরে পেতে সময় লাগেনি।

পাকিস্তানিরা ভেবেছিল, মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে ঢাকা ও অন্যত্র হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সব কিছু ঠাণ্ডা করে ফেলবে। পারেনি। পাকিস্তানি হানাদারদের সশস্ত্র দখলে ঢাকা দৃশ্যত সচল বলে মনে হলেও ‘দানবের সাথে’, ‘সংগ্রামের তরে’, ‘ঘরে ঘরে’ প্রস্তুত হতে থাকা তরুণরা সময়মতোই শত্রু বিতাড়নের কৌশল রপ্ত করে ফেলল। ভেতরে ভেতরে চঞ্চল ঢাকাকে অচঞ্চল ভেবে পাকিস্তানি জান্তা একাত্তরের জুনের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজে যোগ দেওয়ার ফরমান জারি করল। তখন নোয়াখালীতে অবস্থানকালে দেখেছি, প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা কাজে যোগ দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গ্রামগঞ্জের বেশির ভাগ তরুণ দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য ভবিষ্যৎ অজানা জেনেও দেশের দুর্গম এলাকার এবং বেশির ভাগই ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে কখনো গেরিলা পদ্ধতিতে, কখনো সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দেশের কিছু পাকিস্তানিপ্রেমী ছাড়া সব শ্রেণির মানুষ আন্তরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। ৯ মাসের মাথায় যৌথবাহিনীর মরণজয়ী আক্রমণে দুর্ধর্ষ বলে কথিত পাকিস্তানি বাহিনী ভীতবিহ্বল হয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। দিনটি ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। সেই থেকে দিনটি বিজয় দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

আবেগ আর উদ্দীপনায় অনেকে আপনজন ঘরবাড়ি হারিয়েও তখন ত্যাগের বিনিময়ের চিন্তা করেনি। দেশ শত্রুমুক্ত করার জন্য কিছু ব্যক্তিক্রম ছাড়া, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা শ্লাঘা অনুভব করতেন।

বিজয় দিবসের পর একাত্তরের পুরো ডিসেম্বর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, কলকারখানা পুরোপুরি চালু হয়নি। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি দেখা গেল। নিষ্ঠ পশ্চিমমুখীরা রাতারাতি পূর্বমুখী বনে গেল। ফলে তারাই বড় বড় চেয়ারে অধিষ্ঠিত হলেন। ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধারা অপাঙেক্তয় রয়ে গেলেন। কে না জানে, বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল জনগণ। তাঁরা বুঝতেন না দেশমাতৃকার মুক্তির বিনিময়ের ত্যাগে কোন কৌশলে মগডালে স্থান করে নেওয়া যায়।

পাকিস্তানি প্রভুবন্দনাকারীরা লেফাফাদুরস্ত হয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে ফেলে, পাকিস্তানি দাসত্বের অভিজ্ঞতা দিয়ে অগ্রবর্তী হয়ে, দুর্দিনে একছাতার তলে এসে সুদিনে বিভাজন তৈরি করল। দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হলো। বঙ্গবন্ধু মানবমুক্তির উচ্চাশা সামনে নিয়ে নতুন বিপ্লবের আহ্বান জানালেন। তা কার্যকর হওয়ার আগেই লেফাফাধারী আর দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তি তাঁকে দৃশ্যপট থেকে পাশবিক নির্মমতায় সরিয়ে দিল। নবীন বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানি খপ্পরে পড়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দুর্বল হতে লাগল। শুধু তা-ই নয়, বাঙালির কষ্টার্জিত বেশির ভাগ সম্পদ স্বাধীনতাবিরোধীরা করায়ত্ত করে ফেলল। নিঃস্বার্থ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারীরা অসহায় হয়ে পড়ল। সেই দুর্দিনে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নানা উত্থান-পতনের পথ ধরে বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলো। মাঝের চারদলীয় দুঃস্বপ্নের সময় বাদে মুক্তির পতাকাবাহী দল ক্ষমতায় আছে। তবে সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধারা হারিয়ে যেতে বসেছে; যারা ত্যাগের বিনিময়ে পারিতোষিক চাননি। প্রথম থেকেই দেখা গেছে ভুয়ারা শূন্যস্থান দখলের কৌশল উদ্ভাবন করেছে। তারপর ঘোর স্বাধীনতাবিরোধী আর ময়ূরপুচ্ছ ধারণকারীরা বড় গলায় বঙ্গবন্ধুর নামের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় ভাগ নেওয়া শুরু করেছে। দেখা যাচ্ছে নানা ঘাটের জল খেয়ে, ক্ষমতায় আসীন হয়ে কোমর বেঁধে লুটপাটের উৎসবে মেতে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণকারীরা পেছনের কাতারে ম্রিয়মাণ। এই যে দেশব্যাপী লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া তা বর্গীদের হার মানিয়েছে। তাদের বেশির ভাগ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বহন করে না। লুটপাটের প্রয়োজন যেটুকু ‘মর্সিয়া’ করা দরকার তার বেশি নয়। জোটে এসে জুটে যাওয়া অনেকে সাহিত্যের মায়ের মতো কেঁদে বুক ভাসিয়ে নেতা সেজে লুণ্ঠকদের অভয়াশ্রমে পরিণত। বঙ্গবন্ধু কিংবা তাঁর দলের আদর্শের প্রতি লোক-দেখানো দরদ দেখায়।

চারপাশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আর ফন্দিবাজরা দেশের টুঁটি চেপে ধরে নিজের ধান্দায় লিপ্ত। তাই তো মেকি ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর নেতাদের দৌরাত্ম্য। এদের ঝেঁটিয়ে তাড়াতে না পারলে মানবমুক্তির জন্য প্রাণপাত বিফলে যাবে, বিজয়ের গৌরব ধূলিসাৎ হবে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা