kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ লাখ লাখ মানুষের সামনে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব, তোমরা আমাকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ হ্যাঁ, তাঁকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। পৃথিবীর মানচিত্রে এক নতুন স্বাধীন দেশের সংযোজন হলো। তিনি ২৪ বছর ধরে দেখেছেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালিদের ওপর কিভাবে লুটপাট করেছিল। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ে তোলার। তাই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আর ৮৫ কোটি ভারতীয় হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৯ মাস ধরে সংগ্রাম করেছে। দখলদার বাহিনীর হাতে ৩০ লাখ লোক মারা গেছে আর যুদ্ধে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতের ১৮ হাজার সেনা প্রাণ দিয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর শীতের পড়ন্ত বেলায় ঢাকার রমনা ময়দানে নিয়াজি যখন ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের প্রধান জগজিৎ অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন, সেই খবর ভারতে পৌঁছানোর কয়েক মিনিটের মধ্যে দিল্লিতে লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করছিলেন বেতারের মাধ্যমে, সে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেই ঘটনার সময় রমনার ময়দানে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। এ জন্য আমি দায়ী নই, দায়ী পূর্বাঞ্চলের সামরিক বাহিনীর অফিসাররা। শীতের সন্ধ্যায় স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে কলকাতা। উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ কলকাতা থেকে চারটি বৃহৎ মিছিল বের হয়। এই চারটি মিছিলের উদ্যোক্তা ছিল যুব কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদ। তাদের স্লোগান ছিল—এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী যুগ যুগ জিও, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, চাই, চাই, জয় বাংলা। মিছিল গিয়ে জমায়েত হয়েছিল এসপ্লানেডে, আমেরিকান লাইব্রেরির সামনে। কংগ্রেসের যুবনেতারা আনন্দ মিছিলের মধ্য দিয়ে আমেরিকাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তোমরা বাঙালিকে চিনতে ভুল করেছিলে। আমার ঠিক মনে আছে, যদিও প্রায় ৫০ বছর আগের ঘটনা—সোমেন মিত্র, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, আমেরিকাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন—ওয়াশিংটন এশিয়া থেকে হাত গোটাও আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দাও। প্রায় ৫০ বছর আগে সেই বিকেল থেকে শুরু হয়েছিল রাতভর আনন্দ উল্লাস।

ভিড় ঠেলে রাত ৮টা নাগাদ বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরে তাজউদ্দীনের ঘরে ঢুকে গেলাম। তিনি নিজেই টাইপ করা একটি বাংলা বিবৃতি আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন—এটাই আমার প্রতিক্রিয়া। এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে লেখা চিঠি। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—‘ইন্দিরাজি, আপনার কাছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ও আমার সরকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আশা করি আমাদের দেশ পুনর্গঠনে আপনি আমাদের সহায়ক হবেন। আমরা জানি, আমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনি পাকিস্তান জেল থেকে বের করে আনতে পারবেন।’

বস্তুত সেই ১৬ই ডিসেম্বর ভারতের সংসদে ভাষণ দেওয়ার সময় ইন্দিরা গান্ধী একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইঙ্গিতটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তা হলো— ‘পাকিস্তানের মনে রাখতে হবে, তাদের ৯১ হাজার সেনা এখন আমার হাতে।’ এই ইঙ্গিতটি বিস্ফোরকের মতো কাজ করল সব শরণার্থী শিবিরে।

তাজউদ্দীনের ঘরে তাঁর চার সহকর্মী মন্ত্রী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বহু নেতাই উপস্থিত ছিলেন। আমি তাজউদ্দীনকে বললাম, এবার মিষ্টি খাওয়ান। অধ্যাপক ইউসুফ আলী একটা লাড্ডুর ডালা এগিয়ে দিয়ে বললেন—এই নিন, মিষ্টি খান। তখন ওখানেই শুনলাম কে যেন বলছিল—ভারতের সংসদে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরেই বিএসএফের আইজি গোলক মজুমদার প্রচুর পরিমাণ লাড্ডু পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ওই অফিসে। লাড্ডুটা হাতে নিতেই আবু হেনা কামারুজ্জামান বললেন, কই, আমারটা দিন। ‘আমারটা’ মানে জর্দা। তিনি খুব জর্দা খেতেন। আর আমি তাঁর অফিসে গেলেই তাঁকে জর্দা দিতাম। আমি বললাম—জর্দা আজ আনিনি, আজ মিষ্টি খাব বলে এসেছি। পাশে বসা আমার ৯ মাসের আরেক বন্ধু সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব বললেন, আমার সিগারেট কোথায়, আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করতেই তিনি বললেন—প্যাকেটটা রেখে যাও। ওখানে হঠাৎ খবর এলো আত্মসমর্পণকারী নিয়াজিকে সঙ্গে নিয়ে পূর্বাঞ্চলের জিওএনসি জগজিৎ সিং অরোরা ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছে গেছেন। আমি দ্রুত নেমে ফোর্ট উইলিয়ামের মধ্যে ঢুকে গেলাম, উদ্দেশ্য একটাই—নিয়াজির সঙ্গে দেখা করা যায় কি না। ভারতের সামরিক বাহিনীর অফিসাররা বললেন, নিয়াজির সঙ্গে এখন দেখা হবে না। তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্রাম করছেন।

আবার ফিরে এলাম তাজউদ্দীনের অফিসে। তখন সেখানে সবাই উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁদের বললাম—না, নিয়াজি দেখা করলেন না। পাকিস্তান জেলে বন্দি ইতিহাসের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান এসব ঘটনা কিছুই জানতেন না। তিনি পাকিস্তান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এসে বলেছিলেন— জেলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে রেডিও বা সংবাদপত্র কিছুই দেয়নি। ইন্দিরা গান্ধীর চাপে তারা বাধ্য হয়েছিল ২৫ দিনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। আর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে এসে পাকিস্তান জেলে তাঁর প্রতি অত্যাচারের নানা কাহিনি তিনি বাংলাদেশের জনগণকে শুনিয়েছিলেন।

কাল সেই ঐতিহাসিক ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস। দেখতে দেখতে প্রায় ৫০ বছর কেটে গেল। এর মধ্যে ২১ বছরই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। এই ২১ বছর ক্ষমতায় না থাকার ফলে বাংলাদেশ তার কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে বাস্তবায়িত করতে বারবার পিছিয়ে গেছে দেশের শত্রু আরেক দল অতি লোভী সামরিক শাসকদের জন্য। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র, সমাজবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। এই সঠিক তথ্য পাকিস্তান ও আমেরিকার চরেরা সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবীতে যখন সন্ত্রাসবাদ নিয়ে রাষ্ট্রনায়করা পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করছেন এবং যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব দেখাচ্ছেন, তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ জানিয়ে। তাই আমার বারবার মনে পড়ছে, প্রায় ৫০ বছর আগের আজকের দিনের কথা। পশ্চিমবঙ্গসহ কলকাতায় মাইকে বেজেছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি,’ নজরুলের—‘বাংলাদেশ’ আর কবি জীবনানন্দের রূপসী বাংলা—আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়।...

জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা