kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

জয়ের প্রত্যাশায়

ডা. নুজহাত চৌধুরী

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



জয়ের প্রত্যাশায়

হৃদয়ের সবটুকু আন্তরিকতা ও সততা দিয়ে আমি তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এ বাংলায় প্রতিষ্ঠার কাজটি এখনো অসমাপ্ত এবং সেই যুদ্ধ এখনো চলছে বলে আমি মনে করি। সেই যুদ্ধের অংশ মনে করেই তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি এবং সে কাজটি আমি তীব্র আবেগ নিয়ে করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শুধু ইতিহাসের পরিসংখ্যান নয়, মুক্তিযুদ্ধের শোকগাথা যদি প্রোথিত করে দিতে পারি তরুণদের হৃদয়ে, তবে তারা প্রগাঢ়ভাবে দেশপ্রেমিক হবে, কখনো এ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, কখনো দেশের সঙ্গে বেইমানি করবে না, দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করবে না, কখনো রাজাকারদের সঙ্গে হাত মেলাবে না। এবং সবচেয়ে বড় যে আশায় আমি চিকিৎসকের ব্যস্ত জীবনের বিশ্রামের সময়টুকু জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াই তা হলো, যদি ওরা মুক্তিযুদ্ধের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, শহীদদের কথা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে তাহলে তাদের মধ্য থেকে হয়তো কোনো দিন কোনো এক গ্রাম থেকে আবার কোনো এক খোকা বঙ্গবন্ধু হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াবেন। দিনে দিনে যে বিশাল পঙ্কিলতার দেনা জমেছে, যে ভুলের পাহাড় গড়ে উঠেছে, আমাদের আপসের কারণে রাজাকারদের অপরাজনীতি যে মহীরুহ হয়ে উঠেছে, তার সব কিছু নিঃশেষ করে দিতে আবার সেই ভরাট কণ্ঠে কোনো এক তরুণ ডাক দেবে, ‘এবারের সংগ্রাম...’, আমি সেই চরম একটি যুদ্ধের আশায়, আদর্শিক লড়াইয়ের শেষ বিজয় দেখার আশায়, আরেকবার বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে যাওয়ার লোভে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে বঙ্গবন্ধুর কথা বলে বেড়াই। ওদের ভেতর থেকে কেউ বঙ্গবন্ধু হবে, সেই আশায়। তরুণদের কাছে কথা বলতে গেলেই আমার মনে পড়তে থাকে বাবার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটির কথা। মনে পড়তে থাকে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মাথা উঁচু করে যুদ্ধে যাওয়া রুমীর কথা, মনে হতে থাকে বীরাঙ্গনা মায়েদের কথা। আমার খালি মনে হতে থাকে, এই তরুণরা, যারা আমার ভবিষ্যৎ নেতা, তারা বোঝে কি না—তাদের এই সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রায় পাঁচ দশক আগে তাদেরই বয়সী কত তরুণ, গুডস হিলের সেই নির্যাতন কেন্দ্রে কি তীব্র নির্যাতনের জাঁতাকলে মাথা পেতে দিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই তরুণেরও মা ছিল, হয়তো প্রেয়সী ছিল, ছিল স্বাভাবিক একটি জীবনের আকাঙ্ক্ষা। মৃত্যুকে সেও চায়নি, নির্যাতনকে নিশ্চয়ই সেও ভয় পেত। তবু তারা গিয়েছিল। সব জেনে-বুঝে। নিজেদের বর্তমানকে তারা উৎসর্গ করেছিল, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো থাকে, যেন স্বাধীন সোনার বাংলার প্রতিটি মানুষ সুখী হয়। আমি এটুকুই তরুণদের বোঝাতে চাই। আমার চোখ দিয়ে প্রতিবারই অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকে। আমি ব্যাকুলভাবে ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি, ওরা বুঝল কি না আমার কথা, ওদের বুকে বিঁধল কি না দেশপ্রেমের তীব্র দহন। যদি তারা বোঝে তাহলেই শুধু সার্থক হবে এত আত্মদান। কারণ একবার যদি দেশপ্রেমের আগুন স্পর্শ করে কারো হৃদয়, তবে সে আগুন তাকে চিরকাল পুড়িয়ে খাঁটি করে রাখবে, এ আমি বিশ্বাস করি।

যদি তরুণ প্রজন্ম দেশপ্রেমের আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, তাহলে তারা কখনো দেশের মানুষের হক মারবে না, তারা দুর্নীতি করবে না, দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবে না, কোনো মানুষকে অপমান করবে না। তারা বুঝতে পারবে তাদের এ সুন্দর জীবনের পেছনে আছে কত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সে কৃতজ্ঞ হবে, বিনয়ী হবে। রাজা হবে না, সেবক হবে। এ অর্জন তার নয়, নাম না জানা মুটে-মজুর আর কৃষকের, সে তা অনুধাবন করে নিজের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করবে জীবনে।

এই আশায়ই কথা বলি। এই আশায়ই পথ চলি। কিন্তু মাঝে মাঝে এত বড় ঝাঁকুনি আসে বিশ্বাসে যে কথা বন্ধ হয়ে যায়, কলম চলে না, পা থেমে যায়। যে তরুণ ছোট ভাইদের ডাকে ছুটে যাই, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, বঙ্গবন্ধুর কথা বলি, হৃদয় রক্তাক্ত করে বারবার চোখের জলে নিজের ব্যথা উপস্থাপন করে বাবার কথা বলি, বাবাকে আকুল হয়ে খুঁজে ফেরা একটা ছোট মেয়ের কথা বলি, যাদের ওপর ভরসা করি, তাদের যখন দেখি অমানবিক কাজ করতে, তখন স্তম্ভিত হয়ে যাই।

আবার কখনো মানুষের অপরিসীম লোভের উৎকট বহিঃপ্রকাশ আমাকে ভয় ধরিয়ে দেয়। এরা কারা? এত বিত্ত তারা কোন মহাকালের যাত্রায় নিয়ে যাবে? পারবে কি? আমি অবাস্তব মানুষ নই। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন আমি বুঝি। কিন্তু প্রয়োজন আর লোভ, কৌশল আর আপস এক কথা নয়। মানুষের মনুষ্যত্ব আর বিবেকের কষ্টিপাথর আছে সবার হৃদয়ে। লোভের যে নগ্ন চিত্র দেখি চারপাশে, আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। এদের কর্মকাণ্ডের জন্য মূল্য দিতে হয় সৎ আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মীকে, ব্যঙ্গ শুনতে হয় আমাদের যারা রক্ত দিয়েছি এই আদর্শের জন্য, যারা তাদের বিশ্বাস করেছি একই আদর্শের মানুষ ভেবে।

এমন সব ঘটনায় আমার সবচেয়ে কষ্ট হয় আরেকটি মানুষের জন্য, যিনি দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, তাঁর পিতার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য, সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর পিতার ডাকে যে বিশ্বাস নিয়ে ৩০ লাখ মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, পিতার সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তাঁর এখন সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা। যাঁরা তাঁকে একটু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা জানেন কী অমানুষিক পরিশ্রম করেন তিনি। আমার মাঝে মাঝে তাঁকে স্বপ্নে পাওয়া এক মানুষ মনে হয়, যিনি দেশকে একটি উন্নত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেন ঘোরের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য তিনি রক্ত পানি করে পরিশ্রম করছেন। শুধু তা-ই নয়, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য একাত্তরের পরাজিত শক্তির আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন বারবার। তিনি দেশের জন্য, আমাদের জন্য, তাঁর বাবার প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতেও পরোয়া করেননি। আমার কষ্ট হয় তাঁর জন্য।

যারা তরুণ, যারা নবীন রাজনীতিবিদ তাদের কিছু বিষয় বুঝতে হবে। আওয়ামী লীগ তৃণমূল থেকে মানুষের জন্য রাজনীতি করে গড়ে ওঠা দল। আদর্শের জন্য রক্ত ঝরানো দল। স্বার্থের জন্য বন্দুকের নল দিয়ে গায়ের জোরে তৈরি করা দল নয়। অনেক ত্যাগ ও রক্ত ঝরিয়ে আওয়ামী লীগ মানুষের বুকে অবস্থান করে নিয়েছে। সুতরাং শুধু জয় বাংলা স্লোগান দিলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হওয়া যায় না, শুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি পোস্টারে লাগালেই আওয়ামী লীগার হওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ করতে হলে আদর্শিক সততা থাকতে হবে, ইতিহাস পাঠ করতে হবে, মানুষের জন্য ত্যাগের রাজনীতির চর্চা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির অর্থ বুঝতে হবে, তার চর্চা করতে হবে। আজকের নবীন রাজনীতিবিদরা তা বোঝেন কি?

বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশির ভাগ সময় জেলে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হাতে গোনা কয়টা দিন। আগরতলা মামলায় জেলে থাকার সময় জানতেন ফাঁসি হবে, ভাবনায় প্রধানমন্ত্রিত্বের কথা আনাও ছিল অসম্ভব। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আপস করেননি। জীবন দিয়ে বিশ্বস্ততার দাম চুকিয়েছেন। সেই বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ, সেই জাতীয় চার নেতার দল আওয়ামী লীগ। যদি নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী বা নেতা দাবি করতে চান তাহলে আগে অন্তরে সেই আদর্শিক দৃঢ়তা, চারিত্রিক সততা তৈরি করুন। দলের চেয়েও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বড়। যদি সত্যি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মানুষ মনে করেন তবে নিজেকে আদর্শিকভাবে পরিশুদ্ধ করুন যেন আপনার হাতে দেশ, দেশের মানুষ নিরাপদ থাকে। এই দেশটা ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমানত। এই আমানতের খেয়ানত করলে, তার জবাব দিতে হবে ইতিহাসের কাছে। সততায় হয়তো আপনার তাত্ক্ষণিক প্রাপ্তি কম হবে, কিন্তু মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান লাভ করে বঙ্গবন্ধুর বা তাঁর কন্যার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারবেন।

বিজয়ের মাস আমার মায়ের জন্য বৈধব্যের মাস, আমার বাবাকে হারিয়ে ফেলার, আজীবন হাহাকারের মাস। এ মাসে মনের সব বেদনা আর অশ্রুর অঞ্জলি দিয়ে আমি আপনাদের সবার ভালো চাই। অনেক ভালোবাসি বলেই নিজের অন্তরের দ্বার উন্মোচন করে ভেতরের রক্তক্ষরণ দেখতে দিই। বিজ্ঞানের ব্যাবহারিক ক্লাসের স্পেসিমেনের মতো, একাত্তরের ক্ষতবিক্ষত সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিক্ষা দিই নতুন প্রজন্মকে। তারাও আমার সঙ্গে কাঁদে। সেই তরুণের অশ্রুর পবিত্রতায় আমি বিশ্বাস করি। নিজের অশ্রুঝরা ঝাপসা চোখে সেই নবীনের উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বঙ্গবন্ধুকে খুঁজি, হারিয়ে ফেলা বাবাকে খুঁজি, একাত্তরকে খুঁজি, আমার সোনার বাংলা গড়ার নতুন মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজি। আমি বিশ্বাস করি, খুব বেশি কিছু লাগে না জয়ী হতে, একজন বঙ্গবন্ধু, একজন তাজউদ্দীন অথবা একজন শেখ হাসিনা, তাতেই আদর্শের এই অসমাপ্ত যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়। দলকে ব্যবহার করা শত শত স্বার্থপর অনুপ্রবেশকারী যদি সক্রিয় থাকেও, তার পরও ওই একজন বঙ্গবন্ধু যখন তৈরি হবেন, তাতেই আমি জিতে যাব। তাই আমি আবারও ধরেছি কলম, বলে যাব মুক্তিযুদ্ধের কথা, জাতির পিতার কথা, জয় বাংলার কথা, আমার বাবার মতো লাখো শহীদের কথা। তরুণদের কাতারে বসে মুক্তিযুদ্ধের কথা নীরবে বুকে গেঁথে নেওয়া ছোট ভাই, বোন আমার, তোমার মাঝে আমি বঙ্গবন্ধুকে পাব আবার, সেই আশায় সব কষ্টকে মেনে নিয়ে রক্তাক্ত হৃদয় খুঁড়ে আবারও আমার বেদনাকে তুলে ধরলাম তোমার কাছে। আমার বঙ্গবন্ধু হও, আমার সোনার বাংলা গড়ে দাও, আমার বাবার আত্মদানকে সার্থক করো, দেশটা তোমাদের হাতে ভালো থাকুক।

লেখক : শহীদ সন্তান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা