kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাহালুল মজনুন চুন্নু

বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের সার্থকতা

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের সার্থকতা

মানবাধিকার বলতে বোঝায় মানুষের মৌলিক অধিকারসহ সেসব অধিকার, যা একজন মানুষ হিসেবে পাওয়াটাই ন্যায়সংগত। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার এক নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব মানুষই স্বাধীন অবস্থায় সম-মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে অর্থনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার। মানবাধিকার ঘোষণার ৩০টি অনুচ্ছেদে যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোই বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। তিন থেকে ২১ অনুচ্ছেদে ১৯টি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো জাতি, গোত্র, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্য মতবাদ, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, সম্পত্তি, জন্ম বা অন্য মর্যাদা-নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ ভোগ করার অধিকারী। ২২ থেকে ২৭ অনুচ্ছেদে ছয়টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যেগুলো মানুষের মর্যাদা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য বিধায় ‘সমাজের সদস্য হিসেবে’ প্রত্যেক ব্যক্তিই পাওয়ার অধিকারী। ঐতিহাসিক কাল থেকেই সর্বজনীন মানবাধিকারের ভিত্তিমূল হিসেবে প্রাকৃতিক আইনকে বিবেচনা করা হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা প্রাকৃতিক অধিকার এবং ন্যায়নীতি প্রসঙ্গে যে ধারণা দেন, তা মূলত প্রাকৃতিক আইন হতে উদ্ভূত। সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রণেতারা প্রাকৃতিক আইনের ব্যাখ্যায় সমাজব্যবস্থায় মানব সম্প্রদায়ের প্রাকৃতিক অধিকার তথা ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য সব অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদে তিনি বলেন, বিধাতার বা প্রকৃতির সৃষ্টি হিসেবে প্রতিটি মানবসত্তা প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন ও সম-অধিকারসম্পন্ন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় কেঁপে উঠেছিল পুরো বিশ্ববাসী। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিভিন্ন মহল থেকে মানুষের মৌলিক মানবাধিকারগুলোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়ে দাবি উঠতে থাকে। এসব দাবিদাওয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও ভূলুণ্ঠিত হয় মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় এবং যুদ্ধকালে হিটলার ও মুসোলিনির অক্ষশক্তির নৃশংসতা এবং ববর্র কাণ্ডে স্তম্ভিত হয়েছে মানবতা। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার বিষয়টি তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। যার ফলে গঠিত হয় মানবাধিকার কমিশন। এই কমিশন মিসেস এলিয়েনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’র খসড়া (ড্রাফট) তৈরি করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জমা দেওয়া হয় এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। বিশ্বের অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক দলিলের তুলনায় মানবাধিকার ঘোষণার প্রভাব গভীর ও স্থায়ী। ১৯৪৮ সালে গৃহীত হওয়ার পর থেকে ঘোষণাটি সর্বকালের সার্বিক পরিচিত এবং প্রভাবশালী দলিলগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১৯৫০ সালের এই দিনটিকে জাতিসংঘ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে এ দিনটি পালিত হচ্ছে মানবাধিকার দিবস হিসেবে।

সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে মোট ১৮টি স্বাধীনতা ও অধিকার স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় বর্ণিত রয়েছে। এগুলো হলো নাগরিক ও রাজনৈতিক মানবাধিকার। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানবাধিকার এবং সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে। এগুলো স্থান পেয়েছে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ হিসেবে। বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে আইনের দৃষ্টিতে সবার সম-অধিকারের (অনুচ্ছেদ-২৭) এবং ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে সবার আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ-৩১ এবং ৩৩)। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোয় অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সুযোগের সমতা ও কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের কর্মের অধিকার লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। শুধু সংবিধান প্রণয়নই নয়, বঙ্গবন্ধু বাঙালির মানবাধিকার রক্ষার জন্য এর বাস্তবায়নসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচি ছিল মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের এক দূরদর্শী কার্যক্রম। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট এক দল নরপিশাচ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে এই দেশের মানুষের মানবাধিকার মুখ থুবড়ে পড়ে। জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনামলে এই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে এ দেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে তিনি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাসহ বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী সদস্য। বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সনদের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট (আইসিইএসসিআর), নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট (আইসিসিপিআর), শিশু অধিকার বিষয়ক সনদ (সিআরসি), নিপীড়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (সিএটি) এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের সনদ (সিডও) উল্লেখযোগ্য। এসব চুক্তি ও সনদের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যাই জাতীয় মানবাধিকার আইন প্রণয়ন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করেন। সরকার মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে মানবাধিকার সুরক্ষা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি মানবাধিকার সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার তথা অংশীজনকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

মানবাধিকার রক্ষাকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার এতটাই গুরুত্ব দেয় যে নিজেদের অনেক ক্ষতি সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে এ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি আজ ভালো অবস্থানে থাকলেও বিশ্বমানবতা আজ হুমকির মুখে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন ও ক্ষমতালিপ্সুদের পরিকল্পনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলছে পরিকল্পিত গণহত্যা। নির্বিচারে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে। এক খণ্ড নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে পৃথিবী। ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের কবলে লাখ লাখ বিশ্ব নাগরিক। মধ্যপ্রাচ্যে ধুঁকছে মানবতা। ইয়েমেন, সিরিয়ার মানুষ আজ হয়ে পড়েছে অসহায়। ফিলিস্তিনিদের তো মাথা গোঁজার ঠাঁইও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পূর্ব থেকে পশ্চিম—সর্বত্রই নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো একদিকে মানবতার বুলি আওড়াচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ হত্যার তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। মানবতার রক্ষকের অভিনয় করলেও আদতে তারাই মূলত নানা ছলে-কৌশলে মানবাধিকার হরণ করছে। বলতে দ্বিধা নেই, জাতিসংঘের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র আজ এক টুকরো কাগুজে দলিল ছাড়া আর তেমন কিছু নয় বলেই বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘকে মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা