kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

তেলেঙ্গানার পর উন্নাওকাণ্ড ও আইনের শাসন

জয়ন্ত ঘোষাল

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তেলেঙ্গানার পর উন্নাওকাণ্ড ও আইনের শাসন

পুলিশের এনকাউন্টারে ‘ধর্ষণে’ অভিযুক্তদের গুলি করে দেওয়ার পক্ষে ভারতের প্রতিটি রাজ্যে দেখা যাচ্ছে গণ-উল্লাসের ছবি। এক কথায় বলা যায়, এটি হলো এক গণ-উন্মাদনা। টিভি চ্যানেলে কত মুখ, সবাই বলছেন এটাই হওয়া উচিত। একেই বলা যায় ন্যায়। এ ছবিটিই যখন প্রধান হয়ে উঠেছে, তখন এই ভিড়ের মনস্তত্ত্বে হারিয়ে গেছে একটি ছোট্ট বিবৃতি। সর্বভারতীয় প্রগতিশীল মহিলা সংগঠনের নেত্রী কবিতার বিবৃতি। তিনি বলেছেন, না, আমাদের নাম করে হত্যা নয়। মহিলাদের নিরাপত্তার নামে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টায়, বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর চেষ্টায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করা হবে না। সাধারণ নাগরিক, বিশিষ্টজন, এমনকি সংসদ সদস্যদের একাংশ যখন হায়দরাবাদের ঘটনাকে ন্যায়বিচার বলে সমর্থন করেছেন, মিষ্টি খাইয়েছেন অথবা বাজি পুড়িয়েছেন, মহিলা আন্দোলনের নেত্রী অথবা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এনকাউন্টারকে তো  কখনো ন্যায়বিচার বলে অভিহিত করা যায় না।

পাঠককে মনে করিয়ে দিই, এই কবিতাই এর আগে দিল্লিতে নির্ভয়া গণধর্ষণের প্রতিবাদে ইন্ডিয়া গেটের সামনে রাজপথে যে মিছিল ও আন্দোলন হয়েছিল তাতে ছিলেন একেবারে প্রথম পঙিক্ততে। তাহলে? এনকাউন্টারে ধর্ষণকারীদের মৃত্যুর পর যদি বলি, ওদের হত্যা করা গর্হিত অপরাধ হয়েছে, তাহলে কি ধর্ষণকারীদের ব্যাপারে নরম মনোভাব নেওয়া হয়ে যায় না।

তবে যখন হায়দরাবাদের ঘটনার পর উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ের ধর্ষিতার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়, তখন তো এ প্রশ্নটাই ওঠে—একটা এনকাউন্টারে কি এই ধর্ষণ নামের সামাজিক ব্যাধির সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? নাকি ধর্ষণকারীদের শাস্তি প্রদানের জন্য চাই শক্তিশালী প্রশাসন, দ্রুত নিষ্পত্তিকারী বিচারব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা।

ভারতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটা মস্ত বড় ঘুণপোকা আছে। এই ঘুণপোকাটি কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের এই ব্যবস্থাকে। কিছুদিন আগে বলিউডের তৈরি একটি ছবি দেখেছিলাম। ছবিটির নাম আর্টিকল-ফিফটিন। অনুভব সিনহার এ ছবিতে অংশুমান খুরানা এক নবীন আইপিএস অফিসার। প্রথম পোস্টিং বিহারের এক গ্রামে, যেখানে দলিত স্কুলপড়ুয়া বালিকাদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। ওই সৎ অফিসার আপসহীন তাঁর তদন্তে ব্যবস্থা গ্রহণে; কিন্তু তাঁর চারপাশে প্রশাসন, আইনিব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, দিল্লির রাজনীতি ক্ষমতার অক্টোপাস। দেখা গেছে, কী ভয়াবহভাবে ব্যবস্থার অক্টোপাসে জড়িয়ে পড়েছেন ওই অফিসার। আজ এই ধর্ষণকারীদের এনকাউন্টার দেখে মনে পড়ে গেল কিছুদিন আগে দেখা সেই ছবিটি।

উন্নাওয়ে কী হলো? ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে ধর্ষিতাকেই অগ্নিদগ্ধ হতে হয়। গত বছর উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ের এক ১৭ বছরের কিশোরী উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনেই নিজের গায়ে আগুন দেয় বিচার পাওয়ার আশায়। কয়েক দিন আগে আরেক ধর্ষিতা তরুণী আদালতে যাওয়ার পথে অগ্নিদগ্ধ হলেন অভিযুক্তদের হাতেই। প্রাণ বাঁচানোর আশায় প্রায় এক কিলোমিটার ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন ওই তরুণী। এই ভয়ানক দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারত। আর সেই ভারতে এমন দৃশ্য কি ভাবা যায়? অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ হোক কিন্তু রামরাজ্য বলতে কী বোঝায়? গাঁধীজিও তো রামরাজ্যের কথা বলেছিলেন। সে রামরাজ্য মানে ন্যায় ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। উন্নাও আমাদের কী শিক্ষা দিল? উন্নাওয়ের ঘটনা বুঝিয়ে দিল, একটা এনকাউন্টারে ভারতে ধর্ষণ সমস্যার সমাধান হবে না। ধর্ষণের মতো অপরাধের প্রতি দেশে প্রশ্রয়ের আবহ না থাকলে কী করে উন্নাওয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ফের এই একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হতে পারে? ধর্ষকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে যাওয়ার পথে ধর্ষিতার ওপর আক্রমণ তো শুধু একটা অপরাধ নয়। সমগ্র নারী জাতির প্রতি একটা বার্তা। আমরা বুঝতে পারছি রাষ্ট্র নির্যাতিতাকে রক্ষা করতে পারছে না। আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, যেখানে সামাজিক অসাম্য এক ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, সেই সমাজে আইনের শাসন কোথায়? সংবিধানে তো মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আম্বেদকরের মূর্তিতে মাল্যদানের ঘটা কমেনি। আমরা মানবাধিকার সচেতন সভ্যতার মৌলিক নীতিগুলোর কী দুরবস্থা তা-ও তো দেখতে পাচ্ছি।

এর পাশাপাশি আছে পুরুষতন্ত্রের ঔদ্ধত্য। তবে এখানে আজ এটাও খুব জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন, ধর্ষণকারীদের শাস্তি বিধানকে ‘জেন্ডার ইস্যু’ হিসেবেও দেখা উচিত নয়। লিঙ্গবৈষম্য তাতে এ দেশে, এ সমাজে আরো বাড়বে। আমি একজন পুরুষ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ধর্ষণের মতো এক জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি প্রদানের পক্ষে। শুধু নারীর অধিকার নয়, প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মধ্যমগ্রামের সেই কিশোরীর কথা মনে পড়ছে, যে পুলিশের কাছে যখন অভিযোগ জানাতে যায় তখন আবার তাঁকে গণধর্ষণ করা হয়। এরপর আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই ধর্ষণে অভিযুক্তরা তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাঁকেই অগ্নিদগ্ধ করে মেরেছিল। সেটা ছিল ২০১৪ সাল। এরপর এই পাঁচ বছরে আরো কয়জন শুধু বাংলা নয়, গোটা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে আর কয়জন বিচারের বাণী পেয়েছেন, তার প্রকৃত হিসাব কি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট থেকে পাওয়া যেতে পারে?

আরেকটা কথাও বলা প্রয়োজন, যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, এভাবে সেই ব্যবস্থায় অবক্ষয় হয়, তখন বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। তাই সেই ব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিপ্লবের কাণ্ডারিদের যখন আর দেখতে পাওয়া যায় না, বিপ্লব হয়ে যায় প্রতিবিপ্লব। ঠিক তখন সমাজে ভিড়তন্ত্র দেখা যায়। এই যে মাঝে-মধ্যে আমরা খবরের কাগজে পড়তাম ডাকা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক ব্যক্তির মৃত্যু। এই যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, সে-ও কিন্তু এক ভয়ংকর সমস্যা।

হায়দরাবাদের এনকাউন্টারের পর ইন্দোরে আদালতের বাইরে অভিযুক্ত ধর্ষণকারীদের ওপর চড়াও হয়েছে আমজনতা। আওয়াজ উঠেছে—ধর ধর। মার মার। এ-ও এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। নির্ভয়ার মা আশা দেবী প্রশ্ন তুললেন, তেলেঙ্গানা পারল, তাহলে দিল্লি পুলিশ কেন পারেনি? আবার দিল্লি পুলিশ মানে কেজরিয়াল, নাকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ঘটনাটি হয় সাত বছর আগে। এখন প্রশ্ন, তবে তো এটা নরেন্দ্র মোদির সরকারের দায় নয়। দায় ছিল মনমোহন সিংয়ের।

এ ধরনের বিতর্ক শুনলেও মন বিষাদগ্রস্ত হয়ে যায়। ধর্ষণ হলো ধর্ষণ। এক জঘন্য সামাজিক অপরাধ। এটা মোদির সরকারের দায়, না মমতার, নাকি কংগ্রেসের—এই ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা বোধ হয় আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।

দু-একটা দৃষ্টান্তমূলক এনকাউন্টারে কি এ দেশের ধর্ষণকারীরা সত্যি সত্যি ভয় পাবে? তার জন্য কি আমরা এ ধরনের এনকাউন্টারকে সমর্থন করতে প্রস্তুত?

তেলেঙ্গানাকাণ্ডে নাগরিক মনোভাব কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। হয়তো এই বিতর্কও গণতন্ত্রের জন্য ভালো। যখন রাজীব গান্ধীর হত্যাকারী এলটিটিই জঙ্গি সেই মহিলাকে মৃত্যুদণ্ড না দিতে রাষ্ট্রপতির কাছে সোনিয়া গান্ধী আরজি জানান, তখন তিনি যে উদারতা দেখান, সেটা উচিত ছিল না, ছিল না তা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে।

ধর্ষণকারীদের নির্মম শাস্তি আমরা চাই, তবে দেশে আইনের শাসনের বদলে রাষ্ট্রতন্ত্র বা আমজনতাই যদি নিজেদের হাতে আইন তুলে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে সে পরিস্থিতিও কাম্য বলে মনে হয় না।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা