kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

আত্মমর্যাদার সিগন্যাল!

এম এ মোমেন   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আত্মমর্যাদার সিগন্যাল!

অভিনন্দন জাকির, খলিল ও জুয়েল মৃধাকে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক তাদের ছবি ছেপেছে, তাদের কীর্তি তুলে ধরেছে। তারা ছিনতাইকারী, তবে যেনতেন মানের ছিনতাইকারী নয়, নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ হেঁচকা টানে ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালানোর মতো ছিঁচকে ছিনতাইকারী তারা নয়। তারা জানে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে গ্র্যাজুয়েশন হতে যাচ্ছে। একটি পর্যবেক্ষণকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। এ সময় ছিনতাইকারী ঝুঁকিবহুল পেশায় কঠোর পরিশ্রম করার পর যদি মাত্র কয়েক হাজার টাকা পায়—এই ইন্ডিকেটর দিয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এবং পোভার্টি ওয়াচারদের বোঝানো যাবে না যে বাংলাদেশের সত্যি বড় ধরনের একটি গ্র্যাজুয়েশন হতে যাচ্ছে। এই ছিনতাইকারীরা নিজেদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারা মশা-মাছি মেরে হাত নষ্ট করবে না। ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকা না হলে তারা ছিনতাই করবে না। তাদের ছিনতাই অবশ্যই দেশের মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।

কথা দিয়ে কথা না রাখার সংস্কৃতি যখন জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে—টেন্ডার দলিলের প্রতিশ্রুতি ঠিকাদার মানেন না, কাবিনের চুক্তিনামা স্বামী মানেন না, জনগণকে ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা পাসের পর নেতা মানেন না, সেখানে মহান ব্যতিক্রম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে এই তিন ছিনতাইকারী ও তাদের চক্র।

তাদের এক ডজন সোর্স আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে সদা মজুদ থেকে শকুনদৃষ্টি ফেলে সব ধরনের লেনদেন পর্যবেক্ষণ করে। সেবাগ্রহীতার আচরণ পাঠ করে, তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে, থিসিস অ্যান্টি-থিসিস সিনথেসিস পর্ব পেরিয়ে যখন নিশ্চিত হয় টার্গেট ধরতে পারলে আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। অর্থাৎ কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা মিলবেই। শুধু তখনই তারা সিগন্যাল পাঠায়।

সিগন্যাল পেয়ে মূল যোদ্ধারা দ্রুত টার্গেটকে ভড়কে দেওয়া অপারেশন কস্টিউম পরিধান করে। ডিবি স্টিকার লাগানো অপারেশনাল ভেহিকল-মাইক্রোবাসে আসন গ্রহণ করে তাদের জ্যাকেটেও ডিবি লেখা আছে। মোটরসাইকেলচারী সোর্সদের কাছ থেকে সাংকেতিক বার্তা পাওয়া মাত্রই তারা ডিবি হয়ে টার্গেটমুখী ছুটে কেমন করে কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিতে হয় তারা জানে।

দুর্ভাগ্য তাদের, একিলিসের গোড়ালি ট্রয় যুদ্ধের বারোটা বাজিয়ে দিল, এমন একজন তাদেরও ছিল—সোহাগ মাঝি, যেখানে স্প্রিন্ট রানার দরকার সেখানে এই মানুষটি ছিল ম্যারাথন রানার। অপারেশনের প্রায় সিকি ভাগ টাকাসহ বেচারা ধরা পড়ে যায়। নিশ্চিত হওয়া যায় তারা কথা রেখেছে, মধ্যম আয়ের গোবরাট ছোঁয়ার ঠিক আগে তারা কোনো নেগেটিভ ইন্ডিকেটর দেয়নি; তাদের অপারেশনটি ছিল ৯৫ লাখ টাকার।

ধরা পড়ার আগের অপারেশনটি তাদের প্রতিশ্রুতির যথার্থতার প্রমাণ দেয়—পঞ্চাশের নিচে নামেনি। আত্মমর্যাদার এই সিগন্যালের মূল্য কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা। ভারতীয় কাহিনিটি বলতেই হয়, ছিনতাইয়ের ৫০ লাখ টাকা রিকভার হলেও রেকর্ডে এলো পাঁচ লাখ, আসামিকে বোঝানো হলো চার্জশিটে টাকার অঙ্ক ১০ ভাগের এক ভাগ লিখলে সাজাও সমানুপাতিক হারেই কমবে।

বাকি ৪৫ যাবে কোথায়? এমন বিব্রতকর প্রশ্ন করতে নেই।

মানতেই হবে পুরো ৯৫ লাখেরও যদি রিকভারি হয়ে যায়, অবলীলায় ৪৫ লাখ আর ৫০ লাখ দুটি ভাগ করে ৫০ লাখের থলেটি আদালতে আলামত হিসেবে দেখালেও ছিনতাইকারীদের প্রতিশ্রুতির কোনো হেরফের ঘটবে না, পঞ্চাশের নিচে তো আর নামেনি!

৯৫ লাখ টাকা ছিনতাই করতে গিয়ে তারা বুলেট ভরসা করেনি, কাউকে তেমন কোনো জখমও করেনি। ব্র্যাভো জাকির খলিল জুয়েল সোহাগ!

এই ছিনতাইকারী গ্রুপটিকে ভিআইপি-সিআইপি ধরনের সম্মানে ভূষিত করতে পারলে ভালো হতো।

তাদের কাছে শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ এবং শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে :

ক. যে দলই ক্ষমতাসীন থাকুক সে দলের ছাত্রনেতাদের চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে মিনিমাম সিলিং ধার্য থাকতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত যেসব খবর কাগজে এসেছে, তাতে চাঁদার যে প্র্যাকটিসের উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে কমপক্ষে এক কোটি টাকার মিনিমাম সিলিং থাকতে হবে। নতুবা তা দেশের মান-ইজ্জতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে না।

খ. নেতারা যেসব ঘরবাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট দলের জোর ও গায়ের জোরে দখল করে থাকেন, তাতে নগর জমির ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ কাঠা, পল্লী জমির ক্ষেত্রে এক বিঘা এবং অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে ২১০০ বর্গফুটের নিম্ন সিলিং থাকতে হবে। এর চেয়ে কম পরিমাণের জমি বা অ্যাপার্টমেন্টের দিকে নজর দিলে তা তাঁদের নিজস্ব দল ও মূল দলের (নিজেদের দ্বারা যে যে দলের লেজুড় পরিচয় দিতে শ্লাঘা বোধ করেন) ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারীকে দ্রুত বহিষ্কার করে দলকে কলঙ্কমুক্ত হতে হবে।

গ. সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলানুগ্রহ ভিক্ষাজীবী ভাইস চ্যান্সেলরের (যাঁরা কোনো দলে অনুগ্রহ ভিক্ষা করেন না তাঁদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ নেই) কাছ থেকে কোনো কিছুরই প্রমিত মান সম্পর্কে ধারণা পাবেন না, তাঁরা পুরোদস্তুর দলীয় করুণাজীবী, তার চেয়ে বরং আত্মমর্যাদায় অধিষ্ঠিত অন্তত ৫০ লাখ টাকা না হলে ছোঁব না এমন প্রতিজ্ঞা যাদের, তাদের অনুসরণ করতে বলব—তারাই বলবে অন্তত ফিফটি পার্সেন্ট নম্বর না পেলে পরীক্ষায় পাসই করতে চাইব না।

জীবনে যাঁরা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিতে পারেন, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সংগতি রেখে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখল ইত্যাদির প্রমিত ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে দেন তাঁরাই একালের শিক্ষক।

পাদটীকা : প্রসঙ্গটি ভিন্ন হলেও অবান্তর নয়। কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত করছি :

বাদশাহ কহেন, সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে

নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন

পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ!

নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে

ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ

স্মরি ব্যথা পাই মনে।

বাদশাহ আলমগীর এ দৃশ্য দেখলে তৃপ্তিতে আহা আহা করে উঠতেন : ছাত্রনেতারা তাঁদের অধ্যক্ষকে পুকুরে ডুবিয়ে-চুবিয়ে স্নান করিয়ে তবে তুলেছেন। শিক্ষকের মর্যাদার নতুন একটি স্ট্যান্ডার্ড তাঁরাও স্থাপন করেছেন।

 

লেখক : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা