kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

রায়হানদের একটু পরামর্শের প্রয়োজন

ড. মো. আনিসুজ্জামান

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রায়হানদের একটু পরামর্শের প্রয়োজন

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার আড়ানী পৌরসভার পাকা বাজারের ভ্যানচালক মান্নানের দুই সন্তানের বড় সন্তান পড়ে নাটোর জেলার একটি কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে। ছোট সন্তান পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। ছোট সন্তান বড় হয়ে কী পড়তে চায় জিজ্ঞেস করায় মান্নান কোনো উত্তর দিতে পারেননি। দিনমজুর, ভ্যানচালকদের সন্তানরা জানে না কী পড়বে। কোন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলে তাদের জীবন একটু সহজ হবে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির ওপর চাপ একটু কম হবে। বাংলাদেশে এবং বহির্বিশ্বে কোনসব বিষয়ের চাকরির বাজার একটু ভালো। দেশে কোন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির বাজারে প্রবেশ পথ সহজ হবে—ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশে বহু শিক্ষার্থীকে শিক্ষাজীবনে কিছু আয় করতে হয়। আর্থিক অসংগতির কারণে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়াই কঠিন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্দেশ্য প্রধানত দক্ষ জনসম্পদ সৃষ্টি করা। দক্ষ জনসম্পদ রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং আদর্শ বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আদর্শ হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার জন্য দক্ষ জনশক্তি সবার আগে প্রয়োজন। উদ্দেশ্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা কখনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায় না। কোন শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি দক্ষ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে এমন কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা শিক্ষার্থীদের সামনে নেই। তিন ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থাপনা চলছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। মাদরাসা, ইংরেজি মাধ্যম এবং বাংলা মাধ্যমের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন এবং কোন বিষয়টি জীবিকা নির্বাহের জন্য দরকার, তা জানবার-বোঝবার কোনো ব্যবস্থা নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায়, মানবিক বিভাগের আরবি, উর্দু, ফারসি, ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস, ইসলামিক স্টাডিজ ও দর্শনের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই এসব বিষয় পড়তে চাননি। অন্য কোনো বিভাগে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে এসব বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি ও বায়োকেমেস্ট্রির মতো বিষয়গুলো ভর্তির সুযোগ হারিয়ে মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অনাগ্রহের বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকেই কোনো আগ্রহ থাকে না। বড় ভাই-বোনদের নোট কিংবা শিটের ওপর চলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা। বিপরীত চিত্র খুবই নগণ্য।

আমার বিলাতপ্রবাসী বন্ধুর একমাত্র সন্তান ‘ও’ লেভেল শেষ করে ‘এ’ লেভেলে পড়ছে। প্রাণিবিদ্যা, সাইকোলজি এবং রসায়ন নিয়ে সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী। বন্ধুটি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য এরই মধ্যে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন এবং ইম্পেরিয়াল কলেজে বুকিং দিয়ে রেখেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রীষ্মকালীন স্কুলে বন্ধুর সন্তানটি অংশগ্রহণ করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে এসব বিষয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবে। কোন বিষয় পড়লে সে ভবিষ্যতে কী করতে পারবে ইত্যাদি গ্রীষ্মকালীন স্কুলে শিক্ষা দেওয়া হয়। ‘এ’ লেভেলের প্রথম পর্বেই সে গ্রীষ্মকালীন স্কুল সম্পন্ন করে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেবে—এমন কথাই বন্ধুর সন্তানটি জানিয়েছে। বিপরীত চিত্রে আমাদের সন্তানরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি কোচিং সেন্টারে দৌড় শুরু করে। তারপর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা। সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগ যেকোনো জনদুর্ভোগের চেয়ে বেশি। ভর্তি পরীক্ষার সময় আবাসনের সমস্যা প্রকট। ছাত্রাবাসে, হোটেলে স্থান হয় না।

বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীই জানেন না কোন বিষয়টির ভবিষ্যৎ কী এবং কোন বিষয় পড়লে শিক্ষার্থী দ্রুত কর্মবাজারে প্রবেশ করতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা নিজে থেকে অনুমানভিত্তিক ধারণাগুলো অর্জন করেন অথবা পরিবার থেকে ধারণা দেওয়া হয়। ভ্যানচালক, দিনমজুরের সন্তান কী পড়বে সে ধারণা কি ভ্যানচালকের আছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. নুরুজ্জামান কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবের সামনে থেকে একটি রিকশা ডেকে তুলে দিলেন। ছেলেটির নাম রায়হান, দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন ইন্টারমিডিয়েটে টেস্ট পরীক্ষার টাকার জন্য। বাবা দিনমজুর। ব্র্যাক পরিচালিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র থেকে রায়হান কবির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে এ পর্যন্ত এসেছেন। অধ্যাপক নুরুজ্জামানকে তিনি চেনেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কখনো আসেননি। স্থানটি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা-ও তিনি জানেন না। স্কুল শিক্ষকদের পরামর্শে রায়হান বিজ্ঞান শাখায় পড়ছেন। স্কুল-কলেজের ফাঁকে ফাঁকে কখনো তিনি অন্যের জমিতে কাজ করেন। আবার কখনো রিকশা চালিয়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে চান। টাকার অভাবে একবার তিনি পরীক্ষা দিতে পারেননি। এবার ঢাকায় রিকশা চালিয়ে টাকা সংগ্রহ করে বই কিনেছেন এবং বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষা দিচ্ছেন দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ডিগ্রি কলেজে থেকে। একজন উন্নত জীবনের লক্ষ্যে অক্সফোর্ডের গ্রীষ্মকালীন স্কুলে যাচ্ছেন, অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রিকশা চালাচ্ছেন। একজন জানতে চান তিনি কী পড়বেন, অন্যজন জানেন না তিনি কী করবেন। দুজনই আগামী দিনের সম্ভাবনার মানুষ।

বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে। প্রায়ই দেখা যায় টাকার অভাবে মেধাবী শিক্ষার্থী মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে টাকার অভাবে ভর্তি অনিশ্চিত। জনপ্রতিনিধি কারো শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার দায়িত্ব নিয়েছেন অথবা অন্য কেউ। এর বাইরে রায়হান কবিরের মতো অনেকেই থেকে যাচ্ছেন। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাঁর গন্তেব্য পৌঁছতে পারছেন না। একজন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে কী পড়বেন তিনি জানেন না। স্কুল-কলেজ থেকে তাঁকে জানানো হয়নি। স্কুল-কলেজের মাস্টার প্রাইভেট, কোচিং নিয়ে ব্যস্ত। হতদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ফরম ফিলাপের সময় আর্থিক সাহায্যের বেশ কয়েকটি আবেদন থাকে। শুনেছি, অন্য বিভাগগুলোর অবস্থা প্রায় একই রকম। দর্শন বিভাগে সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সাহায্যের সব কটি আবেদনপত্র বিবেচনা করা হয়। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থেকেও কিছু সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অনেক বিষয় আছে, যেগুলো পড়ার সময় কিছু আয় হয় এবং পড়া শেষে চাকরির বাজার প্রায় নির্দিষ্ট। রায়হানদের মতো হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা একটু পরামর্শ পেলে আর্থিক অনটনের কারণে শিক্ষাজীবনে বিপদ হয় না। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে রায়হানদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষের অভাব নেই। কিন্তু রায়হানদের খুঁজে বের করবে কে? ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা টিউশন দিয়ে পড়ার খরচ চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মধ্যমমানের শিক্ষার্থীদের টিউশন পাওয়া বেশ কঠিন। রাজশাহীতে টিউশন জোগাড় করা অনেকটা সোনার হরিণের মতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রফেসর ড. আতিউর রহমানের প্রথম শিক্ষাজীবনের করুণ কাহিনি তিনি বলেছেন। তাঁর চেয়ে রায়হানদের অবস্থা আরো শোচনীয়। বাংলাদেশে এমন হাজারো সম্ভাবনা রয়েছে, যাঁরা অর্থিক সহযোগিতা নয়, শুধু একটু সৎ পরামর্শ পেলে দেশকে ভালো কিছু উপহার দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। গ্রীষ্মকালীন স্কুলের দরকার নেই। স্কুল-কলেজ থেকেই এ অদম্য মেধাবীদের সৎ পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

সম্ভাবনার এই বাংলাদেশ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। দেশ এগিয়ে যাবে। রায়হানরা দেশ এগিয়ে নেবে। এ দেশ রায়হানদের। শুধু রায়হানদের একটু গাইড করা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে দু-একজন রায়হান এগিয়ে যায় কিন্তু বিপুলসংখ্যক রায়হানের স্বপ্ন সামান্য পরামর্শের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দক্ষ জনসম্পদ সৃষ্টিতে ক্ষতি হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অভিঘাত মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি না দিলে ভবিষ্যৎ আলোকিত হওয়ার সম্ভাবনা স্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা