kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

সময়ের প্রতিধ্বনি

শুদ্ধি অভিযান, আত্মশুদ্ধি ও সমাজবাস্তবতা

মোস্তফা কামাল

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শুদ্ধি অভিযান, আত্মশুদ্ধি ও সমাজবাস্তবতা

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুর্নীতি সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা এ রকম—কেউ কেউ অনিয়মকে নিয়ম করতে চান। এটা হবে না। আবার একজন সৎ মানুষ যেন মামলার শিকার না হন, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেছেন।

দুদক চেয়ারম্যান খুবই চমৎকার কথা বলেছেন। তাঁর কথাগুলোর বাস্তব চিত্র যদি আমাদের সমাজে দেখতে পেতাম, তাহলে সত্যিই খুব ভালো অনুভূতি হতো। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? এখনকার জামানায় সৎ মানুষেরই পদে পদে বিপদ। সৎ জীবন যাপন করাই যেন বড় অপরাধ! সৎ মানুষকে নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয়। প্রতিনিয়ত চারপাশের অসৎ মানুষ তাঁকে তীরবিদ্ধ করতে থাকেন। তাঁরা টিপ্পনী কেটে বলতে থাকেন, উহ্ সৎ! সুযোগের অভাবে সৎ! ঘুষ আবার খায় না! তাহলে কী খায়?

কথায় আছে না, সব শিয়ালের এক রা! আমরা বিভিন্ন স্তরে এ ধরনের লোক দেখতে পাই। খারাপ লোক সব সময় জোট বেঁধে চলে। তাদের মধ্যে এক ধরনের অশুভ আঁতাত হয়ে যায়। ফলে সৎ লোকটি হয়ে যান কোণঠাসা। সব ‘রা’ যখন একত্র হয়; তখন সৎ মানুষের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক কারণেই সংকুচিত হয়ে যায়। সংগত কারণেই ‘সৎ’ শব্দটি ডিকশনারির পাতায় তুলে রাখতে হয়। অসৎ মানুষের প্রভাব ও প্রতাপে সৎ বলার সৎসাহসটিও যেন হারিয়ে যায়।

তার পরও বলব, দেশে সৎ মানুষের সংখ্যাই বেশি। অসৎ মানুষের সংখ্যা কম। কিন্তু তাঁদের হাঁকডাক বেশি। প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি। পয়সার গরমে তাঁদের গলার স্বর সব সময় উঁচুতে থাকে। সে কারণেই তাঁদের আওয়াজ বেশি। তাঁরা এমন শোরগোল তোলেন যেন তাঁরা যা বলেন সেটাই ঠিক। আর সব মিথ্যা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিই কি অসততা? আমি তা মোটেও মনে করি না। ধরুন, আপনি কোনো অফিসে চাকরি করেন। আপনি আপনার নিজের কাজ ঠিকমতো করেন না। ঠিকমতো অফিসে যান না। আপনি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘোরেন। আপনি অফিসকে নিজের মনে করে কাজ করেন না। যেখানে আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে, সেখানেই আপনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। চাকরিটাই যেন আপনার কাছে গৌণ। অথচ আপনি বসের সামনে গিয়ে চাপাবাজি করেন। চাপাবাজি দিয়ে আপনি আপনার ফাঁকিবাজি ঢাকেন। কথায় কথায় বসকে বলেন, আপনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শুধু কাজ করে করে দুনিয়া উল্টে ফেলছেন। আপনি ছাড়া অফিসের আর কেউ যেন কিছুই করছে না। আপনার কারণেই অফিসটা টিকে আছে।

বস তো মনে করেন, তাঁর কর্মচারী না জানি কত কাজ করেন। আপনার বস আপনার কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আপনাকে পদোন্নতি দিয়ে দেন। আপনার বেতন বাড়িয়ে দেন। এই যে আপনি চাপাবাজি করে নিজের পদ-পদবি বাগিয়ে নিলেন, বেতন বাড়িয়ে নিলেন; এটা কি অন্যায় নয়? এটা কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না?

ছোটবেলায় আমাদের ভাবসম্প্রসারণ পড়ানো হতো, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’। যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি শিক্ষার্থী হয়তো এ বিষয়ে ভাবসম্প্রসারণ লিখেছেন। কিন্তু কেউ কি ব্যক্তিজীবনে এ বিষয়টি কাজে লাগিয়েছেন? কেউ কি কখনো প্রতিজ্ঞা করেছেন যে জীবনে কখনো কারো কাছ থেকে ঘুষ নেব না, কখনো ঘুষ দেবও না। আমরা সবাই জানি, ঘুষ যে দেয় আর ঘুষ যে নেয় উভয়েই সমান অপরাধী। জেনেশুনে সবাই এই অপরাধটিই করেন। যিনি ঘুষ দেন তিনি বলেন, ঘুষ না দিলে তো আমার কাজটি হবে না। আর যিনি ফাইল আটকে ঘুষ নেন, তিনি যে রাষ্ট্রের একজন সেবক সে কথা মনে রাখেন না। ব্যক্তিস্বার্থের কারণে তা ভুলে যান।

আমরা প্রায় প্রতিবছর দুর্নীতির ধারণাসূচক প্রকাশ হতে দেখি। দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের দিকেই থাকে। বিএনপি আমলে পরপর চার বছর দুর্নীতিতে শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেও দুর্নীতি রোধ করতে পারেনি। সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি এখনো মারাত্মক এক ব্যাধির মতো দেশটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ জোরেশোরেই কথা বলা শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, দুর্নীতি এখন দেশের প্রধান শত্রু। দুর্নীতি আমাদের দেশের উন্নয়নকে খেয়ে ফেলছে। দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন কোনো কাজে আসবে না।

সত্যিই তাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছেন। দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো ‘স্বপ্নের প্রকল্প’ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাংককে বলে দিতে পারে, তোমাদের সহায়তা ছাড়াই আমরা চলতে পারি।

হ্যাঁ। তাইতো! এখন আর বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার জন্য অর্থমন্ত্রীকে দাতাগোষ্ঠীর কাছে ধরনা দিতে হয় না। পাগলের মতো ছুটতে হয় না প্যারিস বৈঠকে। এখন আর আমরা আগের মতো দাতাদের কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকে নেই। আগামী পাঁচ বছর যদি বর্তমানের উন্নয়নের গতি অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আট ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ডাবল ডিজিটে চলে যেতে পারে। ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির আরেকটি সম্ভাবনার জায়গা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল। পদ্মা সেতু উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেড় শতাংশ বেড়ে যাওয়ার কথা।

এর পরও আমরা শঙ্কিত। কেন শঙ্কিত? এর একমাত্র কারণ দুর্নীতির করাল গ্রাস। প্রশাসনের তৃণমূল থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সংগত কারণেই নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখা দোষের নয়। তাই বলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কেন অবাস্তব স্বপ্ন দেখবে! সব কিছু বিকিয়ে দিয়ে নীতি-নৈতিকতা ধুলোয় মিশিয়ে বড়লোক হতে হবে কেন?

আমার মনে হয়, এখানে আমাদের সরকার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কাজ করার রয়েছে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই রাজনীতিতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি করে বিরিয়ানি খাওয়ার চেয়ে সৎ উপার্জনে নুন-ভাত খাওয়া ভালো। এ বক্তব্য সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক। প্রধানমন্ত্রীকেই দুর্নীতির লাগামটা টানতে হবে।

আমরা মনে করি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শহর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত হওয়া জরুরি এবং সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতির যেসব খবর বেরিয়ে আসছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। সরকারি কেনাকাটায় এখন সাগরচুরির ঘটনা ঘটছে। সংগত কারণেই প্রধানমন্ত্রী নিজের দলের লোকদের পাকড়াও করছেন। এরই মধ্যে অনেকে আটক হয়েছে। আরো অনেকের তালিকা দুদক ও এনবিআরে দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও অচিরেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।

আমি মনে করি, শুধু অভিযান দিয়ে হবে না। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমাদের পরিশুদ্ধ হতে হবে। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আমাদের রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী পরিশুদ্ধ হলে দেশে কোনো দুর্নীতি থাকবে না। আর দুর্নীতি রোধ করা গেলে অনেক অন্যায়-অনিয়ম এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। দেশ থেকে অন্যায়-অনাচার দূর করার জন্য আগে পুলিশ বাহিনীকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে যা যা করণীয় তা সরকারকেই করতে হবে।

কোনো মানুষ নৈতিকভাবে অসৎ হলে অন্যায়-অপকর্ম সে করবেই। তাকে অনৈতিক কাজ থেকে ফেরাতে হলে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা নিতে হবে। দেশের প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা যদি প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁরা ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় আহার করবেন না, লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ জোগাবেন না, উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ হলে তাকে বয়কট করবেন, তাহলে কিন্তু অনেক কিছু ঠিক হয়ে যায়। দুর্নীতিবাজকে সমাজ থেকে যদি বয়কট করা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই একজন অসৎ লোকও ভালো হওয়ার শপথ নেবে। সব কিছু সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। নৈতিকতার জায়গাগুলো নিজেদেরই ঠিক করতে হবে।

পাত্রীর মা-বাবাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি দুর্নীতিবাজ ছেলের হাতে তাঁর কন্যাকে তুলে দেবেন, নাকি একটি সৎ ও কর্মঠ ছেলের হাতে? আবার বিবাহের উপযুক্ত মেয়েটিকেও সে রকমভাবেই চিন্তা করতে হবে। মেয়েটি যদি সিদ্ধান্ত নেয়, সে কোনো ঘুষখোর ছেলেকে বিয়ে করবে না, তাহলে কিন্তু ছেলেটি ঘুষখোর হলেও অভ্যাস বদলাতে বাধ্য থাকবে। এখনো আমরা আশাবাদী। নিশ্চয়ই এই দেশ থেকে দুর্নীতি চিরতরে বিদায় হবে। একটা সুন্দর, সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে উঠবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা