kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

কী করবেন উদ্ধব

জয়ন্ত ঘোষাল

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কী করবেন উদ্ধব

২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি গোটা দেশে মুক্তি পায় একটি হিন্দি ছবি, ছবিটির নাম ঠাকরে। ছবিটির পরিবেশক ছিলেন সঞ্জয় রাউত। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের সরকার গঠনের অতি নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের বিতর্কিত শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। উদ্ধব ঠাকরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর যে সঞ্জয় রাউত আজ শিবসেনার দৈনিক মুখপত্র সামনার সম্পাদক। মহারাষ্ট্র বিধানসভায় উদ্ধব ঠাকরে ১৬৯ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিলেন গত ৩০ নভেম্বর। সেদিনই ছবিটি দেখলাম নেটফ্লিক্সে। বাল ঠাকরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী। পরিচালক অভিজিৎ পানসের ছবিটি শুরুই হচ্ছে আদালতে কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান বালাসাহেব। অভিযুক্ত তিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য। অভিযোগ, মারাঠি অস্মিতার নামে ১০ দিনের গুণ্ডামির জন্য। ছবিটির শুরু সেখানে হলেও এরপর শুরু হচ্ছে ফ্ল্যাশব্যাক। ১৯৬৯ সালে ফ্রি প্রেস জার্নাল কার্টুনিস্ট মুম্বাই নিবাসী মারাঠি সাংবাদিক বাল ঠাকরে কিভাবে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এক নতুন জীবন শুরু করলেন। নতুন ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করলেন, তখন তাঁর মনের মধ্যে টগবগ করে ফুটছে মারাঠি মানুষ। দক্ষিণ ভারত, পাঞ্জাব, রাজস্থান, আর গুজরাটের মানুষ মুম্বাই দখল করছে আর মারাঠিরা বেকার, তারা চায়ের দোকানে কাপ ধোয়ার জন্য। ছবিতে দেখাচ্ছে মারাঠি মানুষের বেকারত্ব দূর করার জন্য বিদ্রোহের ডাক দিচ্ছেন বালাসাহেব। তাই শিবসেনা নামের দলটির উদ্ভব। কিন্তু হিন্দুত্বর জন্য নয়। সংগঠনের শুরু মারাঠি স্বার্থ রক্ষার জন্য। ছত্রপতি মহারাজ শিবাজির নামে শিব সৈনিকদের দল। বাল ঠাকরের বাবাও ছিলেন তাঁর পাশে। প্রতীক হলো বাঘ। অনেকের অভিযোগ হলো, মারাঠি স্বার্থ রক্ষার নামে বালাসাহেব গুণ্ডাগর্দি করছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন জয় মহারাষ্ট্র স্লোগানের দ্রষ্টা।

আজ এত বছর পর যখন পরিবারের কোনো সদস্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, কিং মেকার যিনি হতেন বারবার, দশকের পর দশক, আজ ২০১৯ সালে তিনিই হয়ে গেলেন কিং। প্রথমে শুধু পুর নির্বাচনে অংশ নেন, আর আজ বিধানসভায় বালাসাহেবের পুত্র হলেন মুখিয়া। তাঁর পুত্র আদিত্যও আজ এমএলএ।

১৯৮৯ সালে প্রমোদ মহাজন মধ্যস্থতায় বাজপেয়ি জামানায় বিজেপির শরিক হলো শিবসেনা। সেদিন থেকে আঞ্চলিক মারাঠি আঞ্চলিকতাবাদের প্রতিভূ শিবসেনা হয়ে উঠল হিন্দুত্ববাদী পার্টি। আজ উদ্ধব মুখ্যমন্ত্রী হলেন সেই বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ শরিকি সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে। আবার তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলেন কংগ্রেস ও শারদ পাওয়ারের এনসিপির সমর্থন নিয়ে। কংগ্রেস ও এনসিপি ধর্মনিরপেক্ষ দল বলে দাবি করে। সরকারের স্থায়িত্ব রক্ষার জন্য জোট ধর্ম পালনের জন্য এখন কমন মিনিমাম প্রগ্রাম (অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি) তৈরি হয়েছে। সেই ঘোষিত পত্রে শিবসেনাকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতে হয়েছে। অর্থাৎ বাজপেয়ি যেমন তাঁর পাঁচ বছরে বিজেপির কোর অ্যাজেন্ডা রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা অনুচ্ছেদ বাতিল—তিনটি বিষয়কেই শিকেয় তুলে রাজত্ব করেন জোট ধর্ম রক্ষা করে। আজ উদ্ধবও রামমন্দির ও এ বিষয়গুলোকে একইভাবে ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে রাজ্যের উন্নয়ন ও প্রশাসনিকতায় মন দেবেন। কাজটা সহজ নয়। তবে কি শিবসেনাও এক নতুন শিবসেনা হতে চাইছে? বালাসাহেব ও উদ্ধবের মধ্যেও অনেক পার্থক্য। বালাসাহেব সাংঘাতিক রাগী ছিলেন, উদ্ধব তা নন। কিন্তু তিনি সুসংগঠক। বাবা যতটা আক্রমণাত্মক ‘সরকার’ ছিলেন, ছিলেন প্রায় গডফাদারের মতো, উদ্ধব তা নন। এখন তো উদ্ধবের পুত্র আদিত্য ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, আধুনিক, ব্যক্তিগতভাবে খুবই কসমোপলিটন এবং ধর্মনিরপেক্ষ।

আরো দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এবার মহারাষ্ট্র নির্বাচনে ও তারপর সরকার গঠনের সময়ও মারাঠি অস্মিতা প্রতিটি আঞ্চলিক দলগুলোকে একত্র করে রেখেছে। তামিলনাড়ুতেও তামিল স্বার্থে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে মিলিত হয় না কখনো। আর তাই তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক দল দুটির মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র। সর্বদাই দিল্লির ওপর কোনো একটি দল নির্ভরশীল। পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক বিরোধ, মতাদর্শগত বিরোধ এত তীব্র যে আমরা বাঙালিরা কখনোই বিকশিত হতে পারিনি। তৃণমূল কংগ্রেস আঞ্চলিক দল হলেও এখনো কখনোই বাঙালির এথনিক ফ্যাক্টের ওপর ১০০ শতাংশ নির্ভর রাজনীতি করে না। রাজ্যের সামাজিক মনস্তত্ত্বই আলাদা।

আর তাই শুরু থেকেই বালাসাহেবের সঙ্গে শারদ পাওয়ারের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। ষাটের দশকে যখন বাল ঠাকরে একটি মারাঠি সংবাদপত্র শুরু করার পরিকল্পনা নেন, তখন তাঁর পার্টনার ছিলেন পাওয়ার। ঠাকরের বোন ঠাকরের বাড়িতে পাওয়ারের সঙ্গে বসে পত্রিকার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পত্রিকাটি প্রকাশের পর চলেনি এবং দুই পক্ষই পত্রিকাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। শারদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া যখন প্রথম রাজ্যসভার সদস্য হন, তখন শিবসেনাও তাঁকে সমর্থন করে। পাওয়ার তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বালাসাহেব নিজে ফোন করে পাওয়ারকে বলেন, ‘ওকে কত ছোট দেখেছি। আর এখন ও রাজ্যসভার সদস্য হতে চলেছে, ওকে আমার শিবসেনা থেকে সমর্থন করব।’ পাওয়ার তাঁকে প্রশ্ন করেন, বিজেপি কি আপনার এ কথা মানবে? ওরা তো চটে যাবে। ওরা তো আপনার শরিক। জবাবে বালাসাহেব বলেন, পদ্মফুলকে (পদ্মফুল বিজেপির প্রতীক) নিয়ে ভেব না। কমল বাইকে আমি যা বলব তা-ই শুনবেন। বালাসাহেব চলে গেলেও এই সম্পর্কটা অটুট থেকে গেছে। শিবসেনার কাণ্ডারি বুঝতে উদ্ধবও বুঝতে পারছেন সময় অনেক বদলে গেছে। মহারাষ্ট্রের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী যশোবন্ত রাও চবনও নয়, দিল্লিতে মোরারজি দেশাই উপপ্রধানমন্ত্রী এমন এক পরিস্থিতিও আজ নয়। সেই বেকারত্ব, সেই উগ্র আঞ্চলিকতা, সেই মারাঠি বিচ্ছিন্নতা আজ কোথায়? আজ গোটা দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এক অত্যাবশ্যকীয় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত নয়, সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দুই পক্ষেই। সেই সারকারিয়া কমিশনের দিন তো আজ নয়, যখন সেই কমিশনের সুপারিশের প্রয়োগের মাধ্যমে রাজ্যের ক্ষমতা বাড়ানোর আন্দোলন চালাচ্ছিল কংগ্রেসবিরোধী সব তৎকালীন বিরোধী দল। তাই শিবসেনাও গুণ্ডাগর্দির দলের ভাবমূর্তি বদলে এক নতুন শিবসেনা গড়তে চাইছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, কাজটা কতটা সম্ভব? দ্বিতীয়ত, উদ্ধব সত্যি সত্যিই কি সেটা করতে চাইছেন? শপথ গ্রহণের সময় উদ্ধব কিন্তু শিব সৈনিকের গৈরিক পোশাক পরেই মঞ্চে আসেন এবং ভুলে গেলে চলবে না এ মঞ্চ থেকেই বালাসাহেব তাঁর শিবসেনার যাত্রা শুরু করেন। লালকৃষ্ণ আদভানি করাচি গিয়ে জিন্নাহকে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে দলের সভাপতির পদ খুইয়েছিলেন। বিজেপিকে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ পথে নিয়ে যেতে গিয়ে নিজের হাতে তৈরি অনুগামী ও আরএসএস তথা সংঘ পরিবারের বিদ্রোহ সামলাতে পারেননি তিনি। এক প্রবীণ সাংবাদিক আদভানির ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলেছিলেন, বিড়াল যদি বলে মাছ খাব না, তবে নেভের ট্রাস্ট দ্যাট ক্যাট। অমিত শাহ পাল্টা রণকৌশল রচনা করছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনছেন সংসদে শিগগিরই। এনসিপি কংগ্রেস বিরোধিতা করলেও শিবসেনা কী করবে? বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে যে শিবসেনা ছিল সবচেয়ে সোচ্চার দল, সেই দল কি আজ জোট ধর্মের জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেই কোর ইস্যুকে ভুলে গেছে? উদ্ধব নিজেও এই কঠিন প্রতিকূলতা জানেন। তিনিও সাবধানে এগোতে চাইবেন। আপাতত তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে উঠা প্রশ্নে রাগতস্বরে পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন, এই ধর্মনিরপেক্ষতা কাকে বলে?

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা