kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

সড়কে শৃঙ্খলা কি উপেক্ষিতই থেকে যাবে?

জয়া ফারহানা

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সড়কে শৃঙ্খলা কি উপেক্ষিতই থেকে যাবে?

প্রতিদিন আমাদের সকাল শুরু হয় মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে। কেননা কোনো দিনই পত্রিকা ছাপা হয় না সড়ক দুর্ঘটনার খবর ছাড়া। দিন তো শুরু করি পত্রিকা পড়া দিয়েই। হাইওয়েতে ভুল দিক থেকে যানবাহন আসছে এমন একটি দৃশ্য সভ্য দেশে কল্পনা করাও যেখানে অসম্ভব আমাদের দেশে সেটা নির্মম বাস্তবতা। দুই বাসের পাল্লাপাল্লি বলুন আর ইগো ক্লাসই বলুন, তাদের চাপায় প্রাণ হারায় তো আমাদের স্বজন-প্রিয়জন। ভাঙাচোরা বাস-ট্রাক ফুটপাতে থাকা খাবারের ওপর যে ধোঁয়া-ধুলা ছড়িয়ে যায় তা আমরাই খাই। আবার এও ঠিক আমরা বেশির ভাগ নাগরিক রাস্তা পারাপারে জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করতে অনভ্যস্ত। এ প্রসঙ্গ তুললে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হবে আদৌ জেব্রাক্রসিংগুলো ঠিকঠাক আছে কি না। আর কারণে-অকারণে, কখনো সময় বাঁচাতে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারের পরিবর্তে তার নিচ দিয়ে রাস্তা পার হইনি—এমন দাবিই বা আমরা কয়জন করতে পারি। ভুল জায়গায় ইউটার্ন নিতে গিয়ে দুর্ঘটনা কোনো দিন ঘটে না? হেডফোন কানে অন্যমনস্ক পথচারীর মৃত্যুও আমাদের চোখে সয়ে গেছে। সিগন্যাল, এই বস্তু কত দিন থেকে সড়ক সংস্কৃতি থেকে উধাও, তা মনে করাও মুশকিল। যে গাড়িচালক তাঁর ব্রেক, লাইট মেরামত করেন না তাঁর হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার কারণে যে পেছনের যেকোনো গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়তে পারে তা ভাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না তিনি। গাড়িতে বাম্পার লাগানো বেআইনি, তার পরও এমন কোনো গাড়ি সড়কে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাতে বাম্পার লাগানো নেই। এতে প্রমাণ হয় গাড়িমালিকের কাছে অন্যের প্রাণের চেয়ে নিজের গাড়ির মূল্যই বেশি। বাইপাসে সাঁই সাঁই বেগে হঠাৎ ব্রেক কষলে পেছনের গাড়িচালকের পক্ষে বোঝা মুশকিল আর সামনের সিটেরজনের বাঁচাও মুশকিল। সন্ধ্যার আবছায়া কিংবা কুয়াশাপূর্ণ রাস্তায় আলো ছাড়া সাইকেল বা ভ্যান ভুল দিক থেকে যাওয়ার যে বিপদ থাকেই, সংশ্লিষ্ট চালকদের উদাসীনতার কাছে তা নস্যি। সড়কে নৈরাজ্যের জন্য দায় তাই কোনো চালকের চেয়ে কোনো চালকের কম নয়। সব মিলিয়ে সড়কে নামলে মনে হয় জীবনকে উড়িয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্যই যেন যানবাহন চালকরা সড়কে নামেন। মনে হয় না জীবন উদ্যাপনের যোগ্য। মনে হয় তা শুধু যাপনীয় এক বিষয়। যাত্রীদের জীবনও খুব মূল্যবান কিছু নয় তাদের কাছে। যেনতেনভাবে চালালেও কোনো রকম বাঁচিয়ে ফিরে আনা যাবে। আর যদি দু-একটা হাত-পা, কোমর, হাঁটু ভাঙে, চোখ যায়, তাতেই বা এমনকি এলো-গেলো। বাঁচানোর জন্য মাথার ওপরে পরিবহন নেতারা তো আছেনই। ইউরোপ-আমেরিকার চিত্র ঠিক বিপরীত। ধরে নিচ্ছি শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানে-মানে, বিদ্যায়-বৈভবে, ভোগে-উপভোগে জীবন তাদের কাছে মহামূল্যবান। জীবন উপভোগে বহু কিছুই হয়তো আমাদের নেই কিন্তু তা বলে নিজেদের জীবনের এতটুকু মূল্য কি নেই আমাদের? বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিথিলতম সড়ক আইন দেখে অন্তত তা-ই মনে হয়। আমাদেরও যে বাঁচতে ইচ্ছে করে, পরিবহন নেতারা কি তা মানেন? মনে হয় না। না হলে সড়ক নিরাপত্তায় ন্যূনতম কোনো আইন পাস এবং তা কার্যকর করার কোনো সম্ভাবনা দেখা দিলেই কেন তাঁরা ধর্মঘট ডেকে বসেন? আমাদের সড়ক সংস্কৃতির বিচিত্র দৃশ্য নজর করলে বিস্ময় না মেনে উপায় নেই। কোনো পরিকল্পনা না মেনে নগরায়ণ হওয়ায় বাণিজ্যিক ভবনের অধিকাংশের নেই পার্কিং লট। ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডওয়ালা গাড়ি দেখলে তা উল্টো দিক থেকে চললেও ট্রাফিক ছেড়ে দেয়। দুই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই শহরে আছে প্রচুর ঘিঞ্জি সড়ক। সোজা সড়কের সংখ্যা কম। থেকে থেকেই বাঁক নিয়েছে রাস্তা। তার ওপর আমরা অধিকাংশই জানি না ট্রাফিক আইন। তার জন্য প্রতিদিন জীবন দিয়ে মাসুল দিতে হচ্ছে আমাদেরই। কিন্তু চালকের দোষে আমাদের প্রাণ যাচ্ছে তার মাসুল কি চালকরা দিচ্ছেন? কোনো আইন দিয়েই তো তাঁদের ধরা যায় না। এবারের সড়ক নিরাপত্তা আইনেও তাদের বাঁচিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট ফাঁকফোকর আছে। তার পরও ধর্মঘট। মনে হয় তাঁরা সব আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে চান। দীর্ঘদিন আইন না মেনে, মানুষ মেরে তার শাস্তি না পেয়ে তাঁরা ধরে নিয়েছেন এটাই আইন। অগণিত অসংখ্য সড়ক নৈরাজ্যকে কিছুটা স্থিতি দিতেই পাস হয়েছে সড়ক নিরাপত্তা আইন। বলা দরকার সড়কে যে পরিমাণ বিশৃঙ্খলা আইনটি সেই অনুপাতে বরং কমই কঠিন। তবু এই মোলায়েম আইনটি পর্যন্ত মানতে চাইছেন না সড়ক মাফিয়ারা। পরিবহন ধর্মঘটের আড়ালে যে পরিবহন নেতারাই ছিলেন সেটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার দরকার পড়ে না। এই পরিবহন নেতারাই আবার সরকারের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নিকট অতীতে বহু সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন। মানুষের ক্ষোভ জমতে জমতে এমন হয়েছে যে আপাত দৃষ্টিতে রাস্তায় তুচ্ছ কোনো কারণেও লোকে গাড়ি ভাঙচুর করে। পরিবহন নেতাদের নিরঙ্কুশ দম্ভে জনগণ বিরক্ত। সড়কে তাঁদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাচ্চা ছেলে-মেয়েরাও আন্দোলনে নেমে গিয়েছিল। কতটা নিরুপায় হয়ে তারা নেমেছিল ভাবুন।

দুই.

তবে কি শিষ্টের দমন দুষ্টের পালনই প্রতিষ্ঠা হবে শেষ পর্যন্ত? এই সত্যই প্রতিষ্ঠা হবে, আইন সড়ক মাফিয়াদের স্পর্শ করতে অপারগ? এই বেপরোয়া ‘হিরোরা’ যাঁরা আসলে ভিলেন, প্রতিদিন যাঁরা কারো না কারো প্রাণ কেড়ে নিচ্ছেন, কোনোভাবেই তাঁদের আইনের আওতায় আনা যাবে না? ব্যবস্থা নিতে গেলেই জনগণকে জিম্মি করে ধর্মঘট ডেকে বসবেন? কার্বন ছড়ানো বেহাল যানবাহনগুলো দূষণ ছড়াতেই থাকবে? ‘আমরা জনগণের পাশে আছি’—এমন আশ্বাস দেওয়ার মতো কোনো পরিবহন নেতা নেই? আন্ত নগর পরিবহনগুলো থেকে ন্যূনতম পরিষেবা পাই না। অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখি না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আমাদের থেকে ভালো অবস্থায় আছে। পাশের রাষ্ট্রের রাজধানী দিল্লিতে রাস্তায় কী পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি চলবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। তাতে তাদের রাস্তার হাল অনেকটা ফিরেছে। ঢাকা এখন দূষিত বাতাসে দিল্লিকে ছাড়িয়ে গেছে। আর নিরুপায় আমরা বাতাসের সঙ্গে অবলীলায় টেনে নিচ্ছি সালফার, নাইট্রোজেন, কার্বন। সদিচ্ছা থাকলে যে রাস্তার হাল ফেরানো সম্ভব, তার প্রমাণ রেখেছে চীনও। ২০১৭ থেকে ২০১৮ মাত্র এক বছরে চীনের বড় বড় শহরগুলোয় গড় পিএম ২.৫, কণাগুলোর মাত্রা ১২ শতাংশ নামিয়ে এনেছে। জাতীয় নির্মল বাতাস প্রকল্পে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছে চীন। বিষয়টিকে যত তুচ্ছ ভাবছেন, এত তুচ্ছ নয় মোটেও। ল্যান্ডসেট প্ল্যানেটেরি হেলথ নামক পরিবেশ সংগঠন গ্রিনপিস এবং আইকিউ এয়ার-এয়ার ভিজ্যুয়াল সংস্থা যৌথভাবে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুস ও শ্বাসক্রিয়া-সংক্রান্ত রোগ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ দূষিত বাতাস। এমন দিনের আশা কি আমরা করতে পারি না যেদিন জনপরিবহনগুলো জনবান্ধব হয়ে উঠবে? সড়কগুলো অন্তহীন অবসন্নতার পরিবর্তে আনন্দময় যাত্রার সঙ্গী হয়ে হয়ে উঠবে? বিমানবন্দরে নেমেই পর্যটকদের যে অভিযোগ—ঢাকা এক অপরিচ্ছন্ন, নোংরা এবং পর্যটকের প্রতি তোয়াক্কাবিহীন শহর, সেই অপবাদ থেকেই বা মুক্তি মিলবে কবে?

লেখক : কথাশিল্পী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা