kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

কাঁদিয়ে ছাড়ল পেঁয়াজ!

মোফাজ্জল করিম

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



কাঁদিয়ে ছাড়ল পেঁয়াজ!

সুখবর! সুখবর! সুখবর! পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। ২৫০ টাকা কেজির পেঁয়াজ আজ (১৯.১১.১৯) ২০০ টাকায় নেমে এসেছে। ‘আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে!’ গত ক’দিনে কী ভেল্কিটাই না দেখাল এই পুঁচকে সব্জিটা। আলু-পটোল-কপি-শিমের মতো সব্জি পদবাচ্য কোনো সব্জি নয়, হলুদ-মরিচ-জিরার মত আদি ও অকৃত্রিম মসলা ক্যাটাগরিতেও ফেলা যায় না একে, আবার তাকে কেটে-কুটে যেমন সালাদে দিয়ে সালাদের মান-গুণ বাড়ানো যায়, তেমনি ছেঁচে-পিষে অন্যান্য মসলার সঙ্গে মিশিয়ে প্রায় সব তরকারিতেই তাকে না দিলে কোনো তরকারিরই স্বাদ ঠিক খোলে না। কাজেই মসলা না বলে একটু প্রমোশন দিয়ে তাকে সব্জির কাতারে বসানো যেতে পারে। পাশ্চাত্যের দেশে ওটাই তার পরিচয়। ওরা তো আবার ঝোল-টোল বলতে গেলে খায়ই না, তাদের খাবারের তালিকায় প্রথমেই থাকে সালাদ, যেখানে পেঁয়াজের কুচির উপস্থিতি অনিবার্য। আর আমাদের মাছ-মাংসের রান্না তো পেঁয়াজ ছাড়া মুখেই দেওয়া যায় না। বিশেষ করে মাংস। ওদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রে বোধ করি পেঁয়াজভক্ষণ নিষিদ্ধ করে গেছেন মুনি-ঋষিরা। ফলে এককালে আমাদের দেশেও কুলীন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পেঁয়াজ খেতেন না, পেঁয়াজকে দুর্গন্ধযুক্ত একটি নিকৃষ্ট শ্রেণীর সব্জি বা মসলা মনে করতেন। পেঁয়াজ খেলে রক্ত গরম হয়, মাথা গরম হয়—এরকম মনে করতেন তাঁরা। কেউ পেঁয়াজ খায় শুনলে রীতিমত আঁতকে উঠতেন। এখন অবশ্য দিনকাল পাল্টে গেছে। এখন তো মনে হয় পূর্বপুরুষদের না খাওয়াটা পুষিয়ে নিতে যার যার কোটা দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়িয়ে এই বস্তুটি ভক্ষণ করছেন তাঁরা। নইলে আমাদের প্রতিবেশীদের সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দেবে কেন, আর তাঁরা বিনা নোটিশে আচমকা বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেবেনই বা কেন।

কুলীন সমাজে সেকালে পেঁয়াজ খাওয়া নিয়ে যে গল্পটা প্রচলিত ছিল, এখনো সব সমাজে তা চালু আছে। পাঠক আপনিও নিশ্চয়ই জানেন গল্পটা। তবু আপনার প্রখর স্মরণশক্তিটাকে একটু চাগিয়ে দেই। এক কুলীন পাত্রের শিক্ষাদীক্ষা, আদবকায়দা, বহুবিধ গুণাবলির কথা শোনার পর পাত্রীর পিতা ঘটকমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তা ছেলের কোনো বদভ্যাস-টদভ্যাস নেই তো? জবাবে ঘটক বললেন, না না কর্তা, কোনো খারাপ অভ্যাস নেই ছেলেটির। তবে ওই একটু-আধটু পেঁয়াজের দোষ যে আছে এটা আমি না বললে অধর্ম হবে। ‘এ্যাঁ, কী বললেন? ছেলে পেঁয়াজ খায়?’ কর্তাবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ‘না, সব সময় খায় না,’ ঘটক বললেন, ‘শুধু মাঝে মাঝে যেদিন পেঁয়াজ দিয়ে গো-মাংসের কাবাব খায়, পান-টান করে...।’ ‘গো-মাংস? মদ্যপান? রাম, রাম! কী বলছেন এসব?’ কর্তার বুঝি এবার হার্ট অ্যাটাক হয়। ঘটকমশাই দ্রুত তাঁকে আশ্বস্ত করলেন : না না, কর্তাবাবু, ওটা তো রোজ না। কেবল যেদিন বন্ধুবান্ধবসহ মেয়েছেলে নিয়ে একটু ফুর্তি-ফার্তি করে আর কি।... এরপর কর্তাবাবুর পতন ও মূর্ছা। তাঁর মূর্ছাভঙ্গ হয়েছিল কি না জানা যায়নি, তবে সেই থেকে ‘একটু পেঁয়াজের দোষ’ প্রবচনটি বাংলা ভাষায় রীতিমত জেঁকে বসে আছে।

বাংলাদেশের গরিব নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষ কিন্তু ‘পেঁয়াজের দোষে’ দুষ্ট নন—ওসব বিলাসিতার সময় ও সামর্থ্য কোনোটাই তাদের নেই—তারা কাতর বোধ করেন যখন পেঁয়াজ হঠাৎ হঠাৎ দুষ্টুমি শুরু করে। তুই বাপু গতকালও ২৫ টাকা ৩০ টাকা কেজি দরে আমাদের পলিথিনের ব্যাগ আলোকিত করলি, আর রাতে যখনই শুনলি প্রতিবেশী বন্ধু আচমকা তোর রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, অমনি তুই এক লাফে পরদিন সকালে তোর দাম বাড়িয়ে ৫০/৬০ টাকায় নিয়ে গেলি। এটা কী ধরনের ভদ্রতা? আর তা-ও যদি ওখানে থেমে থাকতি, তা না, তুই চৌকা-ছক্কার ফুলঝুরি ছুটিয়ে এক দিনের মধ্যে ‘সেঞ্চুরি’ করে বসলি। একেবারে ক্রিজে গিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই সেঞ্চুরি! আর আমাদের তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানরা যখন রাজকোটে-ইন্দোরে নাকানি-চুবানি খেয়ে দুই অঙ্কের কোঠা ছোঁয়ার আগেই ড্রেসিং (ওয়াশ?) রুমে যাওয়ার অত্যাবশ্যকীয়তা অনুভব করতে শুরু করে, তখন তুই কিনা ‘হেলায় লঙ্কা (বাংলা) করিল জয়’-এর মত দুই দিনেই ‘ডবল সেঞ্চুরি’ (২৫০ নট আউট!) করে বসলি। এটা কি আমাদের ব্যাটসম্যানদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য? কিন্তু ব্যাপারটা তো বাপু সেই ঝি-কে মেরে বৌকে শিক্ষা দেওয়ার মতো হয়ে গেলো। তুই তো আবহাওয়া অফিসের বিপদসঙ্কেতের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে এক নম্বর থেকে দশ নম্বর মহাবিপদসঙ্কেতে চলে গেলি, কিন্তু এদিকে যে কোটি কোটি কুঁড়েঘরবাসীর চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেল, সে কথা তো ভাবলি না। তারা এখন কেজি বা এক শ গ্রাম নয়, ওটা এখন দুঃস্বপ্ন—এক হালি অথবা একটা পেঁয়াজ কিনে সেটা খুব সাবধানে পকেটে নিয়ে বাড়ি যায়, পাছে সেই অমূল্য সম্পদ পকেটমার হয়ে যায়। আর কিছুদিন এভাবে চললে তাদের সোনামণিরা কাগজে রঙ পেনসিল দিয়ে পেঁয়াজের ছবি এঁকে চুলার ওপর দেয়ালে, রান্নাঘরে, খাওয়ার ঘরে সেঁটে দিত, নিচে ক্যাপশন দিত : মা, পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করার মহামূল্যবান যুগান্তকারী পরামর্শ গ্রহণ করো এবং এটা দেখে দেখে রাঁধতে থাকো, দেখবে কী দারুণ স্বাদ হয় তরকারিতে।

আর প্রতিবেশী জানী দোস্তেরই বা এ কেমন ব্যাভার (ওই অঞ্চলে ব্যবহার শব্দটার কথ্যরূপ)। বলা নেই কওয়া নেই, দুম করে রপ্তানি দিল বন্ধ করে। কেন বাপু, জানোই তো পেঁয়াজের ব্যাপারে আমরা আমদানিনির্ভর। এবং সেই আমদানির প্রায় পুরোটাই আসে তোমাদের দেশ থেকে। বুঝলাম, তোমাদের নিজেদের চাহিদাই এবার মিটবে না এবং সে কারণেই তোমরা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছ। কিন্তু এমনটি যে করবে, তা আগে একটু জানাবে না বন্ধুকে? বন্ধু বলে কথা। আমরা তো আর কোথাও না গিয়ে তোমাদের কাছ থেকে আনব বলে প্রচুর এলসি খুলে বসে আছি। এখন তো দেখছি আমাদের সেই ‘আগে জানলে তোর ভাঙ্গা নৌকায় উঠতাম না’ অবস্থা।

আর আমাদের কর্তা ব্যক্তিদেরও বলি। আপনারা একটু চোখ-কান খোলা রেখে চলবেন না? এসেছেন এই ভবের হাটে সওদা করতে, এখানে আপনার নিজের হিসাব তো নিজেকেই রাখতে হবে। আমাদের কত পেঁয়াজ লাগবে, ভারতের নিজেদের চাহিদা কত, তাদের এবার অন্যান্য বারের মত পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত হবে, না ঘাটতি হবে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করার মত উদ্বৃত্ত পণ্য তাদের হাতে থাকবে কি না, এসব হিসাব-কিতাব আপনারা না করে ধরে নিয়েছেন ভারত পেঁয়াজের বড় খাদক তাদের বন্ধুকে না খাইয়ে পেঁয়াজ মুখে দেবে না। এখন বুঝুন ঠ্যালা। শুধু কথায় চিঁড়া ভিজলেও ভিজতে পারে; কিন্তু ‘কালই এসে যাচ্ছে পেঁয়াজ’, ‘চেক-ইন্ করে বোর্ডিং পাস নিয়ে পেঁয়াজ প্লেনে উঠে পড়েছে, আপনারা আপনাদের বুয়াদের বলুন পাটা-পুতাইল নিয়ে পেঁয়াজ পেষার জন্য রেডি হতে,’ ‘পেঁয়াজের যত সিন্ডিকেট-সিনেট আছে, তাদের সব ক’টিকে ধরে রিমান্ডে নিয়ে ডলা দেবো’—এসব কথায় পেঁয়াজের এক ফোঁটা রসও যে বেরোবে না তা আপনারা জানেন, আর আপনাদের চেয়ে বেশি জানে দেশবাসী। কেন, ভারতের অসামর্থ্যের বিষয়টি আগে-ভাগে জেনে নিয়ে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে চুক্তি করলে এখনকার এই ‘ফায়ার ফাইটিং’-এর কাজটা কি আরও সহজ হতো না? এখন যে দশ গুণ বেশি পরিবহন খরচ দিয়ে প্লেনে করে পেঁয়াজকে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দিয়ে আনতে হলো, বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিতে হলো, এটার তো দরকার ছিল না। সময়মত পদক্ষেপ নিয়ে জাহাজে করে কম খরচে আনলে এত ঝক্কি-ঝামেলা হতো না, প্রচুর পাবলিক মানিও সাশ্রয় হতো। পেঁয়াজের কারণে এত টেনশনও হতো না। সবচেয়ে বড় কথা, রক্ষচোষা ড্রাকুলারা সিন্ডিকেট করে তিরিশ টাকায় কেনা পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় বিক্রি করার সুযোগ পেত না। এই ডিজিটাল জমানায়ও যদি আমরা না জানি কোন দেশে এবার পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত, কোন দেশে ঘাটতি, কোন দেশে দাম কত ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য এবং সেই মোতাবেক যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেই, তবে কবে জানব, কবে ব্যবস্থা নেব? পুরো বিষয়টি তো ম্যানেজমেন্টের, আর সে জন্য আছে পাবলিকের টাকায় পরিচালিত মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কর্পোরেশন, আছেন মন্ত্রী, সাংসদ, কর্মকর্তা, কর্মচারী। তাঁরা তো আছেন জনগণের সুখ-দুঃখ দেখার জন্য, নাকি?

ধান-চাল-মাছ-শাকসব্জি সব কিছুতে মাশাল্লাহ এককালের তলাবিহীন ঝুড়ি দুর্ভিক্ষের দেশ যদি উদ্বৃত্ত হতে পারে, তা হলে বেচারা পেঁয়াজ-রসুন-আদা কী দোষ করল। মাটির নিচে থাকে বলে কি তারা অস্পৃশ্য-অশুচি? তারা কি নমশূদ্র সম্প্রদায়ের লোক যে তাদের ছোঁয়া লাগলে, তাদের হাতে কিছু খেলে কুলীনের জাত যাবে? তা হলে শুনুন। পেঁয়াজ না হলেও তার ‘কাজিন’ রসুন সম্বন্ধে আমাদের কুলাউড়ার গ্রামাঞ্চলে একটা মজার শ্লোক আছে : ‘মাটির তলে থাকে বুড়ি/ত্যানা (ন্যাকড়া) পিন্দে উড়ি উড়ি (টুকরি টুকরি)/নাই নাপিত, নাই ধোপা/তও (তবুও) বেটি সাফসফা।’ (আসলে রসুন শস্যকুলের মেমসাব!) সে যাই হোক। পেঁয়াজ-রসুন-আদার যে উৎপাদন সঙ্কট, তার সমাধান তো চিরকাল বিদেশ থেকে আমদানির ওপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা যায় না। বসে থাকলে এবারকার মতো ঝাঁকুনি খেতে হবে সমানে, আর মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে চিঁড়া ভেজানোর হাস্যকর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সেই সঙ্গে কখনো কখনো কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো অমৃতবাণী ও ছেলে ভোলানো ছড়া শোনাতে হবে তাদের, যাদের মনে করা হয় রজকপাড়ার রাসভকুল। আমি জানি, আমাদের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউশন (বারি) বিভিন্ন ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছে। তারা কি এই অবহেলিত কৃষিপণ্যগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু করতে পারে না? আর সরকারও তো এসব পণ্যের ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষককে বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দিতে পারে।

আরেকটি বিষয়। সব সময় দেখা যায়, যেসব দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, আমলা, নেতা-ফেতা এ ধরনের অপকর্ম করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা বানিয়ে ফেলে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে থাকে। ভাবটা এমন, এবার বাছাধনদের ‘ক্রসফায়ারে’ দিয়ে ছাড়ব। দেশের লোক মনে করে, এবার নিশ্চয়ই একটা কিছু হবে, যদিও দুষ্কৃতকারীরা আড়ালে গোঁফে তা দিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে ওই ব্যাপারে কেউ আর রা-টিও কাড়ে না।...আমরা ধরে নিতে পারি, এবারও তার ব্যত্যয় হবে না। কিছুদিন পর যখন রমজান মাস আসবে এবং পেঁয়াজ, আদা, ভোজ্য তেল, বেগুন ইত্যাদির চাহিদা বাড়বে, তখন শুরু থেকেই সরকারের পুকুম-পাকুম, তর্জন-গর্জন শুনব আমরা, তারপর তেলের মধ্যে বেগুনির ঝাঁ ঝাঁ শব্দ কমে গেলে যা হয় তাই হবে। অর্থাৎ নো মোর ঝাঁ ঝাঁ, নো অ্যাকশন।

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার একটা উদাহরণ দেই। পেঁয়াজের কেজি যখন ১৫০ টাকা, মন্ত্রী মহোদয় তখন বলেন, দাম সহনীয় পর্যায়ে আছে। হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে আমি একমত। সহনীয় বটে, তবে এটা সহনীয় তাদের জন্য, যাদের চামড়া গণ্ডারের। গণ্ডারের গায়ে ছুরি-বল্লম-গুলি কিছুই লাগে না। আর সহনীয় মন্ত্রীপাড়া, গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডিওয়ালাদের জন্য। তাদের বাড়িতে রোজ পাঁচ হাজার টাকার বাজার হয়, না পঁচিশ হাজার টাকার, নাকি বাজার করার দরকারই লাগে না, এসব খবরও তাদের রাখতে হয় না। তবে বাংলাদেশ নামক দেশটি বোধ হয় কেবল ওইসব সুপার অভিজাত এলাকাবাসী এবং ক্যাসিনো সম্রাট, শেয়ার মার্কেট ধ্বংসকারী, ব্যাংক লুটেরা, সুইস ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের নিবাসই নয়, এরা তো মোট জনসংখ্যার শতকরা কুল্লে পাঁচজন, এখানে সমান সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বাস করে বাকি ৯৫ জন, পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকাকে কেউ সহনীয় বললে পেঁয়াজের ঝাঁজ ছাড়াই যাদের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে। ১৫০ টাকা কেজি সহনীয় পর্যায়! এটাকেই বোধ হয় বলে নির্মম রসিকতা।

মুশকিল হয়েছে, এ দেশে এমন লোক অনেক আছেন, যাদের কাছে পেঁয়াজ ৫০০ টাকা এবং চাল ১০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও কিছু যায় আসে না। এরাই আবার দেশের ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা। সাধারণ মানুষ কেমন আছে, কী খাচ্ছে, কী পরছে—এসব তুচ্ছ ব্যাপারে নষ্ট করার মত সময় তাদের হাতে নেই।

আজকে একটা নির্মম সত্য কথা বলি আপনাদের। আমি গত প্রায় ৩০ বছর ধরে অর্থাৎ যখন সরকারি চাকরি করতাম তখন থেকেই, নিয়মিত বাজার করি কাওরানবাজার, ধানমণ্ডি ঈদগাহ মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বস্থ ফুটপাতের সকালবেলার কাঁচাবাজার ও কখনো কখনো মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে। এই ৩০ বছরে, বিশ্বাস করুন, কোনো দিন কোনো মন্ত্রী তো দূরের কথা, সচিব বা অন্য কোনো পদস্থ আমলাকে বাজার করতে দেখিনি। প্রায়ই আমি বাসে চড়ে সিলেট যাই। আগে ট্রেনের শোভন শ্রেণীতেও ভ্রমণ করেছি কখনো কখনো। কোনো দিন কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার বা সচিব পর্যায়ের কাউকে সহযাত্রী হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তা হলে বলুন এই নমস্য ব্যক্তিরা বাজারের খবর, বাসের খবর, ট্রেনের খবর, রাস্তার খবর পাবেন কী করে? হ্যাঁ, পান। তাঁরা যে তবক দেওয়া মনগড়া ‘সব ঠিক হ্যায়’, ‘কী সুন্দর’ মার্কা খবর জানতে চান, তাই তাঁরা পান চামচাদের মুখে এবং সুলিখিত প্রতিবেদনে। স্যাররা, দোহাই আপনাদের, পরের মুখে ঝাল খাওয়া বাদ দিয়ে একবার নিজের মুখে খেয়ে দেখুন তরকারিতে পেঁয়াজ-রসুন-আদা-মরিচ-নুন ঠিক আছে কি না। প্রশাসনে আত্মতুষ্টি, আত্মশ্লাঘা ও তেলবাজির মত মারাত্মক ব্যাধিকে দৃঢ়হস্তে দমন করে সুপারভিশন, মনিটরিং, ইন্সপেকশন ইত্যাদি জোরদার করুন, দেখবেন সব চোর-চোট্টা, ফাঁকিবাজ, তেলবাজ লাঙ্গুল গুটিয়ে পালিয়েছে।

২.

শেষ করার আগে বলি, বাজারে চাল, সব্জিসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের যে অকস্মাৎ উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে না আনলে সীমিত আয়ের মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষ কিন্তু দ্রব্যমূল্যের চাপে চিঁড়াচ্যাপ্টা হয়ে যাবে। আমরা কেউই নিশ্চয়ই সেটা চাই না।

পেঁয়াজ নিয়ে কথকতায় পেঁয়াজের ঝাঁজ ও পেঁয়াজ কাটতে যে অনিচ্ছাকৃত অশ্রুপাত হয়, সে ব্যাপারে একটি টোটকা (চুটকি নয়) দিয়ে শেষ করি। বহুকাল আগে ইংরেজি ভাষায় লেখা একটি জ্ঞানকোষে পড়েছিলাম কী করে এই বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যায়। পেঁয়াজ কাটার সময় পেঁয়াজটিকে ঠাণ্ডা পানিতে চুবিয়ে রেখে কাটুন, দেখবেন এর ঝাঁজ আপনার চোখে লেগে আপনাকে কাঁদাতে পারবে না। এটাই সেই টোটকা।... পরীক্ষা প্রার্থনীয়। বিফলে মূল্য ফেরত।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা