kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

গুজব যখন বিপদের কারণ

রেজানুর রহমান

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুজব যখন বিপদের কারণ

রাষ্ট্র বড়, নাকি সংগঠন বড়? এ প্রশ্নের উত্তরে হয়তো সবাই বলবেন রাষ্ট্রের কথা। রাষ্ট্রই তো বড়। রাষ্ট্রের ছায়াতলেই না সংগঠন গড়ে ওঠে। কাজেই রাষ্ট্র যে বড়—এ কথা তো বলার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। আচ্ছা, ধরে নিলাম রাষ্ট্রই বড়। তাহলে রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটা তো আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব, নাকি? কিন্তু আমরা কি রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তই অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি? পরিবহন সেক্টরের কথাই ধরা যাক। কে না জানে এ দেশের পরিবহন সেক্টর কতটা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত? আপনি কোনো দেশে গেলে তার পরিবহনব্যবস্থা দেখেই বুঝে নিতে পারবেন দেশটি কেমন? দেশটি আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর কতটা আস্থাশীল। উন্নত দেশে শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় বাস ও ট্রেনে টিকিট যাচাই করার জন্য বাড়তি কোনো লোকের প্রয়োজন পড়ে না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে বাস অথবা ট্রেনে উঠার সময় নির্ধারিত মেশিনে টিকিটটি ছোঁয়াবেন। ব্যস, আপনার দায়িত্ব শেষ। এরপর নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারবেন নির্ধারিত গন্তব্যে। শুধু উন্নত দেশই নয়, উন্নয়নশীল বেশির ভাগ দেশে পরিবহন সেক্টর একটি নির্ধারিত আইনের ওপর চলে। কে ধনী, কে গরিব সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো নির্ধারিত আইন। কোনো কারণে আইন ভেঙেছেন তো জরিমানাসহ শাস্তি অবধারিত। সে জন্য কেউ হরতাল, অবরোধ, রাস্তায় ভাঙচুরের কর্মসূচি দেয় না। কারণ তারা জানে, আইন না মানলে রাষ্ট্র তার গতি হারাবে। আর রাষ্ট্র গতি হারালে রাষ্ট্রের জনগণ বিপদে পড়বে।

আমাদের দেশে ঘটছে তার উল্টোটা। রাষ্ট্র একটি আইন জারি করার পরপরই অনেকেই শুরু করে দেয় তার বিরোধিতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্বিমত প্রকাশে সবারই অধিকার আছে। কিন্তু সেটা হতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়েই। সড়ক ব্যবস্থায় বিদ্যমান দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে রাষ্ট্র নতুন কিছু আইন জারি করেছে। দেশের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। কিন্তু সড়ক ব্যবস্থায় জড়িত কিছু পরিবহন সংগঠন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পরিবহন সেক্টরকে অস্থির করে তুলতে চাইছে। এক অর্থে সংগঠনগুলো রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ভাবটা এমন—আমরা তোমার আইন মানি না; বরং আমরা যা বলব সেটাই আইন।

প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন, ব্যাপারটা কতটা অ্যালারমিং। রাষ্ট্রের আইন মানতে বিরোধিতা। যদি এমন হতো যে রাষ্ট্র অযৌক্তিক কিছু আইন জারি করেছে। কাজেই অযৌক্তিক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার যুক্তি আছে। কিন্তু সড়ক ব্যবস্থার নতুন আইন সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। পরিবহন সেক্টরে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের দেশপ্রেমিক নেতাকর্মীও এই নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছেন। তা সত্ত্বেও দেশের বিশেষ কিছু এলাকায় পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এ ঘটনায় বিশেষ মহলের উসকানি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। কালের কণ্ঠেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন সামনে। এ কারণে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কেউ কেউ। নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে...

শাজাহান খানের বক্তব্যে ‘উসকানি’ শব্দটিই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে যা-ই বলি না কেন, এ কথা তো সত্য, দেশ বর্তমান সময়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় স্বগৌরবে এগিয়ে চলেছে। কাজেই দেশকে ভালোবেসে সবারই উচিত সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু কার্যত আমরা কি সবাই সে কাজটি করছি? পেঁয়াজ নিয়ে দেশে যা ঘটে গেল তা সত্যি উদ্বেগজনক। এমন তো নয় দেশে পেঁয়াজ ছিল না। অসাধু মজুদদাররা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পেঁয়াজ মজুদ করে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল। যে মুহূর্তে দেশের সাধারণ মানুষ ৪০-৫০ টাকার পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় কিনতে বাধ্য হয়েছিল, সেই মুহূর্তে দেশের কোথাও কোথাও আড়তদারদের মজুদ করা পেঁয়াজ পচেছে। পচা পেঁয়াজ গোপনে রাস্তায়, নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে দেশের সাধারণ মানুষ। পেঁয়াজ নিয়ে অহেতুক সংকট সৃষ্টির ঘটনায় যারা জড়িত, তারা এক অর্থে দেশের শত্রু। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এই চক্রকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। তা না হলে এই অপরাধীচক্র আবারও নতুন করে ষড়যন্ত্রের পথ খুঁজতে শুরু করতে পারে। ষড়যন্ত্র না করতে পারলে হয়তো ‘উসকানি’দাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

পেঁয়াজের সংকট কাটতে না কাটতেই ‘লবণ’ নিয়ে একটা ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছিল একটি মহল। ভাগ্য ভালো, তাত্ক্ষণিকভাবেই এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছে সরকার। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এবার ‘চাল’ নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হতে পারে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতুকপূর্ণ ইঙ্গিত ছড়ানো হচ্ছে। রান্নায় পেঁয়াজ না হলেও চলে। কিন্তু লবণ না হলে রান্না হবে না। আর যদি চাল দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তো জনজীবনে নাভিশ্বাস শুরু হয়ে যাবে। আমাদের বিশ্বাস, রাষ্ট্র এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে। সেই সঙ্গে আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তাদেরও বোধ করি এই মুহূর্তে সচেতন ভূমিকা জরুরি। এই যে লবণ নিয়ে হঠাৎ একটা গুজব ছড়িয়ে গেল, আর সেই গুজবে আমরা কানও দিলাম। এটা কি বুদ্ধিমানের মতো কোনো কাজ হয়েছে? কেউ যদি বলে, আপনার কান চিলে নিয়ে গেছে, তাহলে তো আপনি আগে আপনার কান আছে কি না তা-ই দেখবেন। নাকি কোনো কিছু যাচাই না করেই চিলের পেছন ছুটতে শুরু করবেন? যদিও এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি দায় আছে। কে বা কারা হঠাৎ করেই ফেসবুকে খবর ছড়িয়ে দেয় যে পেঁয়াজের পরে এবার লবণের দাম বাড়বে। ব্যস, মানুষের মাঝে তৈরি হয় নতুন টেনশন। যার এক কেজি লবণেই হয়তো এক মাস যায়, সে কিনে নিয়ে আসে ১০ কেজি লবণ! ভবিষ্যতে যে এ ধরনের গুজব তৈরি হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কাজেই গুজব সৃষ্টিকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। এই যে পরিবহন সেক্টরে একটা অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এ নিয়েও যাতে কেউ গুজব তৈরি করতে না পারে, সে ব্যাপারে আগাম সতর্কতা প্রয়োজন।

লেখক : কথাসাহিত্যক, নাট্যকার

সম্পাদক আনন্দ আলো

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা