kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

বাংলা বন্ডকে স্বাগত

ড. আতিউর রহমান

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



বাংলা বন্ডকে স্বাগত

গত ১১ নভেম্বর লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা ডিনোমিনেটেড’ ‘বাংলা বন্ড’ তালিকাভুক্ত হয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও (সাড়ে ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিশ্ববাজারে টাকার এই শুভাগমন স্বাগত জানাই। মূলত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আইএফসি এই বন্ড ইস্যু করেছে। তাদের ট্রিপলে রেটিংয়ের সুবাদে সহজেই লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা বন্ড চালু করা গেছে। এই বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে তোলা অর্থ বাংলাদেশের একটি বড় করপোরেট হাউস তার পরিচালন ও বিপণন ব্যবস্থায় উন্নয়নে ব্যয় করবে। তিন বছর মেয়াদি এই বন্ডের সুদের হার ধরা হয়েছে ৯.৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ট্রেজারি বন্ডের সুদ বেড়ে না গেলে হয়তো এই হার আরেকটু কম রাখা যেত। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে এই বন্ডের বার্ষিক সুদের হার ধরা হয়েছে ৬.৩ শতাংশ। বাকি ৩.৪৫ শতাংশ আইএফসি ডিফল্ট ও বিনিময় হার ওঠা-নামা বাবদ ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য মার্জিন হিসেবে নিয়েছে। আইএফসি এই ঝুঁকি নেওয়ায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তাকে এ বাবদ কোনো ঝুঁকিই নিতে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর অতি উত্তম রেটিংকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের ভালো করপোরেটগুলোকে এভাবে টাকায় সিঙ্গল ডিজিটে ঋণ দেওয়ার জন্য বিদেশের পুঁজি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের এ ধরনের আর্থিক টুল ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে একটি অভিনব উদ্যোগ। এর ফলে আমাদের দেশের চলমান তারল্য সংকট খানিকটা হলেও মোকাবেলা করা সম্ভব।

একটা নতুন পথ তো খুলল। আমাদের রপ্তানিমুখী করপোরেটগুলো এখন ব্যাংক থেকে ডাবল ডিজিটে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা ও মার্কেটিং করছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি সন্তোষজনক না থাকায় তাদের পক্ষে কম সুদে এসব উদ্যোক্তাকে সময় ও পরিমাণমতো অর্থ জোগান দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্যই হয়ে গেছে। এ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকারদের মধ্যে প্রায়ই খটমটের খবর গণমাধ্যমে দেখতে পাই। বাজারের জোগান ও চাহিদার দিকে নজর না দিয়ে এমন চাপাচাপির পরিণতি যে আখেরে কারো জন্যই ভালো হচ্ছে না, তা-ও মনে হয় সংশ্লিষ্টজন পুরোপুরি বুঝতে পারছেন বলে মনে হয় না। এমন হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতিতে আইএফসির এই নয়া উদ্যোগকে তাই স্বাগত জানাতেই হয়।

আমার স্পষ্টতই মনে আছে, ২০১৫ সালে আমরা এমন একটি টাকা বন্ড ছাড়ার জন্য আইএফসির সঙ্গে দেনদরবার শুরু করি। সে সময়কার বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের বিদেশি ঋণ সম্পর্কিত যাচাই কমিটির সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছিলাম। ওই কমিটি থেকেই আমরা ওই প্রস্তাবটি অনুমোদন দিই। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এই অনুমোদন সমর্থন করে। এত বছর পরে হলেও শেষমেশ যে এই বন্ডটি চালু করা গেল, তাতে আমরা খুবই খুশি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আরো ৩০০ মিলিয়ন ডলারের অনুরূপ বন্ড চালু করার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। আইএফসি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে কাজ করছে। ২০১৩ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে আইএফসির সহায়তায় ভারতের ১০০ মিলিয়ন ডলারের ‘মাসালা বন্ড’ চালু হওয়ার খবরে উৎসাহিত হয়েই আমরা তখন এমন বন্ড বাংলাদেশেও চালু করার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছিলাম। ভারতের ওই ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বন্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অ্যাসেট ম্যানেজার, ব্যাংক ও পেনশন ফান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লুফে নেয়। তার কারণ এই বন্ডের ‘ইল্ড’ বেশি। এই সাফল্য বিদেশের বাজারে আরো বেশি রুপি বন্ড চালু করার উৎসাহ জোগায়। এভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে ‘রুপি বন্ড’ সম্প্রসারিত হয়। রুপির সম্ভাব্য আন্তর্জাতিকীকরণে ভারতের এই উদ্যোগ যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকট এবং পরবর্তীকালে (২০১৩) ফেডের সুদ বাড়ানোর আগ্রহে ভারতীয় রুপির মূল্যমান হঠাৎ খুবই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের মাত্র তিন মাসেই ভারতীয় রুপির ১৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটে। ফলে যাঁরা বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ডলার মূল্যে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের সুদের হার এক লাফে আরো ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। অথচ যাঁরা আইএফসি সম্পর্কিত রুপি মূল্যের ‘মাসালা বন্ড’-এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তাঁদের কোনো ঝুঁকির মুখেই পড়তে হয়নি। আর সে জন্যই আমরা ‘টাকা বন্ড’ চালুর আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। তবে আইএফসি বাংলাদেশের টাকার ওপর বাজি ধরতে এক দিনেই এগিয়ে আসেনি। এর জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আমার মনে আছে, আইএফসির নতুন বাংলাদেশ প্রতিনিধি মি. কায়েল ২০০৯ সালের মাঝামাঝি আমার সঙ্গে গভর্নর দপ্তরে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ভারতে আইএফসির বিনিয়োগ কয়েক বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশে তা মাত্র ১০০ মিলিয়নের সামান্য বেশি। অথচ বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতি বেশ স্থিতিশীল। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দিন দিনই বাড়ছে। টাকা-ডলার মূল্যমান স্থিতিশীল। তাঁরা কেন বাংলাদেশে আরো বেশি এফডিআই নিয়ে আসছেন না? তাঁকে বলেছিলাম, আপনার দায়িত্ব পালনকালেই এর পরিমাণ এক বিলিয়নের বেশি দেখতে চাই। বলতে ভালো লাগছে তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। বাংলাদেশে ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস, রপ্তানিমুখী শিল্প, জ্বালানি খাতসহ নানা খাতে আইএফসি বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের ‘ইকুইটি’ কিনেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের মাত্রা বেড়েছে। তাঁর আমলেই এই বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলারের বেঞ্চমার্ক ছাড়িয়ে যায়। আইএফসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহেই আমরা বাংলাদেশের সভারেন রেটিং করাতে এগিয়ে আসি। শুরুতে এসঅ্যান্ডপি ও মুর্ডিস এই রেটিং করলেও পরবর্তী সময়ে ‘ফিচ’ও যুক্ত হয়। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এই রেটিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দিয়েছিল, তবু এ কথা বলতেই হয়, অর্থ মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে একমত না হলেও এটা সম্ভব ছিল না। সবার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ প্রথম বছরেই ‘এথ্রি’ পজিটিভ রেটিং পেয়ে যায় এবং আজ অবধি তা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতির সূচকগুলো কতটা শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। আর বিশ্বমানের রেটিং এজেন্সিগুলোর এই আশাব্যঞ্জক রেটিংয়ের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আস্থা বেড়েছে। ফলে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশে এফডিআই আসছে। আইএফসির উত্তরোত্তর বিনিয়োগ বৃদ্ধিও তাদের আস্থা বাড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে টাকা মূল্যের এই ‘বাংলা বন্ড’-এর শুভযাত্রা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য এক সন্তুষ্টির সংবাদ। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী তাই যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের টাকাকে লন্ডনে স্বাগত জানাচ্ছি’ তখন নিশ্চয় আমাদের ম্যাক্রো অর্থনীতির বিস্ময়কর রূপান্তরেরই স্বীকৃতিই তিনি তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে আমাদের টাকার এই অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে অদূরভবিষ্যতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এভাবেই ভারতের ‘মাসালা বন্ড’ অথবা চীনের ‘ডিম-সাম বন্ড’ বিশ্ব অর্থবাজার এই দুই শক্তিশালী অর্থনীতির মুদ্রা যোগ্য প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই দৌড়ে এবার বাংলাদেশের টাকাও যোগ দিল।

অস্বীকার করার তো উপায় নেই যে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে প্রবৃদ্ধির গতিময়তার দিক থেকে শুধু এশিয়া কেন, সারা বিশ্বেই সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এই ধারা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের বিনিয়োগের হার অন্তত সব মিলে জিডিপির আরো ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার আরো বেশি বাড়াতে হবেই। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ হার এখন জিডিপির ২৩ শতাংশ। বেশ কয়েক বছর ধরেই এই হার এখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই হারকে অন্তত ২৮ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ তা ৩০ শতাংশের পক্ষে। বিশ্ব আর্থিক মন্দার ওই গনগনে দিনগুলোতে ভালো উদ্যোক্তাদের আমরা বিদেশ থেকে ৫ শতাংশের কম সুদে অর্থ জোগাড় করে দিতে পেরেছিলাম বলেই প্রবৃদ্ধির দৌড়ে আমরা এগিয়ে যেতে পেরেছিলাম। এর প্রভাব দেশের ভেতরে সুদের হার কমানোর ওপর পড়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ছাড় দিয়ে ইডিপি (এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) সাত বছরে ১০ গুণ বাড়িয়ে ২.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছিল। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বব্যাংক থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, নিজেদের তহবিল থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ এবং এডিবি ও জাইকার কাছ থেকে এসএমই উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পুঁজি সমাবেশ করে বাংলাদেশের শিল্পয়ানকে যথেষ্ট সহায়তা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সেসবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমরা এখন বাংলাদেশের গতিময় প্রবৃদ্ধির হারে প্রতিফলিত হতে দেখতে পাচ্ছি।

তবে আমাদের এই সাফল্যে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। এখনো আমাদের অর্থায়নের চাহিদা প্রচুর। অবকাঠামো, শিল্পায়ন, নির্মাণ, গৃহায়ণ এবং নগরায়ণ সম্পর্কিত আধুনিক সব সেবার জন্য চাই বিপুল পমিরাণের অর্থ। আর এসব খাত থেকে আমরা যে রাজস্ব পাই তা কিন্তু টাকায়ই পাই। এসব খাত বিদেশ থেকে ডলার বা অন্য কোনো বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নিতেই পারে। কিন্তু টাকা ও বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের ঝুঁকি কিভাবে তারা সামলাবে? আমরা স্বদেশে ‘হেজিং’ ব্যবস্থা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। তাই আইএফসির মতো সংস্থার সহযোগিতায় নয়া আর্থিক প্রডাক্ট তৈরি করা গেলে মন্দ কী। আর সেই কারণেই ‘বাংলা বন্ড’ আজকের দিনে গুরুত্ব বহন করে। ভালো কম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দিলে বিদেশের স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে এভাবে নিশ্চয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বাজে কম্পানিরা যেন এই সুযোগ না পায়। অবশ্য আইএফসির মতো বন্ড ইস্যুয়াররা যাচাই-বাছাই করেই এমন বন্ড চালু করবে। আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো বন্ড বাজার থেকে বিশেষ বিশেষ প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহে উৎসাহী হতেই পারে।

চীন ও অন্যান্য অনেক দেশেই স্থানীয় সরকারগুলো স্থানীয় বন্ড বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। আমাদের এক্ষুনি বড় আকারে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য তাই চাই সবুজ অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ লক্ষ্যে কয়েকটি তহবিল চালু করেছে। তবে ইডকল চাইলে নিশ্চয় সবুজ বন্ডও চালু করে রিনিউয়েবল জ্বালানি ও অন্যান্য টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। সে জন্য আমাদের সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পৃথিবীজুড়েই সামাজিক দায়বদ্ধ অর্থায়নের কৌশল হিসেবে ‘পানি বন্ড’, ‘সোলার বন্ড’সহ নানামাত্রিক সবুজ বন্ড চালু হতে দেখছি। আমরা কেন এখনো হাত গুটিয়ে বসে আছি। অবশ্য সে জন্য আমাদের সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট মঞ্চ থাকতে হবে।

আমরা এমন সময় অর্থায়নের এই আলাপ করছি যখন আমাদের ব্যবসায়ীরা আগামী বছরগুলোতে বাড়তি বিনিয়োগ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা টেকসই বিনিয়োগেও তাঁদের আগ্রহ প্রকাশ করে চলেছেন। এইচএসবিসি তার সর্বশেষ ‘নেভিগেটর রিপোর্টে’ বলেছে যে জরিপে অংশ নেওয়া ১৯৩ জন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ৯৭ শতাংশই জানিয়েছেন যে তাঁরা আগামী বছর তাঁদের ব্যবসায় সম্প্রারণে আগ্রহী। বাংলাদেশের গতিময় অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের সম্ভাবনার আলোকেই তাঁরা এ আস্থার কথা জানিয়েছেন। মনে রাখা চাই, বাংলাদেশের এই হার এশিয়ার ৭৭ শতাংশ ও বিশ্বের ৭৯ শতাংশের চেয়ে ঢের বেশি। সারা বিশ্বের ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাংলাদেশে ব্যবসায় বাড়বে বলে জরিপে দেওয়া তথ্য প্রদানকারীরা আশা করেন। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হবে ১৫ শতাংশ বলে তাঁদের ধারণা। গত বছরের চেয়ে এ বছর বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় আস্থা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর ব্যবসায় ভালো হবে বলে ব্যবসায়ীদের ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন। তার কারণ বাংলাদেশের অবস্থান গতিময় এশীয় প্রবৃদ্ধি ত্রিভুজের ঠিক মধ্যখানে। তা ছাড়া বিশ্ববাজারের সঙ্গে খুবই দ্রুত তাল মেলানোর এক অসাধারণ সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা শ্রেণি। এই জরিপ আরো বলছে যে উত্তরদাতাদের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই মনে করেন যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের ফলেই তাঁরা এই সুফল পাচ্ছেন। আর এশিয়াই হবে তাদের (৮৩%) নয়া বাণিজ্য ভূমি। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এশীয় বাণিজ্য অংশীদার হচ্ছে চীন (৪৩%)। এরপর জাপান (৩৬%)। তারপর ভারত (২৭%)। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য দ্রুতলয়ে বাড়ছে। মালয়েশিয়া এই দৌড়ে জাপানের কাছে হেরে যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির সঙ্গে গত এক বছরে বাংলাদেশে বাণিজ্য অর্ধেকে নেমে এসেছে। তার মানে, আমরা আমাদের আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে মনোযোগী হয়েছি।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে আমাদের উদ্যমী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজে ব্যবসা করার শর্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য মূল্যে সহজ শর্তে পুঁজি সংগ্রহের সুযোগ করে দিতে হবে।

আর সে প্রেক্ষাপটেই হালে চালু করা ‘বাংলা বন্ড’ এবং সম্ভাব্য দেশীয় সবুজ বন্ডসহ সক্রিয় প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি বন্ড বাজার চালু করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেই টেকসই অর্থায়নের দিকে আমাদের মনোযোগ আরো বাড়াতে হবে। সে জন্য নীতিনির্ধারক, রেগুলেটর, উদ্যোক্তা ও আর্থিক খাতের স্টেকহোল্ডারদের সুদূরপ্রসারী অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থায় শামিল হতে হবে। হাতে হাত রেখে ক্যারাভানের মতো এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা