kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

চুয়াত্তরের চক্রান্ত দুই হাজার উনিশে

ড. এম এ মাননান

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চুয়াত্তরের চক্রান্ত দুই হাজার উনিশে

বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে হয়নি, হয়েছিল খাদ্যসামগ্রীর সুষম বণ্টনের অভাবে। বিদেশ থেকে প্রচুর খাদ্য আমদানি করেছিল বঙ্গবন্ধু সরকার; কিন্তু চাল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ইত্যাদি চলে গিয়েছিল মাটির তলার গুদামে। তৈরি করা হয়েছিল কৃত্রিম সংকট। এ কাজটি করা হয়েছিল অত্যন্ত দক্ষতা ও চতুরতার সঙ্গে, যাতে জনসাধারণ বুঝতেই না পারে কোথা থেকে কী হচ্ছে। উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের নবগঠিত সরকারকে, যে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, যিনি বিধ্বস্ত দেশটিকে পুনর্গঠন করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, বেকায়দায় ফেলা। যারা দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল তারা সফল হয়েছে। মনুষ্যসৃষ্ট এ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। মার্চের দিকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল দুর্ভিক্ষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষের কথা বাবা-চাচার মুখে শুনেছি, বইপত্রেও পড়েছি। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত সে দুর্ভিক্ষ ছিল পুরো বাংলায় (পূর্ব ও পশ্চিম) বিধ্বংসী আকাল। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের কালজয়ী লেখা থেকে জানতে পারি, সে দুর্ভিক্ষটাও সংঘটিত হয়েছিল খাদ্যের অভাবে নয়, কিছু দেশপ্রেমহীন অর্থলোভী মানুষের মানবতাবিবর্জিত কর্মকাণ্ডের কারণে। তারা সংঘবদ্ধভাবে সিন্ডিকেট বানিয়ে খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে বাজারে অল্প অল্প করে ছেড়ে মানুষকে নাকাল করে ছেড়েছে, হাজার হাজার লোক না খেয়ে মরেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে চুয়াত্তর সালেও এমনটি হয়েছিল। ঘটনার খলনায়করা একই ধরনের মনোবৃত্তিসম্পন্ন। লোভী, অর্থগৃধ্নু। এরা ছিল মূলত স্বাধীনতাবিরোধীদের একটি চক্র। ষড়যন্ত্র করে ঘটিয়েছিল দুর্ভিক্ষ। অতি সংগোপনে পরিচালিত পরিকল্পিত সরকারবিরোধী এ চক্রান্তে জড়িত ছিল অনেক রাঘব বোয়াল, যা পরবর্তীকালে আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ পাকিস্তানপন্থী আরো অনেকে বঙ্গবন্ধু সরকারের পতন ঘটানোর জন্য খাদ্যসামগ্রী মজুদ করে, কখনো কখনো রাতের আঁধারে নদীতে ফেলে দিয়ে খাদ্যসংকট তৈরি করে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য দেশের ভেতরে থাকা সত্ত্বেও দেখা দেয় আকাল। দেশের মানুষজনকে ক্ষিপ্ত করে তোলার জন্য এ দুর্ভিক্ষ ছিল একটি বিশাল অস্ত্র।

২০১৯ সালের শেষ দিকে এসে আবারও শুরু হয়েছে চুয়াত্তরের মতো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এবার প্রথমে নাটক সাজানো হয়েছে ভোলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির অপচেষ্টা দিয়ে। এরপর শুরু ‘পেঁয়াজ সন্ত্রাস’। দুই মাস ধরে বাড়াতে বাড়াতে নভেম্বরের মাঝামাঝি এসে প্রতি কেজি ৩০ টাকায় কেনা (কালের কণ্ঠ, ১৮ নভেম্বর ২০১৯) পেঁয়াজের দাম উঠিয়ে দিয়েছে শহরে ২৫০ এবং গ্রামাঞ্চলে ২৮০ টাকায়। মসলাপ্রিয় বাঙালিদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির চহিদা সব সময় তুঙ্গে। তাই জেনে-বুঝে জনগণকে খেপিয়ে তুলে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়ে আনার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত এই পেঁয়াজ সন্ত্রাস। কেউ হয়তো বলবেন, পেঁয়াজের সরবরাহ কম, তাই দাম বেড়েছে; ডিমান্ড-সাপ্লাই সূত্র এখানে কাজ করছে বলে দাবি করবেন। এতে আমি পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করব না। কিন্তু অবশ্যই বলব, সাপ্লাইটা এত বেশি কম কিসে? পত্রিকার খবর থেকে যা জানতে পারি, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ এসেছে এবং আসছে। দেশের ভেতরেও প্রচুর পেঁয়াজ মজুদ আছে। বাজারে দোকানে দোকানে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারি মোকামে কেন তেলেসমাতি ঘটছে? ওখানে কারা সক্রিয়? খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা কেন বস্তা বস্তা পেঁয়াজ পচিয়ে নদীতে ফেলে দিচ্ছে? সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পচানো পেঁয়াজ ভাগাড়ে আর রাস্তায় ক্রেতাদের পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে হুড়াহুড়ি, মারামারি। গুদামে কেন রেখে দেওয়া হচ্ছে এত বেশি মজুদ, কেন পচে যাচ্ছে গুদামেই? কেন বাজারে ছাড়ছে না? ষড়যন্ত্রের গন্ধ তো এখানেই। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ঘুরে ঘুরে সারা দেশে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ অতি কৌশলে। ঘরে ঘরে মানুষ যেন ক্ষিপ্ত হয়, বদদোয়া দিতে থাকে সরকারকে, মূলত শেখ হাসিনাকে। কারণ শেখ হাসিনা তো বঙ্গবন্ধুরই কন্যা। বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে উনিশ শ চুয়াত্তরে, তাঁর কন্যাকেও ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে ২০১৯ সালে। চুয়াত্তরের কুশীলবদেরই এরা বংশধর, যারা পেঁয়াজকাণ্ড ঘটাচ্ছে।

কয়েক দিন ধরে হঠাৎই শুরু হয়েছে অন্য একটি ষড়যন্ত্র; এটি হলো পেঁয়াজ সন্ত্রাসের পাশাপাশি চালের দাম বাড়ানোর খেলা। নতুন ধান ওঠার মৌসুম শুরু হবে কয়েক দিন পরই। একটি টিভির খবরে দেখলাম, মিল মালিকরা ধান গুদামজাত করে রেখে দিয়েছে আর এ কারণে চালের দাম বাড়তির দিকে। অনেক সিন্ডিকেট এখন চালকলগুলোতে। মজুদ করছে তারা ধান-চাল। পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান-চাল মজুদ থাকা সত্ত্বেও গতকাল পর্যন্তও চালের দাম অনবরত বাড়তির দিকে। খাদ্যমন্ত্রীও বলেছেন, ‘সর্বকালের সর্বোচ্চ চাল মজুদ রয়েছে।’ কৃষি বিভাগও দাবি করছে, কুষ্টিয়াসহ সব চালের মিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান আর চাল মজুদ থাকা সত্ত্বেও দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, হঠাৎ করে চালের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কোনো কিছু থাকতে পারে না। যারা সিন্ডিকেট করে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, তারা শুধু সরকারকেই হেনস্তা করার অপচেষ্টায় লিপ্ত নয়, দেশের জনগণকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় আছে। বিষয়টিকে হালকাভাবে পণ্যের ঘাটতি মনে করে নেওয়া একেবারেই ঠিক হবে না। অসৎ ব্যবসায়ীরা কৌশলে কাজ করছে আর প্রচার করছে দেশে পেঁয়াজ আর চালের ঘাটতি; তাই দাম বেড়ে গেছে। বিষয়টা ঠিক নয়। প্রচুর পেঁয়াজ আর চাল বাজারে। কেনা দামের সঙ্গে যুক্তিসংগত মুনাফা যোগ করে বিক্রি করতে সমস্যা কোথায়? তারা তো কেনা দামের রসিদ পর্যন্ত বাজার তদারককারীদের দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করছে। এর পেছনে দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পারে? সরকারের কোনো উদ্যোগের প্রতি তারা কোনো প্রকার সম্মানই দেখাচ্ছে না—সহযোগিতা তো দূরের কথা। ফেব্রুয়ারি মাসে যে পেঁয়াজ কিনতে লাগত ২০ টাকা প্রতি কেজি, তা ২৫০ টাকার ওপরে উঠে গেল কেন? এমনটি কিন্তু ২০১৭ সালেও হয়েছিল। সে বছরও সরকারকে বিব্রত করা হয়েছিল পেঁয়াজের কেজি প্রায় দেড় শ টাকায় উঠিয়ে। বিভিন্ন সেক্টরে সিন্ডিকেটগুলো অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা না হলে তা নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।  সুযোগ বুঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে ষড়যন্ত্রকারীরা।

মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে চলছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন দিয়ে এতে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সুযোগ পেলে ঘৃতাহুতি দেওয়ার লোকের অভাব এ দেশেও হবে না; অন্য কোনো দেশকেও তারা কাজে লাগাতে পারে। চলছে নীরব ষড়যন্ত্র। দেশবাসী দেখেছে কিভাবে অতি সম্প্রতি ভোলায় ঘটানো হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা; রেলে একাধিক দুর্ঘটনা; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা। সব কিছু মিলিয়ে একাত্তর-পরবর্তী সময়ে যেভাবে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র হয়েছে, ঠিক প্রায় একইভাবে তাদেরই উত্তরসূরিরা এমন ক্ষেত্রগুলো বেছে নিচ্ছে যেখানে জনগণ প্রতিক্রিয়া দেখায় বেশি এবং নাখোশ হয় সহজে। একটি বিরোধী দল তো পেঁয়াজ-চালের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসে বিক্ষোভের ডাকও দিয়েছে। অল্প কিছুতেই হাঁকডাক করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তো অনেকেই মুখিয়ে থাকে। তাদের হাতে দাবার ঘুঁটি কেন তুলে দিতে হবে? দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা সুযোগ খুঁজছে ছোবল মারার। এদের সঙ্গে হয়তো যোগ দেবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যারা ধরা খেয়েছে তারা এবং তাদের সাগরেদরা। এদের স্বার্থহানি হয়েছে; সুতরাং তারা চুপ করে বসে থাকবে এমনটি মনে করার কোনো হেতু নেই। তাদের সবার লক্ষ্য হবে শেখ হাসিনার সরকারকে বেকায়দায় ফেলা, সরকারের সাফল্যকে ম্লান করা এবং অগ্রগতির ধারাকে পিছিয়ে দেওয়া। ভুলে গেলে চলবে না যে তারা সংগঠিত অপশক্তি। তারা সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন চায় না, ডেল্টা প্ল্যানের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ চেহারা পাল্টে দেওয়ার পরিকল্পনা পছন্দ করে না। গ্রামে শহরের সযোগ-সুবিধা তৈরি করে সারা দেশের সব নাগরিকের উন্নয়নের সুফল সমানভাবে ভোগ করার সুযোগ বিনষ্ট করতে তারা সদা উদগ্রীব। তারা জনগণের ভালো কখনো চায়নি, এখনো চায় না, তারা চাইবে যেকোনো প্রকারে পঁচাত্তরের মতো অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এদের অপপ্রচার আর নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রমাণ করে তারা হায়েনার মতো হিংস্রতায় দেশকে গ্রাস করার অভিলাষী।

লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা