kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

বিদ্বেষ, অপতথ্যের নিকৃষ্টতম উদাহরণ শ্রীলঙ্কার নির্বাচন

অনলাইন থেকে

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গোতাবায়া রাজাপক্ষে—১০ বছর আগে যিনি তামিল টাইগারদের নির্মূল করার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। জঙ্গি হামলায় ২৬৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনার সাত মাস পর গত শনিবার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন রবিবার ফল ঘোষণা করা হয়।

অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল গোতাবায়া, নিজের পরিবারের সদস্যরাই যাঁকে ‘টার্মিনেটর’ নামে ডাকে, ৫২.২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৪১.৯৯ শতাংশ ভোট। গোতাবায়ার মুখপাত্র কেহেলিয়া রামবুকওয়েল্লার ভাষ্য, এটা স্পষ্ট নির্ভেজাল জয়। এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল।

প্রসঙ্গত, গোতাবায়া রাজাপক্ষে মাহিন্দা রাজাপক্ষের ছোট ভাই। মাহিন্দা ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রায় ৬০ লাখ ব্যালট পেপার গণনার পর দেখা গিয়েছিল, ৭০ বছর বয়সী গোতাবায়ার ঝুলিতে পড়েছে ৪৯.৬ শতাংশ ভোট। সিংহলি-প্রধান এলাকাগুলো, ওই সব এলাকাই তাঁর সমর্থনের মূল ভিত্তি, সেখান থেকে ফলাফল আসার পর তাঁর ঝুলিতে ভোটের সংখ্যা ৫০ শতাংশের ওপরে ওঠে।

ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ৫২ বছর বয়সী সাজিথের সমর্থনের শক্ত ভিত্তি ছিল তামিলদের মধ্যে, সিংহলিদের মধ্যে তাঁর অবস্থান পোক্ত নয়। এ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) সরকারের জন্য জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের প্রথম পরীক্ষা ছিল। বিক্রমাসিংহে দলপ্রধান হলেও নিজে প্রার্থী না হয়ে দলের উপপ্রধান সাজিথের অনুকূলে প্রার্থিতা ছেড়ে দেন।

বাতাবায়া জাতীয়তাবাদী প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি; গত ২১ এপ্রিল স্বদেশি মুসলিম (আইএস দায় স্বীকার করে) জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মীয় চরমপন্থা নির্মূলের  অঙ্গীকারও করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ওই সময় তিনটি বিলাসবহুল হোটেল ও তিনটি চার্চকে টার্গেট করে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। হামলায় মোট ২৬৯ জন নিহত হন, তাঁদের মধ্যে ৪৫ জন বিদেশি।

ইউএনপির প্রার্থী সাজিথ প্রেমাদাসাও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি এ কথাও বলেছিলেন, নির্বাচনে জিতলে জঙ্গি নির্মূলের কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সাবেক সেনাপ্রধান শরৎ ফনসেকাকে জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান নিয়োগ করা হবে।

সাজিথ সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার ছেলে। ১৯৯৩ সালের মে মাসে এক তামিল বিদ্রোহীর আত্মঘাতী বোমা হামলায় রানাসিংহে নিহত হন।

অধিকাংশ সিংহলি গোতাবায়া রাজাপক্ষকে পছন্দ করেন; প্রভাবশালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরাও পছন্দ করেন। তাঁরা মনে করেন, তিনি ও তাঁর ভাই মাহিন্দা তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূলে সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ৩৭ বছরের বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন।

কিন্তু তামিলদের অনেকের মধ্যে তাঁদের ব্যাপারে বিতৃষ্ণা ও ভীতি রয়েছে। তামিলরা মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ। সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেছে বটে; তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক তামিল সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মুসলিম। কিছুসংখ্যক মুসলিম গোতাবায়া প্রেসিডেন্ট হওয়ায় শঙ্কিত। কারণ এপ্রিলের ঘটনার পর মুসলিমরা কয়েক দিন ধরে সিংহলিদের গণহামলার শিকার হয়েছেন।

মাহিন্দা রাজাপক্ষের প্রেসিডেন্সির সময় গোতাবায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। এমন ধারণা রয়েছে যে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে যথাযথভাবে পরিচালনা করেছেন। এ ধারণাও করা হয়ে থাকে, বিভিন্ন ‘ডেথ স্কোয়াড’-এর তদারকিও তিনি করতেন। এসব স্কোয়াড প্রতিপক্ষের লোকদের, সাংবাদিকদের এবং অন্য আরো লোককে হত্যা করেছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেন গোতাবায়া।

মাহিন্দার প্রেসিডেন্সির সময় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। ২০১৪ সালে দুটি চীনা সাবমেরিনকে কলম্বোয় নোঙর ফেলার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল। এসব বিষয় পশ্চিমা দেশগুলোকে এবং ভারতকে শঙ্কিত করে তোলে।

চীনা ঋণের বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে শ্রীলঙ্কার ঋণগ্রস্ততা অনেক বেড়ে যায়। বেশ কিছু প্রকল্প শ্বেতহস্তী পোষণের প্রকল্পে পরিণত হয়। দক্ষিণের একটি বিমানবন্দর প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাজাপক্ষে ভ্রাতৃদ্বয় নির্বিচারে অর্থব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছেন, অথচ কিভাবে ঋণের অর্থ পরিশোধ করা যাবে, তার কোনো উপায় বাতলাতে পারেননি।

নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান মাহিন্দা দেশপ্রিয় বলেছেন, এক কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশ শনিবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনের সময় প্রচুর বোমা হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। সে তুলনায় এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। এবার বড় ধরনের একটিমাত্র ব্যত্যয়ী ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের দিন ১০০টি বাসের একটি বহরের দুটি বাসে গুলি ছুড়েছিল বন্দুকধারীরা। বহরটি ছিল মুসলিম ভোটারদের। এতে দুজন আহত হয়।

নির্বাচন কমিশন আরেকটি কথা বলেছে, এবারের নির্বাচনী প্রচারণা বিদ্বেষ ও অপতথ্য প্রচারের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। এমনটি আগে কখনো ঘটেনি।

 

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন ও দ্য সানডে টাইমস (শ্রীলঙ্কা) অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা