kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ভিন্নমত

রপ্তানির নিম্নমুখিতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে

আবু আহমেদ

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রপ্তানির নিম্নমুখিতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে

যা সন্দেহ করেছিলাম তাই ঘটতে যাচ্ছে। সন্দেহ করেছিলাম আমাদের এই পণ্যনির্ভর রপ্তানি বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা একদিন উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলবে। সময় থাকতে সতর্ক হতে বলেছিলাম। কিন্তু সতর্কতা নিয়ে কথা হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দুটি সমস্যা আছে। একটি হলো রপ্তানি পণ্যের বহুমুখিতার অভাব। দীর্ঘ ২০ বছর বা তারও বেশি সময় আমরা শুধু তৈরি পোশাক পণ্যের রপ্তানির দিকে মনোযোগী হয়েছি। অন্য পণ্যগুলো রপ্তানির তালিকায় আনতে পারিনি; বরং এমন কিছু পণ্য ছিল যেগুলো আগে আমাদের জন্য ভালো বৈদেশিক আয় আনলেও সেগুলো এখন ঔজ্জ্বল্য  হারিয়ে অনেক পেছনের সারিতে চলে গেছে। কয়েক বছর থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিও নিম্নমুখী। কৃষিজাত পণ্যের ভালো বাজার থাকা সত্ত্বেও আমরা এই পণ্য রপ্তানিতে তেমন এগোতে পারিনি। অন্য সবাই খারাপ করলেও আমরা এত দিন খুশি ছিলাম এই ভেবে যে অন্তত একটা পণ্য তো আমাদের সব লোকজনকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এখন যখন দেখি সেই একক পণ্যের রপ্তানিতেও নিম্নমুখিতা শুরু হয়ে গেছে, তখন চিন্তার জগতে ধাক্কা লাগে। বুকের মধ্যে একটা চিন্তা চেপে বসে আমাদের অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আমরা ধরে রাখতে পারব কি?

বাংলাদেশ অর্থনীতির লাইফ লাইন হলো দুটি। এক. বর্ধিত রপ্তানি আয়; দুই. বর্ধিত রেমিট্যান্স আয়। পরেরটির ঊর্ধ্বগতি এখনো বজায় আছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণটি হলো প্রথমটি পণ্যের নিম্নমুখী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি। তবে এখনো পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় ঋণাত্মক অবস্থানের দিকে যাচ্ছে না। যেদিন সেটা ঘটবে সেদিন আমাদের অর্থনীতিও পেছনের দিকে চলে যাবে। আমাদের মতো অর্থনীতিগুলো তত দিনই ভালো করবে, যত দিন আমরা নিজ দেশে পণ্য প্রস্তুত করে অন্য দেশে বর্ধিত পরিমাণে পাঠাতে পারব। বোঝার জন্য বলছি, রপ্তানি বাণিজ্যের অধোগমন হলো অর্থনীতিতে যেটা হবে, তা হলো আমাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের হিসাবের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেবে। ঘাটতি হিসাব নিয়ে আমরা বর্ধিত আমদানির জন্য অর্থের জোগান দিতে পারব না। একপর্যায়ে আমাদের মুদ্রা ‘টাকা’ অন্য বড় মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মূল্য হারাতে থাকবে। এমন অবস্থায় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। মানুষ সব দিক থেকে চাপের মুখে থাকবে। আমাদের বড় বড় প্রকল্পের অর্থায়নও সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। তখন আবার ভুল করে হোক বা ইচ্ছা করে হোক কাপড় অনুযায়ী কোট না বানিয়ে কোট অনুযায়ী কাপড় জোগান দিতে পারবে।

সরকারের ঘাটতি ব্যয় বেড়ে যাবে। বৈদেশিক ঋণগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। শেয়ারবাজারে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যাবে। তবে এসব কোনোটাই ঘটবে না, যদি আমরা সময় থাকতে কাপড় অনুযায়ী কোট সেলাই করি। সাধ্যের বাইরে গিয়ে ব্যয় থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। অনেকে এখন সেধে বাংলাদেশের কাছে ঋণ বিক্রয় করতে চাইবে। ঋণ পেলেই যে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যে অর্থনীতি ঋণ করে ঘি খায় সেই অর্থনীতি একদিন বিপদে পড়ে। আমরা ব্যর্থ হয়েছি অনেক ক্ষেত্রেই। কথা হলো চিন্তা করে আমরা শুধু সময় ব্যয় করছি। কাজটি করিনি বলে আজকে রপ্তানির বাজার খুঁজতে গিয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি। রপ্তানির জন্য উপযুক্ত পণ্য হলেই হবে না, রপ্তানির জন্য চাই বাজার। বিশ্বের ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় ওই সব দেশগুলোর মধ্যে, যারা বিভিন্ন  FTA (Free trade Agreement), PTA (Prefarential trade Agreement) বা অন্যভাবে সামগ্রিক চুক্তির মাধ্যমে মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো, বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে কোনো  FTA, PTA বা কোনো মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের সদস্য হতে পারেনি। অনেক আগেই সার্ক দেশগুলো নিয়ে  SAPTA, SAFTA চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান-ভারতের বৈরিতার কারণে সেই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ বা অন্য সদস্যগুলো তেমন লাভবান হতে পারেনি। ভারতে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ অতি কষ্টে এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তাতেও ভারতের পক্ষ থেকে অনেক বাধা আসছে। অন্য সার্কভুক্ত দেশগুলোর কোনোটিতেই বাংলাদেশের রপ্তানি ২৪০ মিলিয়ন ডলারের বেশি নয়। আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয় যদি শুনি বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করছে। বোধগম্যহীনদের বোধের জন্য বলছি নেপালের জিডিপির আয়তন হলো ২০ বিলিয়ন ডলার আর ভুটানের হলো দুই বিলিয়ন ডলার। এসব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ কী পরিমাণ রপ্তানি করতে পারবে?

গত ১০ বছর থেকে শুনে আসছি বাংলাদেশ মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-শ্রীলঙ্কা-তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু সফলতা দেখলাম না। আলোচনা আর অধ্যয়নের মধ্যে আজও যেন সব কিছু আটকে আছে। এমনকি ছোট দুই-একটি অর্থনীতির সঙ্গে FTA করেও এখন আর লাভ হবে না। কারণ হলো বিশ্ব এখন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় বড় মুক্ত আঞ্চলিক বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই তো সে দিন ব্যাংককে RCEP (Regional Comprenhensive Economic Partnership) চুক্তি সই হওয়ার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। এই চুক্তি হবে Asean-এর ১০ সদস্য এবং চীন-জাপান-কোরিয়াসহ আরো ছয়টি অর্থনীতির মধ্যে। ভারতও আলোচনার অংশীদার ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ভারত  RCEP-এর সদস্য হতে রাজি হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের মতো ছোট অর্থনীতিগুলো সব ধরনের মুক্ত বাণিজ্যের অংশীদারিত্ব থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন আর ছোট নয়। আমাদের অর্থনীতির আকার হলো ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বা আরো বেশি। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশ নিজেকে তুলে ধরতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সরকারি ভর্তুকি আর সহজ ব্যাংক ঋণ পেতে অতি আগ্রহী। আমরা তাদের কখনো দেখলাম না বৃহৎ রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করার জন্য  FTA-এর পণ্যে বড় অবস্থান নিতে। যখনই রপ্তানি বাণিজ্যে এরা সমস্যা দেখে, তখনই তারা সরকারের কাছে নগদ সহায়তা চায়। নগদ সহায়তা হলো একটি রোগ। এই রোগ থেকে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যকে মুক্ত থাকতে হবে। সহজে ব্যবসা করতে পারলে কেউ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে না। বাংলাদেশকে ভাবতে হবে এই অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে পণ্য বা সেবা বিনিয়োগকারীকে কোথায় রাখবে। বেচারা বাজার না পেলে বড় বিনিয়োগকারীরা এই অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে না। আর বাজার সৃষ্টি হচ্ছে আজকাল  FTA-এর মাধ্যমে। দেরিতে শুরু করেও ভিয়েতনাম যেটা পেরেছে, আমরা সেটা পারিনি। ভিয়েতনামের রপ্তানি বাণিজ্য হলো ২৮০ বিলিয়ন ডলারের এবং বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলো যুক্তরাষ্ট্র, যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনাম অনেক বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। চীন থেকে অনেক আমেরিকান ও ইউরোপীয় কম্পানি ভিয়েতনামে ব্যবসা সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এই দেশের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। থাইল্যান্ড শুধু পার্টনারশিপ থেকে বছরে আয় করে ৫৫ বিলিয়ন ডলার। আর আমাদের অবস্থান এই ক্ষেত্রে কোথায়। স্বর্ণনীতি হলো আমদানির জন্য স্বর্ণের বাজারকে খুলে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা দেশে একটা জুয়েলারি শিল্প গড়ে উঠতে দেখছি। এখনো স্বর্ণের চোরাচালান আটকানো হচ্ছে। কোথায় যেন সব ক্ষেত্রেই একটা ভুলের মধ্যে আছি। দেশের জনগণকে আয় করার উৎসগুলো থেকে দূরে রাখলে তারা ভালো ভোক্তা হতে পারবে না। আমাদের অগ্রগতি অন্তত অর্থনীতির ক্ষেত্রে নির্ভর করছে আমাদের অব্যাহত বর্ধিত রপ্তানি আয়ের ওপর।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা