kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

রোহিঙ্গাদের জন্য আশার ইঙ্গিত

ফেলিম কাইন

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোহিঙ্গাদের জন্য আশার ইঙ্গিত

গাম্বিয়া সরকার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনভিপ্রেত একটি ঈঙ্গিত দিয়েছে, সেটি আশার ইঙ্গিত। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি এ ঈঙ্গিত দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে মিয়ানমার জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন (১৯৪৮) লঙ্ঘন করেছে। ৪৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে নথি সংযুক্ত করে বলা হয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সামাজিক ভিত্তি ধ্বংস করেছে; হত্যা ও ধর্ষণকাণ্ড ঘটিয়েছে।

গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তাম্বাদো গত ৪ অক্টোবর বলেছিলেন, অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি তাঁদের দাপ্তরিক অগ্রাধিকারের বিষয়। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযোগ দায়ের করা হলো। গাম্বিয়ার এ পদক্ষেপ তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। দেশটি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) অ্যাডহক মিনিস্টারিয়াল কমিটির প্রধান। জুনে ওআইসি এ কমিটিকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজে-তে অভিযোগ দায়েরের দায়িত্ব দিয়েছিল।

আইসিজে-তে গাম্বিয়ার অভিযোগ মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। ২০১৭ সালের শেষার্ধে উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী যে অপরাধ করেছে, সে বিষয়ে জবাবদিহির চ্যালেঞ্জ এটি। এ উদ্যোগ জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে আরো বড় আন্তর্জাতিক পরিসর সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। এখন বিশেষভাবে এবং দ্রুত যে কাজটি করা দরকার তা হলো, অন্যান্য জাতিসংঘ সদস্য দেশকেও গাম্বিয়ার মতো আইসিজে-তে অভিযোগ দায়ের করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে মিয়ানমার সরকার সামরিক জালিমদের যে দায়মুক্তি দিয়েছে, তার সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য।

নির্যাতন-নিপীড়ন-বর্বরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন (এফএফএম) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ৪৪৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, হত্যা, গণধর্ষণ, শারীরিক লাঞ্ছনার ব্যাপক প্রমাণ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যাবিষয়ক বিচারের আওতায় পড়ে। শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে তদন্ত ও বিচারের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। মিথ্যা ভাষ্য ছড়ানো, নিরাপত্তা বাহিনীর অপকর্ম অস্বীকার করা ও স্বাধীন তদন্তে বাধা দেওয়া এবং প্রমাণ ধ্বংস হতে দেওয়ার জন্য বেসামরিক সরকারের নিন্দাও করা হয়েছে।

দুই বছর ধরে ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (পিএইচআর) তদন্ত জাতিসংঘের মূল্যায়নকে পোক্ত করেছে এবং মিয়ানমার সরকারের অনীহাকে নাকচ করার যুক্তি জুগিয়েছে। প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সরকার ক্রমাগতভাবে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সব আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছে। সরকার ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনকে বানোয়াট বলে খারিজ করে দিয়েছে।

এসব ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্তের বিষয়টি জটিলতায় পড়েছে। কারণ মিয়ানমার রোম স্ট্যাটিউটের স্বাক্ষরকারী নয়, যার ভিত্তিতে আইসিসি গঠিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে আইসিসির তদন্তের আন্তর্জাতিক প্রয়াসও বাধাগ্রস্ত হয়, কারণ রাশিয়া ও চীন এ প্রয়াসের পক্ষে ছিল না। তবে জাতিসংঘ এ সমস্যা এড়ানোর একটি উপায় বের করে। তারা গত আট বছরে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে কি না তা তদন্ত করার ব্যবস্থা করে। তবে সেটি অনেক ঘুরপথ।

জুনে আইসিসি বলেছিল, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বল প্রয়োগ করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছে কি না সে বিষয়ক অভিযোগ খতিয়ে দেখবে তারা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য দেশ। তবে সত্যিই তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে কি না বা কবে করা হবে তা জানা যায়নি।

রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যার দায়ে মিয়ানমারকে আইসিজে-তে নেওয়ার যে উদ্যোগ গাম্বিয়া নিয়েছে, তা অন্যান্য আফ্রিকান দেশকেও একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত করবে। এমন কাজ করে তারা সারা দুনিয়ার অবরুদ্ধ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সংহতি জানাতে পারে এবং ন্যায়বিচারের কাঠামোর প্রতি সমর্থন জানাতে পারে। এশীয় ও পশ্চিমা দেশগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার আছে। সেটি হলো, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া। মালয়েশিয়া এটা করার জন্য উপযুক্ত রাষ্ট্র। দেশটির শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে প্রকাশ্যে বলেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। কানাডারও উচিত রোহিঙ্গাদের পক্ষে অগ্রসর হওয়া, শুধু সমর্থন দিয়ে বসে থাকা নয়।

আইসিজে ব্যক্তির বিচার করে না। এর প্রক্রিয়াও দীর্ঘ। তবে তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক চাপকে প্রবল করতে পারে, যাতে মিয়ানমার তার দায়মুক্তির নীতি পরিহার করে।

 

লেখক : ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (পিএইচপি) পরিচালক (গবেষণা ও তদন্ত)

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর: সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা