kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

রঙ্গব্যঙ্গ

একটি পেঁয়াজের আত্মকাহিনি

মোস্তফা কামাল

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একটি পেঁয়াজের আত্মকাহিনি

আমি এক ভাগ্যবান কিংবা অভাগা পেঁয়াজ। আমার জন্ম ভারতের উত্তরাঞ্চলে। আমার খ্যাতি ভারতীয় বড় জাতের পেঁয়াজ হিসেবে। আমি দেখতে মোটাসোটা হলেও আমার শরীরে তেমন ঝাঁজ নেই। তার পরও আমি রাজার বাড়ি থেকে শুরু করে হতদরিদ্র প্রজার বাড়িতেও অবাধে যাতায়াত করি। আমার জনপ্রিয়তার কোনো তুলনা হয় না। আমাকে ছাড়া কোনো রান্নাই যেন সুস্বাদু হয় না। বাসাবাড়িতে আমাকে খুব যত্ন করে রাখা হয়। আমার গায়ে যাতে পচন না ধরে সে জন্য বেশ খাতির-যত্নও করা হয়। অথচ আমার দাম খুব কম। এটা আমার ভীষণ মান-সম্মানে লাগে।

আমি আমার ভাগ্যবিধাতার কাছে প্রার্থনা করি, হে আমার প্রভু, তুমি আমাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছ। মানুষ আমাকে খুব যত্ন-আত্তি করে। এ জন্য আমার আনন্দের কোনো সীমা নেই। কিন্তু আমার একটি কারণে মন খুব খারাপ। আমাকে তুমি মোটেও সম্মান দিলে না। সবাই আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার চেয়ে আমাকে যদি কাঁচা মরিচ বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠাতে, তাহলে খুব ভালো হতো। সব সময় মানুষের কাছে আমার কদরও থাকত। আবার দামও থাকত।

পেঁয়াজের কষ্টের কথা শুনে সৃষ্টিকর্তা বললেন, দাঁড়া! কান্নাকাটি করিস না। আমি তোকে এমন জায়গায় পাঠাব, যেখানে তোর দাম শুধু কাঁচা মরিচ কেন, আদা-রসুনকে ছাড়িয়ে যাবে। কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর।

সৃষ্টিকর্তার কথা শুনে আমি তো মহাখুশি। আমি অপেক্ষায় থাকি সেই সুদিন কবে আসবে! হঠাৎ একদিন দেখি আমার আদর-যত্ন বেড়ে গেছে। আমাকে খুব যত্ন করে বস্তায় তোলা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে কথা দিয়েছিলেন; সেটাই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আমাকে ট্রাকে তোলা হলো। বিশাল বড় ট্রাক। আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে ভিনদেশে পাঠানো হচ্ছে। পরে দেখলাম আমাকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু আমি হিলি সীমান্ত এলাকায় এসে আটকে গেলাম। ঘটনা কী? কেন আমাদের সীমান্তে আটকে দেওয়া হলো? বেশি দিন আটকে থাকলে তো শরীরে পচন ধরবে। তখন আমার আর কোনো কদরই থাকবে না। তখন আমার জায়গা হবে ডাস্টবিনে। আমার সঙ্গীসাথিদের কারো কারো শরীরে মনে হয় পচন ধরছে। সে রকম গন্ধই পাচ্ছি। তাই ভয়ে ভয়ে আছি। যদি আমার শরীরেও পচন ধরে!

আমি দুশ্চিন্তা করছি। আর বোঝার চেষ্টা করছি, কোথায় কী সমস্যা হয়েছে! লোকজন বলাবলি করছে, ওপরের নির্দেশ। আমাদের ভিনদেশে পাঠানো যাবে না। দুই পক্ষের মধ্যে দেনদরবার চলছে। কাগজপত্র ঠিকঠাক করার ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ ট্রাক ড্রাইভার ইঞ্জিন স্টার্ট দেন। আবার বন্ধ করে রাখেন। এর মধ্যে কয়েকটা দিন চলে গেছে। আমার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। অবশেষে এক রাতে খবর এলো, আমরা বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছি।

বাংলাদেশে ঢোকা মাত্র আমাদের ভাবসাব বেড়ে গেল। আমাদের এমনভাবে অভ্যর্থনা জানানো হলো, আমরা যেন রাষ্ট্রীয় অতিথি। মনে মনে বলি, বাঙালি সত্যি সত্যিই অতিথিপরায়ণ জাতি।

আমাকে মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হলো। বাজারে গিয়ে শুনি আমার দাম অনেক বেড়ে গেছে। আমি খুব ভাব নিয়ে দোকানে বসে রইলাম। মাঝেমধ্যে মোচে তা দিচ্ছি। লোকজন আমার দিকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকায়। এ সময় এক দম্পতি এলেন। দোকানদারের কাছে দাম জানতে চাইলেন। দোকানদার বললেন, প্রতি কেজি ২৫০ টাকা। দেখলাম, দাম শুনে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আঁতকে উঠলেন।

ভদ্রলোক বললেন, থাক, কেনার দরকার নেই। ভদ্রমহিলা বললেন, না না! কিনতে হবে। পেঁয়াজ ছাড়া কি রান্না করা যায়?

শুরু হলো দুজনের মধ্যে ঝগড়া। পরে উভয়ের মধ্যে সাব্যস্ত হলো, তাঁরা শুধু আমাকে নেবেন। আমার সঙ্গীসাথিদের কাউকে না। একা যেতে আমার কেন জানি ভয় লাগছিল। মনে মনে ভাবি, স্বামী-স্ত্রী মিলে আমাকে না জানি কী ডলা দেন!

আমি ভদ্রলোকের বাজারের ব্যাগে চড়ে তাঁর বাড়িতে গেলাম। আমার সঙ্গে আদা, কাঁচা মরিচ, রসুনও গেল। কিন্তু আমাকে তাঁদের কাছ থেকে আলাদা করে বিশেষ যত্নে রাখা হলো। আমার গায়ে যাতে পচন না ধরে সে জন্য ফ্রিজের শীতল জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর পর ভদ্রমহিলা আমার শরীরে কাতুকুতু দিয়ে আবার রেখে দেন। ভদ্রলোক এসে খোঁজখবর করেন। কিন্তু তাঁরা আমাকে রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন না।

আমি তো অবাক! ঘটনা কী? আমাকে তাঁরা কেন ব্যবহার করছেন না? এই বাসায় কি রান্নাবান্না হয় না?

আমি আবার বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি। হে প্রভু, তুমি আমাকে কোথায় পাঠালে? এবার মানসম্মান বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু কেউ তো আমাকে কাজে লাগায় না। আমি ঠাণ্ডায় রীতিমতো জমে যাচ্ছি। হঠাৎ একদিন সকালে দেখি, আমাকে সুন্দর প্লেটে সাজানো হচ্ছে। সাজিয়ে-গুজিয়ে আমাকে আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি হয়ে গেলাম তাঁদের গিফট আইটেম! এটা কি আমার জন্য ভালো হলো?

আমার কাছে সব কিছু কেমন এলোমেলো লাগছে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক    

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা