kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

হাঁটো বাংলা হাঁটো, মধুমেহ জাদুঘরে যাক

বাহারউদ্দিন

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাঁটো বাংলা হাঁটো, মধুমেহ জাদুঘরে যাক

ডায়াবেটিস রুখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা এবং সতর্ক প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানিয়ে ১৭ নভেম্বর রবিবার ‘হাঁটো বাংলা হাঁটো’ পদযাত্রার ডাক দিয়েছে কলকাতার সুপরিচিত জিডি হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াবেটিক ইনস্টিটিউট। প্রতিবছর এ পদযাত্রার আয়োজন করে জিডি। অংশগ্রহণ করেন খেলোয়াড়, অভিনেতা, লেখক, সমাজকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের চেনা-অচেনা অসংখ্য মানুষ।

এবার এই পদযাত্রার সূচনা করবেন অভিনয়জগতের তরুণ তুর্কি পরমব্রত চ্যাটার্জি। ২৪ নভেম্বর মালদায়ও ‘হাঁটো বাংলা হাঁটো’য় যোগ দেবেন চিকিৎসক ও রোগীসহ সর্বস্তরের মুখ। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রাক্কালে সংবাদ সম্মেলনে, আসন্ন দুই পদযাত্রার অবশ্যম্ভাবী কর্মসূচি ঘোষণা করে হাসপাতালের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মুসরেফা হোসেন বলেছেন, পদযাত্রার পাশাপাশি কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে মোবাইল ডায়াবেটিস কেয়ারের গাড়ি ঘুরবে এবং বিনা খরচে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করার ব্যবস্থা থাকবে। মালদায়ও একই প্রক্রিয়ায় বিনা মূল্যে মধুমেহ রোগের পরীক্ষা করবে জিডি। মুসরেফার সবিনয় ঘোষণা আর তাঁদের প্রতিষ্ঠানের গৃহীত কর্মসূচি থেকে পরিষ্কার তিনটি চিত্র ভেসে উঠছে।

এক. চিকিৎসার সেবা আর পরিষেবায় জিডির বহুমুখী কর্মকাণ্ড নিরন্তর বাড়ছে। প্রতিদিন রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলে স্বনামধন্য চিকিৎসকমণ্ডলী থেকে নার্স—ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ আধিকারিক থেকে কর্তব্যরত কর্মীরা যে নিষ্ঠায়, যে গাফিলতিহীন স্বচ্ছতায় চিকিৎসা পরিষেবাকে প্রকারান্তরে জনসেবায় রূপান্তরিত করে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ, তা সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিধি আর পরিসরকে অনেকটা নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ করে তুলবে।

দুই. আমাদের সমাজসচেতন চিকিৎসকরা যাঁরা নির্মোহ, মানুষকে নীরোগ করে তুলতে যাঁদের সংকল্প আর অভিপ্রায় প্রশ্নাতীত, তাঁদের প্রজ্ঞা ও প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ডায়াবেটিসকে যেমন গুরুতর সমস্যা ও সব রোগের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করতে সচেষ্ট, তেমনি তাঁরা এ রোগ থেকে প্রত্যেক মানুষের নিস্তার দাবি করছেন। এই যে রবিবারের সংবাদ সম্মেলনে জিডির চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক খ্যাতির মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার সুকুমার মুখার্জি রোগ ঠেকানোর নিদান দিয়ে বলেছেন, নিয়ম করে প্রতিদিন হাঁটতে হবে অন্তত ৩০ মিনিট। হাঁটতে যাঁরা অনভ্যস্ত বা যাঁদের অসুবিধা আছে, তাঁরা সাইকেল চালান। সাঁতার কাটুন। ব্যায়াম করুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন। শুধু ওষুধ বা ইনসুলিন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, ইনসুলিন নেওয়া মানেই জীবন শেষ—এ রকম ভয়ও কাটিয়ে ওঠা দরকার। কলকাতার আরেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শুভঙ্কর চৌধুরী—বংশপরম্পরায় যাঁর পরিবার চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট হিসেবে খ্যাতি যাঁর বিশ্বজোড়া, নিখুঁত তথ্য আর পরিসংখ্যান পেশ করে বলেছেন, ভারতে এই মুহূর্তে ছয় কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। শিশু থেকে বৃদ্ধ। এদের বসবাস শহরে, প্রান্তিক গ্রামেও। রোগের উৎসের কথা বলতে গিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগীয় প্রধান ডা. রায় এ কথাও বলেছেন, দূষিত পরিবেশ আমাদের ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে দূষণ হামলা করছে। প্রয়োজনের তুলনায় শহরে রাস্তা কম। ফুটপাত কম। খালি জায়গা, খালি জলাশয় সংকুচিত হয়ে আসছে। কলকাতা পুরসভাকে আমরা আগেও বলছি, আবার আবেদন করছি, হাঁটা-চলার রাস্তা উন্মুক্ত ও নির্মল করে তুলুন। অস্থি বিশেষজ্ঞ চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্য জানালেন আরেক তথ্য, মধুমেহ রোগীদের হাড় আর পেশি স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে  ফেলে, হিপজয়েন্টে ফ্রাকচারের দুরাচারও বেড়ে ওঠে। অন্য দুটি ভয়াবহ ছবি তুলে ধরলেন দুই বিশেষজ্ঞ—ডা. সুজয় মজুমদার আর ডা. সিদ্ধার্থ ঘোষ। দুজনেই জিডির চিকিৎসক। একজন ডায়াবেটিস আর হরমোনজনিত রোগের, অন্যজন চক্ষুবিশারদ। দুজনেরই পরিষ্কার বক্তব্য, ডায়াবেটিস উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সারা বিশ্বে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে নয় শুধু, উন্নত ভূখণ্ডেও। পাঁচ বছরের শিশুও এখন ওবেসিটিতে ভুগছে। বাড়ছে স্কুলপড়ুয়াদের ডায়াবেটিস-টু। মধুমেহ রেহাই দেয় না চোখকে। রেটিনাপ্যাথি, ছানি, গ্লুকোমা দৃষ্টিপথে হানা দেয়। চিকিৎসকদের এসব বিশদ তথ্য বর্ণনার কারণ কী? ভয় বাড়াতে? সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলতে? পেশাগত দক্ষতার জানান দিয়ে বিশেষ কোনো ফায়দা তুলতে? মনে হয় না। তাঁদের সংকল্প আর অভিপ্রায়ে  মিশে আছে চিকিৎসার ধর্ম আর কর্ম।

তিন. এখানে চিকিৎসকদের চর্চা ও অনুশীলনের সঙ্গে কী অদ্ভুত মিল ছড়িয়ে রয়েছে জিডি হাসপাতালের স্থপতি মোস্তাক হোসেনের সমাজমনস্কতার ঘোষিত সংকল্প আর তার বিস্তারের।

মোস্তাক সুপরিচিত উদ্যোগী। কর্মসংস্থান আর অন্যান্য ব্যাপ্তিতে সম্ভবত তাঁর পতাকা গোষ্ঠী বাংলার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এ কারণেই মোস্তাকের বৃত্তান্ত বলতে হচ্ছে, তা নয়। বলার কারণ, প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষা বিস্তারে, দায়বদ্ধতার ধর্মপালনে মোস্তাকের ভূমিকাকে অসামান্য, অতুলনীয় বলা হলে নিছক তোয়াজের মতো শোনায়। যা তাঁর বিলকুল অপছন্দ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, কেউ যদি তোমার সামনে তোমার প্রশংসা করে, তার চোখে-মুখে এক মুঠো বালু ছিটিয়ে দিয়ো। স্তুতি আর প্রশস্তির বিরুদ্ধে মোস্তাকের ধর্মজাত, দর্শনজাত এ রকম জীবনবোধের সঙ্গে এই লেখক খানিকটা পরিচিত। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে তাঁর সঙ্গে এই লেখকের প্রথম সাক্ষাৎ, প্রথম আলাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ছিন্নহীন, ছিদ্রহীন বন্ধুত্বের সুযোগে বারবার লক্ষ করছি, স্পষ্টবাদিতা, প্রচারবিমুখতা আর সমাজের দরিদ্র, অসহায়ের উদ্বেগ আর স্বপ্নের সঙ্গে তাঁর বসবাসের আয়তন অনেক বড়। এ কাহিনি স্বল্প পরিসরে বলা সহজ নয়। এ জন্য তাঁর হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রেক্ষাপট, তাঁর ব্যক্তি প্রতিভার ধারাবাহিক স্ফুরণ ও উদ্ভাস, তাঁর নিষ্ঠা, নির্মোহ, বিশদ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন তাঁর দায়বদ্ধ, সজল উচ্চারণের সত্য গল্পের অবতারণা। সংক্ষেপে এটুকুই বলা জরুরি মনে হচ্ছে—তাঁর মায়ের গয়না বিক্রির ১০-৫০ পয়সা দিয়ে মোস্তাকের বাবা গিয়াসুদ্দিন বিশ্বাস দেশভাগের পর মুর্শিদাবাদে গড়ে তুলেছিলেন কঠিনতম, শ্রমসাপেক্ষ ব্যবসা। আশির দশকের গোড়ার দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাল ধরলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির ছাত্র মোস্তাক। তখন উৎপাদিত পণ্য নিয়ে দিল্লির আশপাশের এক কারখানা থেকে আরেক কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ব্যবসার টার্নএভার যখন ৩০০ কোটিরও অধিক, তখন গাড়িতে তিন ব্যাগে তাঁর অফিস সীমাবদ্ধ। একটি ব্যাগ দিল্লি, দ্বিতীয় ব্যাগ কলকাতা আর তৃতীয় ব্যাগ মুর্শিদাবাদের জন্য বরাদ্দ। কর্মী কুল্লে দুজন। স্বয়ং মোস্তাক আর তাঁর গাড়িচালক। কলকাতায় বসার ঠিকানা বড় বাজারের একজন গুজরাটি বন্ধুর অফিস। ক্রমান্বয়ে ব্যবসা যখন বাড়ল, বহুদিকে ঘটল তার উত্তরণ, মোস্তাক তখন অনালোকে শিক্ষার আলো আর চিকিৎসাহীনের জন্য সুচিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে নিঃশব্দে মানবজমিনের নির্বিশেষকে বুকে জড়াতে থাকলেন। একসময় হাওড়ার খলতপুরের আল আমিন মিশনকে ঘিরে তাঁর শিক্ষা প্রচারের যুক্তি ও ভাবাবেগ সমাজের সমূহ অভিপ্রায় হয়ে উঠল। প্রান্তিক ও অনগ্রসর সমাজ বুঝতে পারল, সচেতনভাবে বোঝার চেষ্টা করল যে তাদের পাশে এ রকম একজন বিমুক্ত, একজন দরদি অগ্রদূতের উপস্থিতি দরকার—যাঁর জবানে শুধু প্রতিশ্রুতির খই ফুটছে না, প্রতিজ্ঞা আর নিষ্ঠার, ভাবাবেগ আর আদর্শের প্রয়োগের মুহূর্তে চোখে জল আসে যাঁর। এ ক্ষেত্রে মোস্তাক আর তাঁর সহযোগীদের সফলতার গল্প এ মুহূর্তে আমি অন্তত বলব না, বলবে ভাবীকালের ইতিহাস। তবু একটি তথ্য জানানো দরকার যে মোস্তাকের সক্রিয় সহযোগিতায় (জিডি চ্যারিটেবল সোসাইটির অধীনে) বাংলার নানা প্রান্তে প্রায় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। মুনাফা যাদের লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য মানুষ গড়ার অবিরাম প্রচেষ্টা। এটাকেই বিদ্যার অভিনব সূর্যোদয় বলতে ভালো লাগছে। আর এ উদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক পছন্দ (সোশ্যাল চয়েস), জড়িয়ে আছে হৃদয়তাড়িত দায়বদ্ধতা। বলা বাহুল্য, জিডি ডায়াবেটিকও তাঁর স্বপ্ন আর নির্মাণে, তাঁর কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত মনোভাবেও আমরা মোস্তাক হোসেনের সমাজচেতনার আলো আর সম্ভাবনাময় বিস্তারের পাশে বাংলার চিকিৎসক, বাংলার খেলার প্রতিভা, বাংলার বহু অঙ্গনের শিল্পী আর কর্মকুশলীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি অনুভব করছি। সবাই হাতে হাত রেখে হাঁটছেন। ভবিষ্যতেও হাঁটবেন। মিলিত কণ্ঠ উঁচু করে বলবেন, হাঁটো বাংলা হাঁটো, মধুমেহ জাদুঘরে যাক। মুসরেফা আমাদের সবার  মেয়ে। সে তার বাবা-কাকাদের, জেঠুদের, ফুফু-ফুপাদের, খালা আর খালুদের স্বপ্নপূরণের যোগ্য সূত্রধর হয়ে উঠছে। আশা করছি, জেলায় জেলায় তার নেতৃত্বে গড়ে উঠবে বহু ডায়াবেটিক ও মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা