kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গা দুর্বল হয়ে পড়েছে

এম হাফিজউদ্দিন খান

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গা দুর্বল হয়ে পড়েছে

বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন কথা বলার কিছু নেই। এখানে রাজনীতিচর্চাটা আশা-জাগানিয়া নয়। রাজনীতির ভেতরে ও বাইরে এর পরিবেশ এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, পরস্পর দোষারোপের সংস্কৃতিতে এসে ঠেকেছে। দেশের কোথাও কোনো অঘটন ঘটলে সরকার যেমন বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র আছে কি না তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করে; বিরোধী দলও সরকারের ভালো কিছু খুঁজে পায় না। সরকার যত উন্নয়ন এবং নানা ধরনের কর্মকাণ্ড করছে, তাতে যেমন ঢালাওভাবে প্রশংসা করার কিছু নেই, তেমনি বলা যায় যে বিরোধী দলও ধোয়া তুলসীপাতা নয়। আবার সরকারের ভালো কাজের সংখ্যাও বেশি নয়। দরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ কতগুলো আছে, সেসব যেমন হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়, দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নজিরও আছে, যেগুলো সরাসরি কাজে লাগবে কি না বা সেগুলোর সঙ্গে আরো অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত কাজ করা যেত, সেসবেরও তালিকা করা যায়।

সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান একটি বিশেষ উদ্যোগ। একে আমি স্বাগত জানাই। ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার যে অভিযান পরিচালনা করেছে, এটা অত্যন্ত ভালো কাজ বলে মনে করি। এ বিষয়েও নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে; কিন্তু এই অভিযান থামিয়ে দিলে হবে না। আমরা যে বলি, দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, একমুখী সরকারব্যবস্থা চলছে—এর মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী যে অভিযান চলছে, সেটা আমাদের আশার আলো দেখায়।

দেশে এখন সবচেয়ে বড় যে কাজগুলো হচ্ছে এবং বলা যায় সরকারের বেশি মনোযোগ হচ্ছে উন্নয়নের দিকে। তৃতীয় মেয়াদে সরকার এসে উন্নয়নের প্রতি জোর দিয়েছে। এটা ঠিক যে আগের চেয়ে এখন বাংলাদেশে উন্নয়নমূলক কাজ বেশি হচ্ছে। নানাভাবে জীবনমান বেড়েছে। দেশ নানাভাবে এগিয়েও যাচ্ছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে একটা কথা বলার আছে—সংবিধানের ১৪৫ ধারায় বলা আছে, সরকারের সব রকম কাজের ধারাবিবরণী নিয়ে সংসদে বিস্তারিত পেশ করতে হবে। সেসব তো দেখতে পাই না। কাজ যে হচ্ছে, কোনো দ্বিমত নেই। তবে যতগুলো কাজ ও উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে, এর মধ্যে সমন্বয় নেই। কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। সেসব আলোয় আসছে না। আলোচনায়ও আসছে না। সে কারণে এটি একটি বড় ধরনের ক্ষতিকর দিক বলে মনে হয়। কারণ প্রজেক্টের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু কাজ শেষ হয় না। কাজ চলছেই। আবার শুরু হচ্ছে। খরচ বাড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রজেক্ট ঝুলে যায়। টাইম ফ্রেম বেড়ে যায়। আবার অনেক প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগেই খরচ হয়ে যায় প্রচুর টাকা। পত্রিকার মাধ্যমে এ ধরনের বহু খবরও আমরা পাই।

আমি আগেও এসব নিয়ে কথা বলেছি। কথা বলে এখন লাভ তো হয় না। কেউ এসব পড়ে না। বিশেষ করে সরকার মহলের কেউ এসব ভ্রুক্ষেপ করে বলে মনে হয় না। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো; যেকোনো কারণেই বড় প্রজেক্টেই শুধু সরকারের আগ্রহ। ছোট ও জরুরি বিষয়ে সরকারের আগ্রহ বা মনোযোগ কম। এটা কেন বা কিভাবে হয়, সেটা বলতে পারব না। বড় বড় যেসব প্রজেক্ট হচ্ছে, তাতে পরিকল্পনারও ঘাটতি আছে বলে মনে হয়। অমুক প্রজেক্টে এত টাকা খরচ হচ্ছে, কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর কতখানি উপকার পাওয়া যাবে বা কোন কাজটি আগে করা জরুরি? রূপপুর প্রকল্প আগে জরুরি, নাকি গ্রামে স্কুলের অবকাঠামো নির্মাণ বা ভাঙা বিল্ডিং মেরামত, না সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুবিধার জন্য হাসপাতালের উন্নয়ন আগে করা দরকার? এসব খতিয়ে দেখে ও হিসাব করে প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়িত হয় কি না তা বোঝা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে দু-একটি বাদে প্রায় কোনো কাজই শেষ হয় না। এটিও আরেক বিড়ম্বনা। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে হয়তো জবাবদিহির ব্যাপার নেই। উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পের অবশ্যই দরকার আমাদের; কিন্তু পাশাপাশি জনসেবামূলক ছোট ছোট কাজ আগে করা দরকার। এগুলোও সরকারকে ভাবতে হবে। যেসব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আগে বাস্তবায়ন দরকার বলে আমরা মনে করি, সেগুলো মনে হয় কম গুরুত্ব পাচ্ছে।

সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে যে কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, তা বিস্ময়কর। এ বিষয়ে যতগুলো সরকারি এজেন্সি আছে, তাদের কার্যকর বিশেষ উদ্যোগ দেখতে পেলাম না। নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি জিনিস সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে দিনের পর দিন—এসব নিয়ে জরুরি উদ্যোগ নেই। এটা কিভাবে সম্ভব হয়? এর পরও দেখলাম, সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলছেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আছে। যখন এ কথা তিনি বলছেন, তখন কিন্তু পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা পেরিয়ে গেছে। দাম নির্ধারণ করা আর দাম বেড়ে যাওয়া তো এক কথা নয়। এর আগে আমরা দেখেছি, কৃষকরা ধান ফেলে দিয়েছে, ধানের জমির পাকা ধান না কেটে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। এসব নিয়ে তো কম কথা  হয়নি। কিন্তু সুরাহা মিলেছে সামান্যই। কয়েক দিন আগে খাদ্যমন্ত্রী বললেন, আমার কাজ তো শুধু বিভিন্ন আলোচনা ও মিটিংয়ে অংশ নেওয়া। একটি গণতান্ত্রিক দেশের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন কথা কিভাবে বলতে পারেন, তা আমাদের মাথায় আসে না।

এখানে কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেটা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সময়ের আগেই বা সময়মতো কোনো পদক্ষেপ কম ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়। কোনো একটি সমস্যা হয়ে গেলে কী করা যায়—সেটা নিয়েই আমাদের চেষ্টা থাকে। কেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর কী করে? তারা কি ঘুমায়?

এখন অনেকে রাজনীতি করতে আসে নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার আশায়। কখনো ব্যাবসায়িক সুবিধা পাওয়ার জন্য, আবার কখনো বিশেষ সুযোগ ও ফায়দা পেতে রাজনীতিতে আসে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে দুর্নীতি করে বড় কিছু করার চিন্তা থেকে অনেকে রাজনীতিতে আসে। এসব শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে।  এটি সব সময়ই ছিল। তবে বলা যায়, এখন এসব বেড়েছে। সরকারের কাজ হবে ফায়দা লোটার জন্য কেউ যেন রাজনীতিতে আসতে না পারে, সেই প্রচেষ্টা ও নজরদারি জারি রাখা। এরা দেশের কল্যাণে নয়, শুধু নিজেদের আখের গোছানোর জন্যই রাজনীতিতে আসে। এমন নেতা দিয়ে তো কোনো লাভ নেই।

বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করছে বা ত্যাগ করা উচিত বলে একটি আলোচনা শুনছি। এসংক্রান্ত খবরও বেরিয়েছে পত্রিকায়। আমি মনে করি, তারেক রহমানকে দলের প্রেসিডেন্ট করাই ঠিক হয়নি। এটা আমার কখনো পছন্দ হয়নি। আমরা এখন বাপ-বেটির রাজনীতি, বাপ ও বেটার রাজনীতি—এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একজন যাবে আরেকজন আসবে। একজন মারা গেলে তার স্ত্রী বা মেয়ে বা ছেলে তার স্থলাভিষিক্ত হবে—এর মধ্যেই আমরা আছি। টাঙ্গাইলে, বরিশালে, কক্সবাজারে এসব আমরা দেখেছি। এসব ভালো কিছু আনে কি? আর জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা আমরা কখনো পছন্দ করিনি। বিএনপি হয়তো বলতে পারে, আওয়ামী লীগ তো জামায়াতকে নিয়ে কাজ করেছে। সেটা ঠিক হয়নি। তাই বলে বিএনপিও তাই করবে নাকি? এটা কোনো যুক্তি বা কাজের কথা হতে পারে না। জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিএনপির ঐক্য গড়াটা ঠিক হয়নি। এখন আলোচনা হচ্ছে বেরিয়ে আসার; আমি মনে করি আরো আগেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

আমরা সব সময়ই বলে এসেছি, এখনো বলছি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা এমন নিবেদিত নেতা চাই, যাঁরা হবেন সৎ ও আদর্শবান। যাঁরা সব কিছুর ঊর্ধ্বে নিজের দেশকে ভালোবাসেন। দেশের মানুষকে ভালোবাসেন এবং তাঁদের রাজনীতি দেশ ও দশের কল্যাণেই হবে। শুধু নিজের ও দলের স্বার্থেই রাজনীতি করবেন না, আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর রাজনীতি হবে। মানুষ যেন তাঁকে ভালোবাসতে পারে, শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতে পারে। আদর্শ হিসেবে মান্য করতে পারে। এই আশাবাদ আমরা রাখি সব সময়। সেটা যেকোনো দল থেকেই রাজনীতিবিদ আসুন না কেন। এখনো তেমন রাজনীতিবিদ দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই রাজনীতির মাঠে তেমন মুখ দেখতে পাব বলে আশা রাখি।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা