kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

টেস্ট সিরিজে ভালো খেলার চেষ্টা করতে হবে

ইকরামউজ্জমান

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টেস্ট সিরিজে ভালো খেলার চেষ্টা করতে হবে

প্রাণময়ী খেলা ক্রিকেট। এখানে নিরাশার কোনো স্থান নেই। ক্রিকেট প্রতীক্ষা শেখায়। আবার প্রস্তুত হতে বলে। পূর্ণপ্রাণে যা চাইবার সেটি রিক্ত হাতে চাইলে সাময়িক হতাশা ভর করবেই। বুদ্ধিমানের কাজ হলো বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। যতটুকু প্রাপ্তি সেদিকে তাকিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামীর জন্য বুক বাঁধা।

বাংলাদেশ দল ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ হেরেছে ২-১। বাংলাদেশ তো কখনো ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জিতবে এটা ভাবেনি আগে! এটাই ক্রিকেট! প্রতিদিনই আশার জন্ম, আবার সমাধি।

যে পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে ক্রিকেটে মনঃসংযোগী হয়েছে—এটি অসাধারণ। টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম খেলা দিল্লিতে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে ৭ উইকেটে জয় চাট্টিখানি কথা নয়! ভারত দল এটি চিন্তাও করতে পারেনি যে দেশের মাটিতে শুরুতেই তারা পরাজয়ের স্বাদ পাবে। মুশফিক দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলে ৬০ রান করে অপরাজিত ছিলেন। পাশাপাশি চমত্কার পার্টনারশিপ খেলাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয় মনে রাখার মতো। এই জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। খেলোয়াড়রা বিশ্বাস করেছেন, সবাই মিলে খেলতে পারলে তাঁরা কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। মাঠে সামর্থ্যের পরীক্ষায় পাস করাতে সাহস আর নিজের খেলার ওপর খেলোয়াড়দের আস্থা বেড়েছে। রাজকোটে দ্বিতীয় খেলায় ৮ উইকেটে পরাজয়ের পরও খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মা অনেকটা একাই জাহাজকে লক্ষ্যের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন। সিরিজ ১-১ হওয়াতে সুযোগ ছিল নাগপুরে। সুযোগ এসেওছিল। একপর্যায়ে জয়ের পাল্লা ৭৮ শতাংশ ঝুঁকে ছিল বাংলাদেশ দলের পক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর থাকেনি। হিসাবে গরমিল আর ভুলের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। সাদা চোখে টেলিভিশনের পর্দায় ক্রিকেট প্রেমিকরা সব কিছুই দেখেছেন। বাংলাদেশ দলের সৌন্দর্য হলো একজন বা দুইজন নয়, সবার ‘কন্ট্রিবিউটরি পার্টিসিপেশন’। টি-টোয়েন্টিতে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে একজন বোলার বা একজন ব্যাটসম্যান দলকে জয়ের স্বাদ উপহার দিতে পারেন এটি সত্যি। কিন্তু সাপোর্ট লাগবেই। নাগপুরে এই সাপোর্ট পাননি তরুণ নাঈম শেখ, যিনি অনবদ্য ৮১ রান করেছেন ভয়ডরহীনভাবে ব্যাট করে। পার্টনারশিপ গড়ে না উঠলে একা লড়াই করা মুশকিল। বাংলাদেশ দল হেরেছে ৩০ রানে। এই পরাজয়ে গ্লানি নেই। সিরিজ জয়ের পর ভারতের ক্রিকেট বোদ্ধারা বলেছেন লড়াইয়ের শক্ত মানসিকতা, সম্মিলিতভাবে খেলার মন্ত্রে উজ্জীবিত এবং দলে নতুন প্রতিভার আগমন বাংলাদেশের খেলাকে অর্থবহ এবং কার্যকর করে তোলার রাস্তায় হাঁটতে সাহায্য করছে—যেখানে কোনো কোনো দেশের ক্রিকেট সন্তোষজনক অবস্থায় নেই।

বাংলাদেশ সিরিজ হেরেছে সত্যি; কিন্তু ভারতের বিপক্ষে লড়াইয়ে মাঠে কয়েকটি নিখাদ সোনার টুকরা পেয়েছে। নাঈম শেখ, আমিনুল ইসলাম, আফিফ হোসেন সুযোগ পেয়েছেন বলেই নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছেন। সাকিব, তামিম, সাইফুদ্দিন থাকলে তো তাঁরা খেলার সুযোগ পেতেন না। তারুণ্যের কোনো বিকল্প নেই। তারুণ্যের শক্তির প্রতি আস্থা রাখতে হবে। তারুণ্যকে ঘিরেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন হবে, এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী বছর বিশ্ব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের জন্য টিম কম্বিনেশন ঠিক করা। এই ক্ষেত্রে তরুণ প্রতিভার দিকেই চোখ থাকবে। এখনো বাংলাদেশ দল টি-টোয়েন্টি যেভাবে খেলতে হয়—তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। তবে এই ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে না। দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়রা পারফর্ম করতে শুরু করেছেন, আশা করা যায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ভালো টি-টোয়েন্টি খেলবে। ওয়ানডের মতো সমীহ জাগানো দল হিসেবে পরিচিত হবে।

রঙিন পোশাক ছেড়ে আজ থেকে ইন্দোরে সাদা পোশাক পরে প্রথম টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ টেস্ট র্যাংকিংয়ে এক নম্বরে অধিষ্ঠিত শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে। এই টেস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুরু করবে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা। টেস্ট ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য কঠিন লড়াই এবং সবচেয়ে শক্ত চ্যালেঞ্জ। ভারতের বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ তো আরো বেশি শক্ত। সব দেশই ‘আন্ডার ডগ’ হয়ে খেলতে নামে। বাস্তবতায় যদি বাংলাদেশ ভারতের ২০ উইকেট নিতে পারে এবং টেস্টের মৌলিক কাজগুলোর ৮০ শতাংশ প্রয়োগ করতে পারে এটা হবে বাংলাদেশ দলের জন্য অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট। জয় নিয়ে না ভেবে সবাই মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ভারতের দলগত যে সামর্থ্য, তাতে সিরিজ বিজয় করা শক্ত কাজ নয়। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ ড্র করার কোনো সুযোগ নেই একমাত্র বৈরী আবহাওয়া ছাড়া। সাকিব, তামিম ও সাইফুদ্দিন ছাড়া বাংলাদেশ খেলতে নামবে এটি যেমন দলের জন্য বড় মাথাব্যথা, আবার একদিকে দলে অন্তর্ভুক্ত খেলোয়াড়দের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে অন্য দুটি সংস্করণের কোনো মিল নেই। এই ক্ষেত্রে অভ্যস্ততা, অভিজ্ঞতা, স্কিল, টেকনিক, ধৈর্য, মনঃসংযোগ আরো অনেক কিছুই ভাবতে হয়। বাংলাদেশ দল গত ১৯ বছরে ১১৫টি টেস্ট অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এই সময়ে বেশি খেললেও কিন্তু এই ক্রিকেটে ক্রিকেটাররা অভ্যস্ত হয়ে উঠেননি। দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেট ঘরোয়া ক্রিকেটে যে অবহেলিত। অনেকেই আবার বিভিন্ন কারণে এই ক্রিকেট খেলেন না বা খেলতে পারেন না। শুধু তো টেস্ট শুরুর আগে কয়েক দিন প্রস্তুতি নিয়ে টেস্ট খেলা যায় না। এই খেলার অ্যাপ্রোচ, আবেদন তো একেবারে অন্য রকম। অন্য মানসিকতার খেলা। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেছে। বিশেষ করে দুটি ম্যাচে তো সমান সমান লড়াই হয়েছে। তারপর কিন্তু টি-টোয়েন্টির আত্মবিশ্বাস টেস্টেও ভরসা হবে—এ রকম চিন্তা অর্থহীন। র্যাংকিংয়ে ৯ নম্বর দল খেলতে নামবে এক নম্বর দলের বিপক্ষে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া টি-টোয়েন্টি শেষ করেই। একটি সংস্করণ থেকে আরেকটি সংস্করণ। দ্বিপক্ষীয় টেস্ট সিরিজে টেস্টের আগে প্র্যাকটিস ম্যাচের সুযোগ দেয়নি ভারত ক্রিকেট বোর্ড।

ভারতীয় বোর্ডকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। এদিকে কিন্তু কখনো গোলাপি বল দিয়ে না খেলে অভ্যস্ত না হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অনুরোধে বিসিবি রাজি হয়ে গেছে ইডেনে দ্বিতীয় টেস্ট ডে-নাইট খেলতে। টিম ম্যানেজমেন্টের যুক্তি হলো কারো তো অভিজ্ঞতা নেই—অতএব অসুবিধা নেই। বুঝতে হবে টেস্টের জয়-পরাজয়ের তো আলাদা এক ধরনের মূল্যায়ন আছে। ভারত দলের কেউ কেউ গোলাপি বল দিয়ে খেললেও অধিকাংশই খেলেননি এটাই সত্যি। তবে তারা কিন্তু গত কিছুদিন ধরে গোলাপি বলে অনুশীলন করেছেন, চেষ্টা করছেন বলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। এই বলকে ঘিরে যেমন অনেক রোমান্স আছে, ঠিক তেমনি আছে অনেক চিন্তা। গোলাপি বল অনেক বেশি সুইং করবে। ‘কবজি স্লিপারদের’ বলটি অনেক বেশি সহায়ক। সন্ধ্যার শিশির বলের জন্য একটি বড় সমস্যা, এটি খুব তাড়াতাড়ি কালো হয়ে যেতে পারে। অভ্যস্ত না থাকায় ব্যাটসম্যানদের খেলতে অসুবিধা হতে পারে।

ভারতের ক্রিকেট দর্শন এবং সংস্কৃতি পাল্টে গেছে। ভারত ভাবছে সমানভাবে দেশে ও দেশের বাইরে সাফল্যের বিষয়টি। তাদের উইকেটেও পরিবর্তন এসেছে। শতভাগ স্পিন উইকেট তৈরির মানসিকতা থেকে ভারত বের হয়ে এসেছে। তারা এখন উইকেট তৈরি করছে যেখানে ‘সিমার’ ও স্পিনাররা স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যাটসম্যানরা কোনো ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন না। ভারতের ক্রিকেট একটি অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তাদের গেম অ্যাটাক (মোহাম্মদ শামি, ইশান্ত শর্মা, উমেশ যাদব) স্পিন আক্রমণ (রবিচন্দন, অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজা, কুলদীপ যাদব) তো বিশ্বমানের। দুর্দান্ত ব্যাটিং লাইন-আপ। ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টের চাহিদা এবং দৃষ্টিভঙ্গি এখন অন্য রকম।

সাকিবের পরিবর্তে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেবেন মমিনুল হক। দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেটে শুরু থেকেই যেমন বাই সেশন খেলতে হয়। টেস্ট ক্রিকেটে যে ধরনের টেম্পারমেন্ট প্রয়োজন এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দলের ঘাটতি আছে। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে বিচার করলে হবে না। টেস্ট আসল এবং শক্ত ক্রিকেট। এখানেই একজন ক্রিকেটারের সব পরীক্ষা হয়। বাংলাদেশের  ওপেনিং জুটি, বিশেষ করে তামিম না থাকলে কী হতে পারে এসব নিয়ে কথা উঠেছে। টেস্টে তো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। পরীক্ষার বাইরে কিছু ভাবা তো ঝুঁকিপূর্ণ। গেম অ্যাটাক মধ্যমানের, তবে বড় কথা হলো লাইন, লেন্থ মেইনটেন করে মাথা খাটিয়ে বোলিং করতে হবে। স্পিন আক্রমণে তাইজুল, মেহেদি মিরাজ স্পেশালিস্ট বোলার। সাকিবের অনুপস্থিতি তো পূরণ করা সম্ভব নয়। ব্যাটিংয়ে প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যাটিং। উইকেটে পৌঁছেই অস্থিরতা করার সুযোগ নেই টেস্টে। দলের প্রয়োজনে সেশন বাই সেশন খেলতে হবে পার্টনারশিপ গড়ে। লাল বলের প্রথম টেস্টকে ঘিরে এক ধরনের চিন্তা ও পরিকল্পনা। দ্বিতীয় টেস্টটি গোলাপি বলে, সেখানে আবার অন্য চ্যালেঞ্জ। অনভ্যস্ত বল দিয়ে সন্ধ্যার পরেও খেলার মধ্যে এক ধরনের রোমান্স আছে সত্যি, তবে খেলাটা যে দেশের জন্য, এটা ভেবে অস্বস্তি তো থাকবেই। যারা বলছেন শুরু করা হোক—খুব ইতিবাচক। তবে আগ-পিছ চিন্তা করা হলো না।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা