kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

বাংলাদেশ ইউ টার্ন পার্টি

এম এ মোমেন

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ ইউ টার্ন পার্টি

দুজন বড় নেতার কল্যাণে ইউ টার্ন শব্দটি বাংলা অভিধানে ঢুকে যাই যাই করছে। যাঁরা বাংলা ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় জিঞ্জার ওয়াটার খেয়ে খবরদারি করেন তাঁরা বাদ সাধতেই পারেন; কিন্তু তাঁদের নাকের ডগা দিয়েই শব্দটি ঠিক ঠিক ঠাঁই করে নেবে।

আরো একটি ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সবাইকে, যাঁদের কল্যাণে ক্যাসিনো শব্দটিকেও খুব আপন আপন মনে হয়। বাংলাদেশে ক্যাসিনো বিস্ফোরণের পর বাংলা অভিধান ঘাঁটার সুযোগ পাইনি, অনুমান করি অভিধানে যদি না-ও ঢুকে থাকে, দৌড়ে ইউ টার্নের চেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। ক্যাসিনো শব্দটিকে জনপ্রিয় করার সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন তাঁরা, যাঁরা ক্যাসিনো থেকে হর সপ্তাহ, হর মাহিনা ফেয়ার শেয়ার গ্রহণ করার পরও বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ওম্মা, তাই নাকি? আছে নাকি? ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমি তো ভেবেছি ওখানে লাট্টু খেলে! ক্যাসিনো হলে কি ছেড়ে দিতাম? এসব শুনে কিংবা পড়ে শ্রোতা ও পাঠক যে যথেষ্ট মজা পেয়েছেন এ নিয়ে কেউ ভিন্নমত পোষণ করবেন না। ডাক্তাররাও বিষণ্নতার বিরুদ্ধে। তাঁরাও বলেন মজা পেতে হবে, হাসতে হবে, তাহলে হৃৎপিণ্ড ভালো থাকবে। হৃৎপিণ্ড একটু কঠিন শোনায়, তার চেয়ে হার্টই ভালো।

নেতাদের একজন ঠিক টার্নই নিয়েছিলেন কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন দুর্মুখেরা তো ফাঁসিয়ে দেবে, তিনি ইউ টার্ন নিলেন। নিয়েও রক্ষা নেই, রক্ষা পেতে নেতৃত্ব বিসর্জন দিলেন। দ্বিতীয় ইউ টার্নটি নেওয়া ছাড়া আরেকজন নেতার সামনে তৃতীয় কোনো পথ খোলা ছিল না! তবে তার কারণে ইউর গুরুত্ব বেড়ে টার্নটিও চেনা চোখে পড়ার মতো হয়েছে। দ্বিতীয় জনের দ্বিতীয় ইউ টার্ন বলছি; কারণ নিজের দল থেকে ইউ টার্ন করেই তো শপথ নিতে গিয়েছেলেন।

‘ইউ’র প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দেখি ফ্রি ডিকশনারিতে ইউ দিয়ে শুরু শব্দের সংখ্যা ২২ হাজার ৪৪৩টি; এর মধ্যে একটি হচ্ছে ইউ টার্ন। তবে এই শব্দটি প্রথম কাগজে-কলমে ব্যবহৃত হয়েছে ১৯৩০ সালে। শব্দটি মূলত ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত শব্দ।

ইউ টার্ন মানে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘোরা, গাড়িটি যেদিন থেকে আসছে পুরো উল্টোমুখী হয়ে আবার সেদিকে যাত্রা করা। রাস্তাঘাটে যাঁরা ট্রাফিক সিগন্যাল ও ট্রাফিক সিম্বলের দিকে নজর রাখেন ‘ইউ টার্ন নিষেধ’ এই নির্দেশ তাঁদের চোখ এড়ানোর কারণ নেই। কেমব্রিজ অভিধান রাস্তাঘাটের ইউ টার্নকে মুখ্য রেখে আরো যেসব মানে বলেছে তার প্রধানটি হচ্ছে মত সম্পূর্ণ পাল্টে উল্টোমতে চলে যাওয়া কিংবা যে কাজটি করতে প্রতিশ্রুত ঠিক তার উল্টোটি করা। মেরিয়াম ওয়েবস্টার এর কয়েকটি প্রতিশব্দ দিয়েছে : ফ্লিপ-ফ্লপ, টার্ন অ্যাবাউট, ভোল্ট-ফেস ইত্যাদি। কলিন্স অভিধান বলেছে, রাজনীতির দিক পাল্টানো।

বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের ইউ টার্নের উদাহরণের ছড়াছড়ি। এমনকি একটি ইউ টার্ন মন্ত্রণালয়ের নামও কোথাও না কোথাও দেখেছি। বাংলায় জুতসই শব্দ হতে পারে ডিগবাজি দেওয়া, এমপিদের ডিগবাজি ঠেকাতে বাংলাদেশ সংবিধানের ৭০ ধারার প্রহরা রয়েছে। সে তো সংসদের ভেতরে, বাইরে হলে কে ঠেকায়?

ইউ টার্নের গল্পটি বলতেই হয় : সর্দারজি তাঁর গাড়িটি ব্যাক করে করে পাহাড়ি রাস্তায় শিখরের দিকে যাচ্ছেন।

একজন পথচারী এভাবে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ওপরে গিয়ে যদি গাড়ি ঘোরানোর মতো জায়গা না পাই তাহলে ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। তাই এভাবেই উঠছি।

ফেরার পথে পথচারী দেখলেন সর্দারজি গাড়িটি ব্যাক করে করে পাহাড় থেকে নেমে আসছেন।

এবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিলেন, ওপরে গাড়ি ঘোরানোর জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম, তাই। এখান থেকে নেতাদের জন্য শিক্ষণীয় ইউ  টার্ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আগে দেখে আসুন গাড়ি ঘোরানোর জায়গা আছে কি না? নতুবা যত সঠিক কাজই করুন আম ও ছালা দুই-ই চলে যাবে।

ইউ টার্ন প্রাণের ভয়েও করতে হতে পারে। যখন চার্চ মনে করে পৃথিবী হচ্ছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র, আর কোপার্নিকাস মনে করলেন, ঠিক উল্টোটা সৌরজগতের কেন্দ্র সূর্য—এমন ধর্মদ্রোহী নাফরমানের মৃত্যু কে ঠেকায়? এ ক্ষেত্রে ইউ টার্ন অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণ নেই।

ব্রিটিশ-আমেরিকান যুদ্ধে আমেরিকান কন্টিনেন্টাল আর্মির মেজর জেনারেল বেনেডিক্ট আরনল্ড নিজ পক্ষ থেকে ব্রিটিশদের দলে ভিড়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। জেনারেলের ইউ টার্ন।

রাজনীতিবিদদের ইউ টার্নের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। ইউ টার্নকে উৎসাহিতও করা হয়েছে। আমরাও করি। যদি এ সংখ্যার আশাব্যঞ্জক বৃদ্ধি ঘটে, তাহলে আরেকটা রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয় ঠেকানো মুশকিল হবে; বাংলাদেশ ইউ টার্ন পার্টি। এ নামের রেজিস্ট্রেশন পেতে কোনো সমস্যা হবে। কারণ এ নামের কোনো দল বা লীগ নেই, কেউ এ নাম নিয়ে আবেদনও করেননি, এটা নিশ্চিত।

ডিগবাজি খাওয়া সবার প্ল্যাটফর্ম : বাংলাদেশ ইউ টার্ন পার্টি। ডিগবাজি দেওয়ার জন্য যাঁরা উন্মুখ হয়ে আছেন তাঁদের জন্য নিরাপদ আস্তানা : বাংলাদেশ ইউ টার্ন পার্টি।

 

লেখক : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা